ঘাস দিয়ে তৈরী ঝুলন্ত ব্রিজঃ ইনকাদের ৫০০ বছরের পুরাতন ঐতিহ্য

সেতু আমাদের মানব সভ্যতার এক অপরিহার্য অংশ। আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে সুমেরিয়া-তে সর্ব প্রথম দেখা গেলেও এর ব্যপ্তি সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। তবে আজকে আমরা আপনাদের কাছে নিয়ে এসেছি এমন এক সেতুর গল্প যা আসলেই অনেক অদ্ভুত। আমরা জানি সাসপেনশান ব্রিজ এর কথা, যার ব্যপ্তি এই সেইদিন থেকে কিন্তু এর মাঝেও এমন একটি সেতু আছে , যার কথা শুনলে পরে মনে হয় যেন এটা রূপকথার গল্প থেকে উঠে এসেছে তবে চলুন আপনাদের কে নিয়ে যাই আপুরিম্যাক নদীর তীরে কুয়াসেকা গ্রামে যার উপরে এই ঘাসের তৈরি সাসপেনশান ব্রিজটি তার নতুন জীবন এর প্রহর গুনছে

 এখন দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্ত, এই বসন্তের আমেজ এর মধ্যেই আমরা দেখতে পারব পাঁচশত বছরের প্রাচীন এই উৎসব কে। কেননা এখনও এখানকার ইনকা আদিবাসীরা এটাকে উৎসবের মত করেই করেন। তো আমরা আরও পথ চলতে চলতে আসলাম, এখন নদীর তীরে, যেখানে সবাই একসাথে সমবেত হবেন প্রায় ১২০ ফুট লম্বা একটা দড়ি কে নিয়ে, যা আবার একটা পূর্ণ বয়স্ক মানুষ এর সমান চওড়া  

 

এটা সম্পর্কে ইনকা বিশেষজ্ঞদের উক্তি এরকম ছিল

 

“যখন ইনকাদের সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেল, তখন এরকম ছোটখাটো গ্রাম্য ঐতিহ্য গুলোই টিকে রইলো, কেননা তখন শহর  গুলো আর বাকি ছিল না, ছিল শুধু গ্রাম।” 

 

 

 

ব্রিজ কে পুনঃনির্মাণ করার জন্য দড়ি বানানো।
Photo source: Nationalgeographic.com

 

উপরের চিত্রতে আমরা দেখে পারছি যে এই ব্রিজটি তৈরি করার জন্য দড়ি পাকানোর কাজ চলছে। বার বার প্রতিবার করে এটি প্রতি বসন্ততে আবারও জীবন পায়। আর এটা চলে আসছে আজ প্রায় পাঁচশ বছর ধরে। এর মানে এই ব্রিজ টি পৃথিবীতে সবথেকে বেশি বার নির্মিত ব্রিজ

 কিন্ত কেনই বা এত তোড়জোড় ?

 তো সেটার জন্য আমাদের কে গ্রামবাসীদের কে প্রশ্ন করতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে কেনই বা তারা এই সেতুটি বার বার তৈরি করেন

 যা জানা যায় এই ব্যাপারে সেটি হচ্ছে, এই সেতুটি গত প্রায় ৪০০ বছর এর বেশি সময় ধরে ছিল একমাত্র সংযোগ। কুয়াসেকা গ্রামটি পেরুর ক্যানাস প্রদেশে অবস্থিত। আর ক্যানাসের এক প্রান্তে এই গ্রামটি হবার কারণে এর  সাথে যোগাযোগ রাখার একমাত্র মাধ্যম ছিল ব্রিজটি এটি ভেঙ্গে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে কোনভাবেই আর এই কুয়াসেকা গ্রাম নিজের সীমানার বাইরের পৃথিবীর সাথে আদান-প্রদান করতে পারবে না নিজের দ্রব্য আর না তারা যেতে পারবে কোন জায়গাতে

যদিও ইনকাদের শাসনকালে এরকম ঘাসের সেতু ছিল শত শত, কিন্ত কালের পরিক্রমাতে এখন একমাত্র এটিই টিকে আছে আমাদের কাছে

 

তাহলে দেখা যাক যেসব এক্সপার্টরা এখানে আছেন তারা কি বলেন এই সম্পর্কে

 এই ব্রিজ এর গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন স্মিথসোনিয়ান আমেরিকান ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম  এর সহকারী পরিচালক জোসে বেরারিও। তিনি বলেন,

 “এই ব্রিজটি ছিল বহু বহু বছরের অসভ্যতার পরে পেরুতে ইনকাদের সভ্যতা ছড়িয়ে দেওয়ার অসংখ্য সিঁড়ির মধ্যে একটি।“

 

Photo Source:Nationalgeographic.com

তিনি আরও যোগ করেন, তাভানতিনসুয়ু (পেরু এর পূর্ব নাম ) এর চারিদিকে ছড়িয়ে যাবার জন্য আর একে নানা রঙের বর্ণিল দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে আন্দিজ এর প্রচণ্ড বৈরী আবহাওয়ার মাঝেও এটি ছিল এক নতুন আশীর্বাদ এর নাম  

 এই কারণেই কুয়াসেকা গ্রাম এর এই ব্রিজকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অভিহিত করেছে জাতিসংঘ সেই ২০১৩ সালেই কেননা এটিই শেষ উত্তর পুরুষ ইনকাদের ২৫ হাজার মাইল লম্বা সড়ক ব্যবস্থা। যার মধ্যে এরকম সেতুর সংখ্যা ছিল প্রায় কয়েক হাজার যদিও এখন এই একটি ছাড়া আর একটিও অবশিষ্ট নেই।

 স্প্যানিশ সেটেলারদের আসার পর থেকেই আমাদের মাঝে এই প্রাচীন সাসপেনশান ব্রিজ এর রীতি কমতে শুরু করে। বদলে এর জায়গা আধুনিক সড়ক নিতে থাকে

 তবে এটাই যে পৃথিবীর প্রাচীনতম সাসপেনশান ব্রিজ সেটা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই এই সাসপেনশান ব্রিজ এর গঠন প্রণালী আশ্চর্য রকম এর সরল। এই ব্রিজ টি তৈরি করা হয় পুরোপুরিভাবে ইচু ঘাস দিয়ে যাদেরকে তাদের এলাকার নারীরা বুনে সুতোর রূপ দেন

কিন্ত এই বুনার কাজটা করার সময় তাদেরকে আবার সেই ব্রিজ এর কাছে আসতে দেওয়া হয় না অশুভ কিছু হবে এই বিশ্বাসের কারণে।  

 

ইচু ঘাস বুননরতা কুয়াসেকা গ্রামের মহিলারা ।
Photo Source: Nationalgeographic.com

এই সুতা-কে পাকিয়ে ছোট ছোট দড়ির রূপ দেওয়া হয়। সেখানকার পুরুষরা এরপরে তাদের সেই দড়িগুলো কে পাকিয়ে মোটা দড়ি বানায় যা সর্বশেষে রূপ নেয় দুই মানুষ এর সমান মোটা দড়িতে। তবে কাজ এখানেই শেষ হয় না। এরপরের কাজ সেতুর কারিগরদের। তারা সেই সেতুর দড়ি কে বুনে বুনে এত চমৎকার বানিয়ে ফেলেন যেন জালের মত মূর্তিময় কবিতা সেজে সেটি সজ্জিত হয়ে যায় দুইটি পাহাড় এর মাঝখানে। শুধুমাত্র প্রাচীন উপায়ে পাথর, দড়ি, আর সুই সুতো দিয়ে এত বড় একটি জিনিস তারা বানিয়ে ফেলেন।

 

তৈরি হবার পরে কুয়াসেকার ব্রিজ।
Photo Source: Nationalgeographic.com

তবে এতে পার হতে আমাদের মত সভ্য তথাকথিত মানুষদের ভয় লাগলেও এদের একদম লাগেনা। বরঞ্চ মনে হয় যেন তারা নিজেরা এখনও সেই প্রকৃতির কোলেই আছে। এর সবথেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে এখানে কয়েক বছর আগে একটি লোহার ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে কিন্ত এখনও আদিবাসীরা এই সেতুতেই স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করছে। তারা পাঁচশ বছর ধরে আঁকড়ে আছে এমন একটি ঐতিহ্যকে যা আমাদেরকে সুদূর ইনকা সভ্যতার সাথে পরিচিত করিয়ে দেয় প্রতি পদক্ষেপে। আর এরা আরও একটি ক্ষেত্রে আমাদের কে নব্য প্রস্তর যুগের সেই সমবায় এর ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন এরা সকল ভেদাভেদ ভুলে সব গোত্ররা একই সাথে এই মহান কাজে নিজেদের কে নিযুক্ত করে , যদিও এর মধ্যে তারা একেবারেই টাকা পায় না , কিন্ত পায় আরও এক বছর এর জন্য নিরাপদ চলাচল এর নিশ্চয়তা  

 তবে এর মাঝেও সামান্য আধুনিকতার ছোঁয়া এর কথা জানতে পারি আমরা। সেটি হচ্ছে এরকম যে এখানে সেতুর পুনঃনির্মাণ দেখতে প্রতি বছর মানুষের ঢল নামত, এই কারণে আগে যেখানে প্রতি তিন বছরে একবার করে সেতুটি তৈরি করা হত সেখানে এখন প্রতি বছরই এটা তৈরি করছে আদিবাসী ইনকারা

 এই পৃথিবীর বহু প্রাচীন অমুল্য প্রথার একটি হচ্ছে এই কুয়াসেকা সেতু। তবে ইনকারা একটু সেকেলে হলেও বেরসিক নয় মোটেও। এই ব্রিজ তৈরির পরে তাদের থাকে পূজার অনুষ্ঠান, যাতে চলে নাচ, গান আর খাওয়া-দাওয়ার ধুম

 

Feature photo source: Nationalgeographic.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *