সহস্র সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল

বার্লিন জার্মানি, এপ্রিল ১৯৩৯। বিজ্ঞানী অটো হান এবং ফ্রিটজ স্টার্সম্যান কর্তৃক ‘ফিশন’ প্রক্রিয়া আবিষ্কার হওয়ার মাসখানেক পর জার্মানির নাৎসি বাহিনী ‘ইউরেনিয়াম ক্লাব’ গঠন করে এবং তাদের চিন্তাধারা পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে এগোতে থাকে। আলবার্ট আইনস্টাইন ব্যাপারটি বুঝতে পেরে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাংলিন ডি. রুজভেল্টকে একটি চিঠি পাঠান যেখানে তিনি বিষয়টির খোলাসা করেন। চিঠি পাওয়ার পর রুজভেল্ট চিন্তায় পড়ে যায় কারণ নিউক্লিয়ার বোমা নিয়ে যেখানে তাদের দেশে কোনো গবেষণাও শুরু হয়নি সেখানে জার্মানির এই অবস্থান। উপরন্তু সেসময়ের অন্যতম সেরা পদার্থবিদ হাইসেনবার্গ সেখানেই রয়েছে!

অক্টোবর ৯, ১৯৪১। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু সময় পর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট পারমাণবিক বোমের কাজ সম্প্রসারিত করবার লক্ষ্যে একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেন। এর কারণ হিসেবে ছিল নাৎসি জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড দখল হয়ে যাওয়া এবং এ বিষয়ে আলবার্ট আইনস্টাইনের সতর্কতা। আইনস্টাইন বলেছিলেন যে যদি নাৎসী বাহিনী পারমাণবিক বোমা তৈরি করে তাহলে তা সমগ্র মানবজাতির জন্য ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তো কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৪২ সালের জুন মাসে ইউএস আর্মি বোম প্রজেক্টের অংশ হিসেবে ম্যানহাটন ইঞ্জিনিয়ার ডিস্ট্রিক স্থাপন করে। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন লেসলি গ্রোভস, যা পরবর্তীতে ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’ নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে গ্রোভস এই প্রজেক্টের গোপন অস্ত্রের গবেষণাগারের প্রধান হিসেবে রবার্ট ওপেনহাইমারকে নিয়োগ দেন। এই পদের জন্য ওপেনহাইমারকে সবাই কেমন যেন ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না! এর কারণ ছিল রাজনীতিতে ওপেনহাইমারের বামপন্থী দর্শন। উপরন্তু বড় কোন প্রজেক্টে তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতার রেকর্ডও ছিল না। কিন্তু ওপেনহাইমারের জ্ঞান আর কাজ করার ইচ্ছাশক্তি গ্রোভসকে আকৃষ্ট করেছিল। গ্রোভস ওপেনহাইমারের মধ্যে এমন মূল্যবান জিনিস খুঁজে পেয়েছিলেন যা অন্যরা কেউ পাননি। সেটি হচ্ছে কাজ করবার ‘দাম্ভিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’।

ওপেনহাইমার (বামে) এবং গ্রোভস (ডানে); Photo Source: Polotico.com

প্রজেক্ট চলাকালীন ওপেনহাইমার আর গ্রোভস গোপনীয়তার জন্য একটি বিচ্ছিন্ন জায়গা খোঁজার পরিকল্পনা হাতে নেন। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে নিউ মেক্সিকোর একটি জায়গা ওপেনহাইমারের নজর পড়ে, যা তার খামারের কাছেই ছিল। পরে ওপেনহাইমার, গ্রোভস ও তার কিছু গবেষকদের নিয়ে জায়গাটি দর্শনে যান। কিন্তু চারপাশে উঁচু বাঁধ দেখে তার গবেষকেরা এলাকাটি প্লাবিত হবার সম্ভাবনার কথা তোলেন। পরবর্তীতে ওপেনহাইমার নতুন একটি জায়গার সন্ধান পান। জায়গাটি ছিল নিউ মেস্কিকোর সান্তা ফে- এর কাছাকাছি একটি সমতল ‘মেসা‘, যা লস এলামোস রেঞ্চ স্কুলের অধীনে ছিল। যাত্রাপথের খারাপ অবস্থা বাদে অন্য সবদিক দিয়েই জায়গাটি আদর্শ ছিল। পরবর্তীতে ওপেনহাইমার সেসময়ের সবচাইতে বড় বড় পদার্থবিদদেরকে সাথে নিয়ে জায়গাটিতে একত্রিত হন।

 

বোমা তৈরি-

১৯৪৩ সালে ‘থিন ম্যান’ এর কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু সমস্যা ছিল যে এতে ব্যবহৃত প্লুটোনিয়ামের আইসোটোপ প্লুটোনিয়াম-২৩৯ অনেক কম পরিমাণে তৈরি করা যেত যা ‘গান-টাইপ ফিশন ওয়েপন’ এর জন্য আদর্শ ছিল না।

থিন ম্যান বোমার পরীক্ষামূলক খোলক;  Photo Source: Wikipedia Commons

পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালে ওপেনহাইমার ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ ইউরেনিয়াম-২৩৫ পৃথকীকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং একটি নমুনা বানান যা পরবর্তীতে ‘লিটল বয়’ বোমায় রূপান্তর হয়, যে বোমাটি পরবর্তীতে হিরোশিমায় ফেলা হয়েছিল।

ম্যানহাটন প্রকল্পে খরচ হয়েছিল সেসময়ের প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য এবং এর পেছনে কাজ করেছিল প্রায় ১,৩০,০০০ জন। মোট চারটি পারমাণবিক বোমা বানানো হয়েছিল। ওপেনহাইমার প্রথমটির কোড নেম দিয়েছিলেন ‘ট্রিনিটি’।

ট্রিনিটি টেস্টের বোমা ‘দ্যা গ্যাজেট’; Photo Source: Wikipedia Commons

 

প্রস্তুতি-

ট্রিনিটি টেস্টের জন্য স্থান হিসেবে বাছাই করা হয় নিউ ম্যাক্সিকোর অ্যালামোগর্ডোকে। টেস্টের দুই সপ্তাহ আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়।

ট্রিনিটি টেস্ট সাইট; Photo Source: Wikipedia Commons

টেস্টের জন্য ৩০ মিটার (১০০ ফিট) এর একটি টাওয়ার বানানো হয়েছিল।

বোমা রাখবার উদ্দেশ্যে তৈরিকৃত স্টিলের টাওয়ার; Photo Source: Wikipedia Commons

 

বিস্ফোরণ-

জুলাই ১৬, ১৯৪৫। সোমবার। ভোর ৫:৩০। নিউ ম্যাক্সিকোর অ্যালামোগর্ডো। মাত্রই বৃষ্টি থেমেছে। চারিদিকে বয়ে চলা ঠান্ডা বাতাস কেমন যেন সবাইকে একটু ভয়ের আভাস দিয়ে যাচ্ছে। থমথমে পরিবেশ। হঠাৎই সব কিছু কেমন যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এ যেমন তেমন উজ্জ্বল না, সহস্র সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল আলো চারিদিক আলোকিত করে তুলেছে। কিছুক্ষণ পরেই গ্রাউন্ড জিরোর দিকে প্রকান্ড একটি মাশরুম আকৃতির আগুনের গোলা দেখা যায় যা উঠে যায় প্রায় সাড়ে সাত মাইল উপরে!

ট্রিনিটি বিস্ফোরণের কালার ছবি; Photo Credit: Jack Aeby
ট্রিনিটি বিস্ফোরণের লং-এক্সোপজার শট; Photo Source: Nuclearsecrecy.com
ট্রিনিটি বিস্ফোরণের ১৬ মিলিসেকেন্ড পর ধারণ করা ছবি; Photo Source: Wikipedia Commons

নিউ মেক্সিকোর মানুষজন ইতোমধ্যেই ‘কিছু একটা হয়েছে’ ভেবে টের পেয়ে গেছে। ৩০ মাইল দূরে পশ্চিমে প্রায় ১০,০০০ ফিট উপরে নেভি ট্রান্সপোর্টে উড়তে থাকা জন লিউগো বলেন,

My first impression was, like, the sun was coming up in the south. What a ball of fire! It was so bright it lit up the cockpit of the plane.

কিন্তু তার কোন ধারনাই ছিল না যে এটি কি হতে পারে, শুধু তার কানে এসেছিল, “দক্ষিণে যেও না।”

প্রায় ১২০ মাইল দূরে থাকা জানালাটিও বিস্ফোরণের প্রভাবে টিকতে পারে নি। আর বিস্ফোরণের প্রভাব নাড়া দিয়েছে প্রায় ১৬০ মাইল দূরে থাকা মানুষগুলোকেও! ৯ কিলোমিটার দূরে থাকা বেজ ক্যাম্পের পর্যবেক্ষকরা উত্তপ্ত ওভেনের মতোন তাপ টের পান। প্রায় ৪০ সেকেন্ড পর বিস্ফোরণের শক ওয়েভের গর্জন তাদের ভীত করে তোলে। এরপর ক্যাম্পগুলোতে উপস্থিত ম্যানহাটন প্রজেক্টের সদস্যদের মধ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। ভয়ানক ধ্বংসযজ্ঞ দেখে কেউ কেঁদে ফেলেন, কেউ বা হাসতে শুরু করেন। বেশীর ভাগই নিরবতা অবলম্বন করেন। পরবর্তীতে ওপেনহাইমার এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, বিস্ফোরণ দেখার সময় গীতার একটি লাইন তিনি স্মরণ করেছিলেন।


Now I am become Death, the destroyer of worlds.

এখন আমি পরিণত হয়েছি জগৎসমুহের ধ্বংসকর্তা মৃত্যুতে


ওপেনহাইমার জানিয়েছিলেন বিস্ফোরণ দেখার পরই গীতার আরো একটি লাইনের কথা তার স্মরণ এসেছিল।


If the radiance of a thousand suns were to burst at once into the sky, that would be like the splendour of the mighty one …

যদি আকাশে সহস্র সূর্য একসাথে বিস্ফোরিত হতো তবে সেই প্রভা হয়তো সমকক্ষ হতো এই মহান [পারমাণবিক বোমা-র] দীপ্তির …”

ট্রিনিটি বিস্ফোরণে সেকেন্ড আর উচ্চতার হিসাব; Photo Source: Rare Historical Photos

বিস্ফোরণ পরবর্তীকাল-

বিস্ফোরণের পর ওপেনহাইমার, গ্রোভস সহ অন্যান্য গবেষকেরা জায়গাটি পরিদর্শন করতে যান আর দেখেন, স্টিলের তৈরি টাওয়ারটি একেবারে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।

ট্রিনিটি সাইট পরিদর্শনে ওপেনহাইমার, গ্রোভস এবং অন্যান্যরা; Photo Source: Wikipedia Commons

আর বিস্ফোরণের অঞ্চলের বালুকণা তাপে গলে গিয়ে একজাতীয় তেজস্ক্রিয় সবুজ কাঁচে রূপান্তর হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ট্রিনাইটাইট’।

ট্রিনাইটাইট; Photo Source: Wikipedia Commons

শুরু হয়ে গেল নিউক্লিয়ার যুগ। মানবজাতি প্রত্যক্ষ করলেন একটি বোমা কতটুকু ক্ষতিসাধন করতে পারে। আরো খাঁটি ধারণা আসলো যখন আমেরিকা কর্তৃক ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমাতে ‘লিটল বয়’ আর ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে ‘ফ্যাট বয়’ বোমা ফেলা হল। এর ফলে মারা যায় প্রায় ১,২৯,০০০ লোক! ঘটনাগুলো পুরো পৃথিবীকে একেবারে স্তব্ধ করে দেয়। মানুষের মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরছিল, “আমাদের ভবিষ্যত কি?”

হিরোশিমা (বামে) আর নাগাসাকির (ডানে) বিস্ফোরণ; Photo Source: Wikipedia Commons

বর্তমানে সারা পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে চৌদ্দ হাজার পারমাণবিক বোমা রয়েছে, যার অংশীদারিত্ব রয়েছে নয়টি দেশের। বর্তমানে এদের কারও সাথে কারও বনিবনা হয় না। কারো কথা কারও সহ্য হয় না, যার ভোগান্তি ইতোমধ্যেই আমরা আর্থিক মন্দার মাধ্যমে টের পাচ্ছি। সত্যি বলতে কি কখন কি হয়ে যায় তা দুনিয়ার কেউই বলতে পারেন না! জানিনা, আমাদের ভাগ্যেই এই বোমা জুটে যায় কিনা!

আইন্সটাইনের একটি উক্তি দিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি,

মানবজাতি পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার করেছে কিন্তু একটি ইঁদুরই কখনোই ইঁদুর ধরবার ফাঁদ পাতবে না।

 

তথ্যসূত্রঃ

১) en.wikipedia.org/wiki/J._Robert_Oppenheimer

২) en.wikipedia.org/wiki/Manhattan_Project

৩) en.wikipedia.org/wiki/Trinity_(nuclear_test)

৪) atomicheritage.org/history/german-atomic-bomb-project

৫) wsmr.army.mil/Trinity/Pages/TrinityHistory.aspx

 

Feature Photo Source: Wikimedia Commons

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *