মশা আপনাকেই কেন কামড়াতে ভালোবাসে?

‘এতো এতো মানুষ থাকতে মশা শুধু আমাকেই কেন খুঁজে নিয়ে কামড়ায়?’

প্রশ্নটা চেনা চেনা লাগছে? লাগারই কথা। কারণ এরকম প্রশ্ন আমরা অনেক সময়ই আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে শুনে থাকি। হয়ত এই ‘আশেপাশের মানুষদের’ মাঝে আপনিও একজন।

কিন্তু সত্যিই কি তাই? মশার সাথে কি শুধু ‘আপনার’-ই শত্রুতা? বিজ্ঞান কি বলে? চলুন আজকের আলোচনায় তা পরিষ্কার করা যাক।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মশা কেন কামড়ায়? এ নিয়ে অনেক গবেষণাই হয়েছে, হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, স্ত্রী মশা তার ডিম ফুটানো এবং শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যে স্তন্যপায়ীর উষ্ণ রক্ত শোষণ করে। কিন্তু রক্ত খাওয়ার ব্যাপারে স্ত্রী মশা বাছবিচার করে। দৈবচয়ন ভাবে একজনকে বেছে নেয় না। এ বিষয়ে মেডিক্যাল এন্টোমলজি ল্যাবরেটরি অব ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ডক্টর জনাথন ডের মতে,

মশকীরা সত্যিই কামড়ানোর সময় কিছু লোককে বেশি প্রাধান্য দেয় অন্যদের তুলনায়।

ডক্টর জনাথন ডে; Photo Source: Howstuffworks

এটা কোনো গল্প নয়। সায়েন্টিফিক রিসার্চ কর্তৃক প্রমাণিত একটি বিষয়। কিন্তু মশার মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলা উপাদানগুলো কি?

এ নিয়ে আপনি হয়তো অনেক গালগল্প শুনে থাকবেন। যেমন মশা কামড়ানোর জন্য ত্বকের মিষ্টতা, রসুন, ভিনেগার জাতীয় খাবার খাওয়া ইত্যাদি দায়ী। কিন্তু আসলেই কি তাই?

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে মশার মস্তিস্ক ও স্নায়ু রয়েছে। আর রয়েছে স্তন্যপায়ীদের মতোন ‘কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র’। মশার আচরণ বোঝা ও তাদের রুচি পরিবর্তন করার জন্য এখন অব্দি অনেক গবেষণাই হয়েছে।

এ বিষয়ে গবেষক জনাব ডে বলেছেন,

ত্বকের লোমকূপের কিছু ব্যাকটেরিয়া রাসায়নিক পদার্থ এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। পাশাপশি এক রক্তের গ্রুপ আরেক গ্রুপের চেয়ে মশাকে বেশি আকর্ষণ করে। এমনকি আপনার জেনেটিক কোডও আপনাকে মশার লক্ষবস্তুতে পরিণত করতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আপনার কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের হার।

গবেষণা বলছে, আপনি যত বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করবেন, ততই আপনাকে শনাক্ত করার কাজ মশার জন্য সহজ হবে। আর এ শনাক্তকরণের কাজটি মশা এর ম্যাক্সিলারী পাল্প ব্যবহার করে থাকে।

Photo Source: Nd.edu

সবার আবার কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করার হার সমান নয়। বয়স্করা এক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন। আর এটি স্বাভাবিক। সুতরাং এক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই। ফলে বয়স্করা বাচ্চাদের থেকে একটু বেশিই কামড় খায়।

 

প্রেগনেন্সি

কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে কিছু ধরণের মশা নিজের ডিম ফুটানোর জন্য গর্ভবতী নারীদের রক্ত বেশি পছন্দ করে। এর পেছনে প্রধান দুটি বিষয় কাজ করে। প্রথম কারণ হচ্ছে, গর্ভবতী নারীরা সাধারণের চেয়ে প্রায় ২১ ভাগ বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে থাকে। এক্ষেত্রে স্থূলকায় (Obese) লোকদের বিপাকের হার বেশি হওয়ায় তারাও ঝুঁকি তে থাকেন ।

আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, তাদের দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক এর চেয়ে ১.২৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি থাকে। আর ঠিক একই কারণে ব্যায়ামের পরে মশার কামড় খাওয়ার প্রবণতা আপনার স্বাভাবিক অবস্থার চাইতে বেড়ে যায়।

 

জিনতত্ত্ব

আপনার বৈশিষ্ট্য আপনার জিন কর্তৃক নির্দিষ্ট হয়। রক্তের গ্রুপ, ত্বকে উপস্থিত বিভিন্ন ক্যামিকেলস (ল্যাকটিক এসিড, ইউরিক এসিড, অ্যামোনিয়া) এবং বিভিন্ন ফ্যাক্টরকে আপনার জিন চিহ্নিত করে দেয় যা মশাকে আকর্ষণ করে।

শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ কর্তৃক এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ ক্ষরিত হয় যা মানুষটির রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে মশাকে বুঝতে সাহায্য করে। আর বাকি থাকা ১৫ ভাগ মানুষ মশার লক্ষ্যবস্তু হয় না। এর কারণ হচ্ছে, মশা সাধারণত অন্যান্য রক্তের গ্রুপের চাইতে ‘ও’ পজেটিভ রক্তকেই বেশী পছন্দ করে।

 

ত্বক

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে মানুষের ত্বক; Photo Source: The Telegraph

দেহের প্রাথমিক প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে ত্বকে প্রচুর পরিমাণে উপকারী ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। ২০১১ সালে PLOS (Public Library of Science) সাময়িকী- তে প্রকাশিত এক এ সম্বন্ধীয় একটি অনুচ্ছেদে বলা হয় যে ত্বকের এসব অণুজীব ম্যালেরিয়া পরজীবী বাহিত মশাদেরকে বেশি আকর্ষণ করে।

 

কাপড়ের রং

অনেকসময় বিপরীত লিঙ্গের কাছে কাপড়ের রং যেমনি এক প্রকারের আকর্ষণ হিসেবে কাজ করে, তেমনি কালো, গাঢ় নীল, লাল পোশাকও মশা কর্তৃক আকর্ষিত হওয়ার জন্য আদর্শ। এ ছাড়া, বিয়ার পানের ফলে আপনার রক্তে উপস্থিত অ্যালকোহল মশার কাছে আপনাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলবে। ডক্টর জাফর ইকবাল এর সাইন্স ফিকশন বিজ্ঞানী অনিক লুম্বা- তে এ ধরণের একটি ঘটনা লক্ষণীয়।

পরেরবার যখন একটি মশা সেকেন্ডে ৩০০-৫০০ বার ডানা ঝাপটিয়ে ঘন্টায় দেড় মাইল বেগে যখন আপনারই দিকে এগিয়ে আসতে থাকবে, তখন তাকে কামড়ানোর কামড়ানোর সুযোগ না দিয়ে হাততালি দিয়ে স্বাগতম জানান।


তথ্যসূত্রঃ  Iflscience, Wikipedia, Smithsonian

 

Feature Photo Source: Agensiacinc.com

Leave a comment

One thought on “মশা আপনাকেই কেন কামড়াতে ভালোবাসে?

  • September 15, 2018 at 10:17 pm
    Permalink

    Well done…Keep it up

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *