পাই (π) এর পঞ্চনামা

পাহাড় থেকে নদীর ঢল নেমে আঁকাবাঁকা পথে চলে শেষ পর্যন্ত তার গন্তব্যে গিয়ে ঠেকেছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক দৃশ্য, তবে একজন বিজ্ঞানী এখানেও যেন খুঁজে পায় এই প্রকৃতির অপার রহস্যের নিদর্শন। গবেষণা করে জানা গেছে যে আঁকাবাঁকা পথে চলা নদী পাহাড় থেকে নেমে শেষ পর্যন্ত যে দূরত্ব অতিক্রম করে আর নদীর উৎস থেকে শেষ মাথা পর্যন্ত সরলরৈখিক দূরতের অনুপাতের মান হল পাই (π) এর সমান। এই নদীগুলোর উৎস থেকে এর শেষ গন্তব্য পর্যন্ত যদি সরলরেখা টানা হয় তাহলে যে দূরত্ব পাওয়া যাবে, আর নদীগুলো একেবেকে আসলেই যে দূরত্ব অতিক্রম করে – এই দুই মানের অনুপাত হবে প্রায় ৩.১৪১৬ !

                Source: Pixabay.com

পাই হলো একটি ধ্রুব ( Constant ) যার মান প্রায় ৩.১৪১৫৯২… এটি একটি অমূলদ সংখ্যা অর্থাৎ দশমিকের পর এর সংখ্যা কখনই শেষ হবে না বরং তা চলতেই থাকবে। π এর প্রকৃত পরিচয় হলো এটি বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত। একটি নিখুঁত বৃত্ত যত ক্ষুদ্র বা বিশালই হোক না কেন এর পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত সর্বদা হবে একটি ধ্রুব সংখ্যা, আর এর ধ্রুব সংখ্যাটিই হলো π। আর এই বৃত্ত ও ব্যাসের মাঝে লুকিয়ে থাকা π নিয়েই এতো মাতামাতি।

পাইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। π এর মান অমূলদ সংখ্যা হওয়ার কারণে দশমিকের পর সংখ্যা শেষ হয় না। শুধু তাই না, দশমিকের পরের সংখ্যাগুলোর মাঝে কোন প্রকার প্যাটার্নও পাওয়া যায়নি আজ অব্দি। আমরা সাধারণত যেসব অমূলদ সংখ্যা চিনি যেমন ৩.৩৩৩৩… এরা দশমিকের পড়ে শেষ না হলেও এদের মাঝে প্যাটার্ন থাকে যা π এর মানের মধ্যে থাকে না। আধুনিক সুপার-কম্পিউটারের মাধ্যমে আমরা π এর ১৩.৩ ট্রিলিয়ন ডিজিটেরও বেশি মান বের করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু তারপরেও π এর দশমিকের পরের সংখ্যাগুলোতে কোন প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেখলে মনে হবে যেন এই সংখ্যাগুলো একেবারেই র‍্যানডম।

গণিতের সবচেয়ে সুন্দরতম ও প্রাচীনতম ধ্রুবক হলো পাই। একে প্রকাশ করা হয় গ্রীক বর্ণমালার ষোড়শ অক্ষর (π) দিয়ে। পাই ধারণা পাওয়া যায় চার হাজার বছর পূর্বেক এবং এর আবিষ্কার হয় ব্যাবিলনীয়ানদের সময়ে। ১৬৫০ খ্রিস্টপূর্বে মিশরীয়দের এক প্রাচীন পান্ডুলিপি তে বৃত্তের ক্ষেত্রফল পরিমাপে পাই এর মান ধরা হয় ৩.১৬০৫।

                     বিজ্ঞানী আর্কিমিদিস
             Credit: Wikimedia Commons
              Source: Zmescience.com

সর্বপ্রথম পাই এর ক্যালকুলেশন এ সক্ষম হন মহান গণিতবিদ আর্কিমিডিস। পিথাগোরাসের উপপাদ্য ব্যবহার করে তিনি বহুভুজের ক্ষেত্রফলের সাহায্যে বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। আর্কিমিডিস সর্বপ্রথম ধারণা দেয় যে পাই এর মান ২২/৭ ও ৩১০/৭ এর মধ্যে অবস্থিত।  ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ গণিতবিদ উইলিয়াম জোনস পাই কে ‘π’ চিহ্ন দ্বারা প্রকাশ করেন। তিনি পাই এর মান ব্যবহার করেন ৩.১৪১৫৯।

আমরা জানি, বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত হলো পাই। এটাকে একটু ভেবে দেখা যাক। ধরি, কোন বৃত্তের একটি বিন্দু থেকে বৃত্তাকার পথে রওনা দিয়ে আবার পুনরায় একই বিন্দু তে ফিরে আসতে যে দূরত্ব অতিক্রম হবে তা x;  ঐ একই বৃত্তের সর্ববৃহৎ জ্যা এর দৈর্ঘ্য ধরে নি y;  সুতরাং পাই এর মান হবে  π=x/y .

শেষ করবো পাই নিয়ে এক উদ্ভট ঘটনা দিয়ে। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা রাজ্যের জেনারেল এসেম্বলি তে একবার একটি প্রস্তাব তোলা হলো। প্রস্তাব টি হলো, ‘এখন থেকে পাই এর মান হবে চার’। কি ভয়ংকর ঘটনা! শুধু যে পাই এর মান চার ব্যবহার করা হবে তাই নয়, এর জন্য দিতে রয়েলটি। কেননা তারাই এ দাবি তুলে ধরেছেন।শেষ পর্যন্ত ব্যাপার টি রক্ষা পেয়ে যায়, কারন সেই এসেম্বলি তে একজন গণিতবিদ ছিলেন যে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং প্রস্তাব পাশটি হতে দেন নি।

 

Feature Photo Source: Pixabay.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *