সেফাতউল্লাহ: নিজেই যখন রোগী

সেফাত উল্লাহকে চেনেন না বর্তমানে এমন মানুষের সংখ্যা হয়ত হাতে গুণে বের করা যাবে৷ বন্ধুদের আড্ডায়, চায়ের দোকানে, ফেসবুকের নীল দুনিয়ায়, কোথায় নেই তিনি? তবে এই জেনারেশনের একজন হলেও তার উদ্ভট, বিকৃত আর অসুস্থ বিনোদনের খোরাক হওয়া কথাগুলো নিয়ে ট্রল করার আগে আমার দৃষ্টি বারবার নিবদ্ধ হয় তার পরিবারহীন, ভয়ংকর নিঃসঙ্গ, অসুস্থ সত্তাটির দিকে৷ কেননা এসব আচরণ খুব ‘ভালো’ কিছুর ইংগিত দেয় না। তার ভয়ংকর এই অসহায়ত্বটির নাম ‘স্রিজোফ্রেনিয়া’৷ কিভাবে সে এই পথের পথিক হলো? সেই গল্পই আজ শোনাতে যাচ্ছি৷

১৯৭৯-১৯৮০ সালের দিককার কথা৷ তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন৷ তার স্ত্রী ছিলেন একজন বিটিভি কর্মকর্তা৷ প্রবাসী সাংবাদিক ফিরোজ আহমেদ জানিয়েছেন পারিবারিক ঝগড়ার জের ধরে পরবর্তীতে কোর্টের রায়ে দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন তিনি, ফলে অস্ট্রিয়াতে বৈধতা হারান তিনি৷ এরপর স্ত্রী সন্তানেরা তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন৷

স্রিজোফ্রেনিয়া মূলত মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদী জটিল রোগ যা মানুষের কথাবার্তা এবং চিন্তাধারাকে পরিবর্তিত করে দেয়৷ সেফাতউল্লাহর মত এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বাস্তব জগৎ থেকে দূরে সরে যান৷

Photo source: Alamy.de

ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, তিনি মনযোগ বেশিক্ষণ এক বিষয়ে ধরে রাখতে পারেন না, তার মুখের অভিব্যক্তির তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না, কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুতই প্রসঙ্গ পাল্টান, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেন, এক কথা দুই-তিনবার বলেন, নিজেকে ক্ষমতাধর ও গুণী প্রমাণ করেন আর অপ্রয়োজনীয় শো অফের মাধ্যমে সুখী প্রমাণের চেষ্টা করেন, যার প্রত্যেকটি স্রিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ হিসাবে বিবেচিত৷ শুধু একটি ব্যাপারেই কিছুটা সন্দেহ থেকে যায় যে তিনি এ রোগ থাকা সত্ত্বেও ভিয়েনাতে শিক্ষকতা ও পার্টটাইম চাকরী কীভাবে করছেন!

এই রোগটি মূলত জিনগত সমস্যা হিসাবে বিবেচিত৷ তবে রাসায়নিক বিভিন্ন হরমোন যেমন ডোপামিন, সেরটনিন এর অভাবজনিত কারণে কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, বৈরী পরিবেশ এ রোগের কারণ হিসাবে বিবেচিত৷ তবে কিছু দ্রব্য যেমন তামাক, অতিরিক্ত মদ্যপান, মারিজুয়ানা, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধও এ রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী৷

রোগটিতে মস্তিষ্কের গ্লিয়াল কোষ এর মিউটেশন ঘটে৷ অস্ট্রেলিয়ার পার্কভিলে অবস্থিত Florey Institute for Neuroscience & Mental Health– এর এক গবেষণায় দেখা যায় মস্তিষ্কের সম্মুখভাগের কিছু জিনগত পরিবর্তনের জন্য এ সমস্যার সৃষ্টি হয়৷ MRI- তে মস্তিষ্কের ভেণ্ট্রিকলগুলো বড় হয়ে যেতে দেখা যায়৷

স্বাভাবিকের তুলনায় বড় ভেণ্ট্রিকল; Photo Source: Livemint.com

মূলত রোগীর আচরণ আর মুখভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করে রোগটি শনাক্ত করা যায়৷ সন্দেহের বাতিক, হেলুসিনেশন, অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বা আচরণগত সমস্যা ৬ মাসের বেশি হলেই নিউরো বিভাগের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ৷ তবে রাসায়নিক দ্রব্য শনাক্ত করতে রক্ত পরীক্ষা করা প্রয়োজন৷ তাছাড়া মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ টিউমার শনাক্ত করতে ইমেজিং টেকনিকগুলো প্রয়োজন৷  

এ ধরনের রোগীর জন্য নিয়মমাফিক ওষুধ সেবন, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সুপরামর্শ, সর্বোপরি পরিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের সবার যত্ন ও সমর্থন প্রয়োজন৷

পরিশেষে বলব, তামাক বা মাদক সেবন পরিহার করুন৷ পরিবারকে সময় দিন৷ প্রিয়জনদের অবহেলা বা ঘৃণায় নয়, ভালবাসা আর যত্নে আগলে রাখুন৷ নিঃসঙ্গতা না হোক কারো শেষ বয়সের পরিনতি৷ সুস্থ থাকুন৷

শুভকামনা৷

 

Feature Photo Source: Somoy News

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *