ধুসর মৃত্যুঃ মৃত্যুর মাঝপথ থেকে ফিরে আসা কিছু মানুষের কাহিনী

মৃত্যু কী? সাধারণত জীবনের অবসানের ব্যাপারটাকেই আমরা মৃত্যু বলি। যুগের পর যুগ ধরে জীবজগৎ এই নির্মম সত্যটির সম্মুখীন হয়ে আসছে। সবকিছুরই মৃত্যু আছে, সবকিছুরই শেষ আছে। এমনকি আমাদের এই মহাবিশ্বও একদিন শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু মৃত্যু কেন হয়? কেন এই জগতের কোন কিছুই চিরন্তন নয়?

তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র থেকে আপনি এর উত্তর পেতে পারেন। এই সূত্রমতে, একটা সময় মহাবিশ্বের এনট্রপি হবে সর্বোচ্চ এবং মহাবিশ্বের তাপীয় মৃত্যু ঘটবে। পুরো মহাবিশ্ব অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে। ওই সময়টাকে বলা হয় “ডার্ক এরা বা ফোটন এজ”।

যাইহোক, মহাবিশ্বের দিকে না যাই, আমরা প্রাণীদের মৃত্যু নিয়েই আলোচনা করতে পারি।তবে এই আলোচনার আসলে কোন শেষ নেই। যুগের পর যুগ মানুষ অনেক আলোচনা করেছে মৃত্যু নিয়ে তবে এই আলোচনা কখনোই শেষ হয়নি।

আর মৃত্যু সংক্রান্ত আলোচনাতে সবচাইতে বহুল আলোচিত প্রশ্নটি হলো, “মৃত্যুর পরে কী হয়?”

আপনি এই প্রশ্নের উত্তর চান? আপনি যদি অনেক ধার্মিক হয়ে থাকেন তবে ধর্মের বইগুলোতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারেন। তবে এই পৃথিবীতে প্রায় ৪২০০ ধর্ম রয়েছে। এবং প্রতিটি ধর্মের মূল তত্ব অনুযায়ী শুধুমাত্র তারাই ঠিক, আর বাকীরা সবাই ভুল।

তাই ওই আলোচনাতেও আমরা না যাই। ধর্মীয় বিষয়ে পন্ডিত ব্যক্তিরা ওসব আলোচনা করে নেবেন। তবে একটা ব্যাপারে সবাই একমত হবেন, মৃত্যুর পরে কী হয়, সেটা সবচাইতে ভালো তারাই জানে যারা মারা গিয়েছে। তাহলে তো এই প্রশ্নটা কোন মৃত ব্যক্তিকেই করা উচিত, তাই নয় কি?

অনেকেই হয়তো হাসছেন। কারণ এমনটা করা তো অসম্ভব, তাই না?

আসলে থিওরিটিক্যালি এটা অসম্ভব কিছু নয়। কারণ মৃত্যুর দুটি পর্যায় রয়েছে।

১. ক্লিনিক্যাল ডেথ।

২. বায়োলজিক্যাল ডেথ।

ক্লিনিক্যাল ডেথের শুরু হয় তখন যখন একজন মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃদপিন্ডে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ছয় মিনিট স্থায়ী হয় এই পর্যায়। এই সময়ে একজন রোগীকে থিওরিটিক্যালি মৃতই ধরে নেওয়া হয়। আপনারা হয়তো খেয়াল করে থাকবেন যে এই সময়ে ডাক্তারেরা নানাভাবে রোগীর বুকের ওপর চাপ দিয়ে বা শক দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। আসলে এই ছয় মিনিটের মধ্যেই যদি কোনভাবে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস চালু না করা যায় তবে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। এই ছয়মিনিট রোগীর শরীরের বাকী অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো জীবিতই থাকে।

আর ছয়মিনিট পর শুরু হয় বায়োলজিক্যাল ডেথ। একে একে মারা যেতে থাকে শরীরের সব অঙ্গ, নিশ্চিত মৃত্যু একদম।

তবে আজব ব্যাপার হলো গোটা পৃথিবীতে হাজার হাজার মানুষকে ক্লিনিক্যাল ডেথ পর্যায় থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং তারা সবাইই অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। সেইরকম কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথাই আজ আমরা বলবো।

১৯৯৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বাইশ বছর বয়সী ব্যারন স্টুয়ার্স্ট এক মারাত্মক অ্যাকসিডেন্ট করে। এবং ঘটনাস্থলেই ক্লিনিক্যাল ডেথ হয়ে যায় তার।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডাক্তারেরা আসেন এবং তাকে ওই পর্যায় থেকে অনেক কষ্ট করে ফিরিয়ে আনা হয়। সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর ব্যারন তার এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা জানায় ডাক্তারদের। সে জানায় যে সময়ে ডাক্তারেরা তার শরীরের ওপর নানা চাপ প্রয়োগ করছিল তখন নাকি সে হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছিল এবং উপর থেকে দেখতে পাচ্ছিল যে ডাক্তারেরা তার শরীর নিয়ে কাজ করছেন। এতে অবাক হয়ে ডাক্তারেরা ব্যারনকে জিজ্ঞাসা করেন কোন ডাক্তার কী করছিল সেটা কি সে বলতে পারবে? ডাক্তারদের অবাক করে দিয়ে ব্যারন একে একে হাত তুলে দেখাতে থাকে কোন ডাক্তার কী করছিল।

আশ্চর্য হয়ে যান ডাক্তারেরা, কারণ ব্যারন একদম ঠিকই বলছিল। কিন্তু এসব ব্যারনের জানার কথা না, কারণ সে ওই সময়ে পুরোই অজ্ঞান ছিল। আর অজ্ঞান থাকাকালীন সময়টার পুরোটাই সে আই.সি.ইউতে ছিল যেখানে কেউই তার সাথে দেখা করতে পারতো না! তাকে যে কেউ ব্যাপারটা বলে দিয়েছে এই সম্ভবনা একদমই ছিল না।

অদ্ভুত না?

আরেকটা গল্প বলি।

এই গল্পটা আমেরিকার ১২ বছর বয়সী লুসির। সুইমিং পুলে সাতার কাটতে নেমেছিল মেয়েটা। আর ঠিকমতো সাতার কাটতে না পারার কারণে ডুবে যায় সে। তাকে অতি দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং কিছুদিন পরই ক্লিনিক্যাল ডেথ হয়ে যায় তার, তবে অনেক কষ্ট করে তাকে ফিরিয়ে আনেন ডাক্তারেরা। তবে এরপরেও দীর্ঘসময়ে কোমাতে ছিল সে।

প্রায় তিনমাস লাগে তার সুস্থ হতে। আর সুস্থ হওয়ার পর একটা কাগজে লিখে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিল। সে লিখেছিল:

“একটা কালো জামা পরা মানুষ আর একটা সাদা জামা পরা মানুষ আমার দুই হাত ধরে টানাটানি করছিল। শেষ পর্যন্ত সাদা জামা পড়া মানুষটা আমাকে ছিনিয়ে নেয় আর তখনই জ্ঞান ফেরে আমার!”

অদ্ভুত লাগলো? এই অভিজ্ঞতাটা একটু মনে রাখুন। কারণ আছে। পরে সেটা বলছি।

ইংল্যান্ডের ১৮ বছর বয়সী ডাফি অ্যাডামস ১২ তলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে গভীর কোমাতে চলে গিয়েছিলো। তাকে সুস্থ করতেও যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল ডাক্তারদের আর সুস্থ হওয়ার পর সে নিজের ক্লিনিক্যাল ডেথ হওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিল এভাবে:

“আমি আকাশে উড়ে বেড়াতাম। উঁচু উঁচু বিল্ডিং দেখতাম! মাঝে মাঝে আমার নিজেকেও দেখতাম। বিছানাতে শুয়ে থাকা আমার শরীরটা দেখে খুবই খারাপ লাগতো।”

মেক্সিকোর ২৬ বছর বয়সী আলবার্তো গঞ্জালেস নাকি তার পুরো শরীরকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পুরো দৃশ্যটাই দেখেছিল। সেও বলেছিল যে সে নাকি আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

আর ১৫ বছর বয়সী ভারতের আরতী দেবনাথের বর্ণনা আরো অদ্ভুত। সে নাকি তার মারা যাওয়া সব আত্মীয় স্বজনকে দেখতে পেয়েছিল, তারা নাকি সবাই তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।

Photo Source: Kb4images.com

এইরকম অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। কেউ কেউ তো বলেছেন যে তারা নাকি শুধুই অন্ধকার দেখেছেন। গাঢ়, নিঃসীম অন্ধকার! তবে সবচাইতে অদ্ভুত ব্যাপারটা কি জানেন? এই সকল দৃশ্যগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাপার রয়েছে যা প্রায় সব মানুষের ক্ষেত্রেই এক। যেমন প্রায় সবাইই বলেছেন যে তারা উড়ে বেড়াচ্ছিলেন। আর ওই যে অভিজ্ঞতাটা মনে রাখতে বললাম না? বেশীরভাগ মানুষই দেখেছেন যে একজন সাদা ও কালো কাপড় পড়া মানুষ তাদের টানাটানি করছেন।

এখন প্রশ্ন হলো এইসব কে দেখেছে? এই মানুষগুলো? নাকি তাদের আত্মা? সত্যিই কি তারা মৃত্যুর ওপাড় থেকে ফিরে এসেছেন?

এই ব্যাপারে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা রয়েছে।

ডিএমটি(DMT, N,N-Dimethyltryptamine) নামে একটি ড্রাগ রয়েছে যা মানুষকে অদ্ভুত সব হ্যালুসিনেশন দেখতে বাধ্য করে।

এইখানে ড্রাগের কথা আসলো কেন?

কারণ আমাদের শরীরের একটা অংশে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই ড্রাগটি তৈরী হয় এবং ক্লিনিক্যাল ডেথের পর ড্রাগটি আমাদের মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে এই কারণেই ক্লিনিক্যাল ডেথ অবস্থাতে মানুষের এইসব হ্যালুসিনেশন হয়।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। হ্যালুসিনেশন এর একটা প্রধান শর্ত হলো যে জিনিসটা আপনি দেখবেন তা সম্পর্কে একটু হলেও আগে থেকে ধারণা থাকতে হবে আপনার। নইলে কখনোই সেটা আপনার সামনে আসবে না।

আর এখানেই সমস্যা। ক্লিনিক্যাল ডেথ পর্যায়ে অনেক মানুষ এমন অনেক কিছুই দেখেছেন যা সম্পর্কে তাদের ধারনাই ছিল না!

রহস্যময় না?

যেখানে জীবনটাই রহস্য সেখানে মৃত্যু রহস্যময় হবেই না বা কেন?

Feature Photo Source: Bannedbook.org  

Leave a comment

লুৎফুল কায়সার

মাঝে মধ্যে লেখি আরকি!

2 thoughts on “ধুসর মৃত্যুঃ মৃত্যুর মাঝপথ থেকে ফিরে আসা কিছু মানুষের কাহিনী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *