হিচহাইকিং: আপনিও হতে পারেন একজন ‘হিচহাইকার’

প্রাত্যহিক জীবনে শত কাজ আর ব্যস্ততার ফলে আমরা প্রায়শই হাঁপিয়ে উঠি। কর্মোদ্যম আর থাকে না। তখন দরকার হয় মনটাকে একটু সতেজ আর প্রফুল্ল করার। আর তাই একটু সময় আর সুযোগ পেলেই ভালো কোনো গান শোনা বা সিনেমা দেখা, বই পড়া, ছবি আঁকা ইত্যাদির মাধ্যমে দেহ ও মনের ক্লান্তি দূর করি। এর বাইরেও অনেকেই অনেকভাবে চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করে। আবার ইবনে বতুতা টাইপের কিছু লোক আছে যারা একটু সুযোগ পেলেই ব্যাগ গোছাতে শুরু করে, বেরিয়ে পড়ে কোথাও ঘুরতে। এই ঘোরাঘুরি তথা ভ্রমণের নেশাটা প্রায় সবারই আছে। তারপরও সবাই ঘুরতে পারে না বিভিন্ন সমস্যার কারণে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যাটা হলো ‘টাকা’। কিন্তু যদি টাকাই না লাগে তাহলে? হ্যাঁ, অবাক হওয়ার কিছু নেই। টাকা বাঁচিয়েও ভ্রমণ করা যেতে পারে, হিচহাইকিং করে। আজকের এউ লেখাটি হিচহাইকিং- কে নিয়েই।

তো কি এই ‘হিচহাইকিং’?

শব্দটা আসলেই অদ্ভুত! আমাদের কাছে খুব একটা পরিচিতও নয়। অভিধান ঘাটলে দেখা যাবে, ‘হিচ’ শব্দের অর্থ হলো ‘বাগড়া দেওয়া, ঝাঁকি দেওয়া’। অথবা সাময়িক ব্যাঘাত ঘটানো। আর ‘হাহকিং’ মানে ভ্রমণ করা। তাহলে হিচহাইকিং শব্দের মানেটা কী দাঁড়ালো?

‘ভ্রমণে বাগড়া দেওয়া’?

নাকি ‘বাগড়া দিয়ে ভ্রমণ করা’?

মানে যাই হোক, ‘হিচহাইকিং’ শব্দটার সঙ্গে বাগড়া দেওয়ার একটা কিছু যে জড়িয়ে আছে সেটা নিশ্চিত। একটু খুলেই বলি। একদিন কয়েকজন বন্ধু মিলে মির্জাপুর থেকে সাভার হয়ে ময়মনসিংহ যাবো। তখন মধ্যরাত। রাস্তায় যানবাহন খুব একটা নেই। তারপরও আমরা নিশ্চিত যে সেখানে যেতে পারবো। এই নিশ্চয়তার পেছনে যেটা ছিল তা হলো ধৈর্য আর সাহস। আমরা রাস্তার পাশে দাঁড়ালাম। হঠাৎ হঠাৎ কিছু ট্রাক আসছে। আমরা হাত তুলছি। কিন্তু থামছে না। গতি আরো বাড়িয়ে আমাদের পাশকেটে চলে যাচ্ছে। এরকম করে একটি-দুটি-তিনটি। এবং আরো কয়েকটি। কিন্তু একসময় একটি ট্রাক থামলো। কথা হলো। আমরা বুঝিয়ে বললাম। প্রথম দিকে কিছুটা অবিশ্বাস থাকলেও পরে ওরা আমাদেরকে বিশ্বাস করলো। আমরা ট্রাকের ডালা বেয়ে পেছন দিকটায় উঠলাম। ট্রাক ছাড়লো- মধ্যরাতের বাতাস কেটে আমরাও এগিয়ে চললাম।

যেখানে নামতে চাইলাম, সেখানেই আমাদের নামিয়ে দিলেন ট্রাকচালক। বিনিময়ে টাকা-পয়সা নিতে চাইলেন না। আমরাই জোর করে কিছু ধরিয়ে দিলাম।

খুব সম্ভবত ‘হিচহাইকিং’ শব্দটার ধারণা একটু হলেও আমরা পেলাম। ওই যে আমরা সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে বাগড়া দিয়ে ট্রাকের গতি থামালাম। তারপর এই ট্রাকে করে ভ্রমণ করলাম। একেই বলা হয় ‘হিচহাইংকিং’। অর্থাৎ ‘বাগড়া দিয়ে ভ্রমণ করা’।

আমাদের দেশে এই শব্দটা খুব পরিচিত না হলেও পশ্চিমা দেশ এবং ইউরোপে এই ভ্রমণ পদ্ধতিটি প্রচলিত। আমরা তো জোর করে হলেও ট্রাকচালককে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু হিচহাইকিং করলে ট্রাক বা বাসের চালকেরা কোনো খরচ নেন না। অর্থাৎ বিনা খরচে ভ্রমণ। বিনা খরচে এই ভ্রমণের জন্য কেবল ইচ্ছা থাকাটাই যথেষ্ট। এর মানে কি বলতে চাইছি, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন- ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়, এই কথাটা একেবারে কল্পনাপ্রসূত নয়।

এখন যে প্রশ্নটা আপনার মনে জাগছে তাহলো কীভাবে শুরু করবো। এর জন্য প্রথমেই প্রস্তুত রাখতে হবে আপনার বুড়ো আঙ্গুলকে। হিচহাইকিংয়ের প্রতীক হলো এই ‘বুড়ো আঙ্গুল’।

Photo Source: Pixabay

সড়কের পাশে একটা সুবিধাজনক জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনার বুড়ো আঙ্গুল তুলবেন, যারা বুঝবে তারা গাড়ি থামাবে। আবার অনেকেই পাশ কাটিয়ে যাবে। হাল ছাড়বেন না। তবে আমাদের দেশে বুড়ো আঙ্গুল তোলা ঝুঁকির কাজও বটে। যারা ইউরোপ অথবা পশ্চিমা কোনো দেশে যাবেন, কিন্তু বিনা খরচায় ঘুরতে চান তারা এই সুযোগটা নিতে পারেন। যেসব চালকের ইচ্ছা হবে না, তারা আপনাকে দেখে গাড়ি থামাবে না। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করুন, দেখবেন দয়ালু কোনো চালক আপনার পাশে গাড়ি থামাবে এবং আপনাকে নিরাপদে তুলে নেবে।

সব চালক যে একই মানসিকতার হবে তা কিন্তু নয়। তবে যে চালক আপনাকে তুলে নেবে তার আচরণ বন্ধুসুলভ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসৎ চালকেরই পাল্লায় পড়ায় সম্ভাবনাও কম থাকে না। পড়তে হতে পারে অনেক বড় বিপদে। কখনো এর উল্টোটাও হয়। অর্থাৎ এমন অনেক প্রতারক আছে যারা হিচহাইকার সেজে পাড়ি ছিনতাই করে। এসব ক্ষেত্রে যে জিনিসটা জরুরি সেটা হল পারস্পারিক আস্থা। বিশ্বাসযোগ্যতার পাশাপাশি একজন অন্যজনের মনের ভাষা পড়তে পারাটাও দরকারি।

হিচহাইকিং এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা পয়সা বাঁচানো হলেও আরো কিছু উল্লেখযোগ্য দিক আছে। এমন একটা ভ্রমণে আপনি যাচ্ছেন যেটার ব্যাপারে আপনি কিংবা আপনার পরিচিত কেউ কখনই যাওয়া দূরে থাকুক হয়ত নামও শোনেনি। সম্পূর্ণ নতুন একটা অভিজ্ঞতা অর্জন হবে। আপনি যদি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় হন তাহলে ভিন্ন রকমের একটা রোমাঞ্চের স্বাদ পাবেন। আবার নতুন কিছু মানুষের সাথে পরিচিত হবেন, বন্ধুত্ব হবে। পরিবেশ দূষণও কম হবে। গাড়িটা তো সেটার গন্তব্যে যেতই, মাঝখান থেকে আপনিও সেটাতে গেলেন। এতে করে আপনার জন্য নতুন আরেকটা গাড়ি লাগবে না। ফলে বাড়তি দূষণ হবে না। আবার যানজটও কমবে।

 

Photo Source: Pixabay.com

কিছু কিছু দেশ আছে, সেখানে ভাড়া দিয়ে গাড়িতে চলার চেয়ে পর্যটকদের জন্য হিচহাইকিং করাই বেশি সুবিধা। তবে এর জন্য হাতে সময় রাখতে হবে। আপনি তো ভ্রমণে যাবেন অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্যই, মানুষের সঙ্গে মেশার জন্য। সেক্ষেত্রে সময় নিয়ে হিচহাইকিং করতে পারেন। তুরস্ক, আর্জেন্টিনা, চিলি ও উরুগুয়েতে এটি ব্যাপক প্রচলিত। এসব দেশে গাড়ির জন্য লাইনে দাঁড়ানোর চেয়ে বুড়ো আঙ্গুল তুলে দাঁড়ালে দ্রুত গাড়ি পাওয়া যায়।

হিচহাইকিংয়ে যেমন অ্যাডভেঞ্চার থাকে তেমনি ঝুঁকিও কম নয়। একা হাইকিং করার চেয়ে দুইজন বা কয়েকজন মিলে করাটা বুদ্ধিমানের কাজ। সংবাদমাধ্যমে মাঝে-মধ্যেই হিচহাইকারদের ধর্ষণ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়। শুনা যায় ডাকাতি ও রোমহর্ষক ঘটনার কথা। এসব নিয়ে কিছু ভৌতিক কাহিনীও প্রচলিত আছে। হিচহাইকিং নিয়ে তৈরি হয়েছে কিছু রোমাঞ্চ সিনেমাও। এতোসব জেনেও হাইকাররা পথে বের হন। ভ্রমণ যার নেশা, ঘর তাকে আটকে রাখতে পারে না। অনেক মেয়েও হিচহাইকিং করে থাকে। তবে সেক্ষেত্রে সাথে পুরুষ থাকা উচিত। একা একজন মেয়ে আজকাল কোনোভাবেই বাইরে নিরাপদ নয়। অনেকেই বাঁকা চোখে দেখবে, বাজে মন্তব্যও করবে। কিন্তু সঙ্গে একজন পুরুষ থাকলে সেটা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। নিরাপত্তাও কিছুটা বাড়ে। নিরাপত্তার খাতিরে গাড়িতে ওঠার আগে এসএমএস করে বন্ধু-বান্ধবদের গাড়ির নাম্বার জানিয়ে দিলে সবচেয়ে ভালো হয়। আর গাড়ির চালকের ভাবগতিকও ভালো করে লক্ষ্য করতে হবে।

হিচহাইকিং এর শুরুটা বেশিদিন আগের নয়। সত্তরের দশকে কয়েকজন মার্কিন ছাত্র ইউরোপে গিয়ে খালি পকেটে ঢ্যাঙ-ঢ্যাঙ করে ঘুরে বেড়ানো কিছু লোককে এটা শেখান। এদেরকে সঙ্গে নিয়ে তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে ভারতে পর্যন্ত পৌঁছান। তাদের এই ভ্রমণপথটার নাম দেওয়া হয়েছিলো ‘হিপ্পি ট্রেইল।’

সময় থেমে নেই। অনেক কিছুই বদলে গেছে। সময়ের সাথে সাথে মানুষও বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে। পৃথিবীও অনেকটা জটিল হয়ে উঠেছে। কিন্তু হিচহাইকাররা সেই আগের মতোই আছে। তারা কেবল রাস্তার পাশে বুড়ো আঙুল পেছনে কাত করে দাঁড়িয়ে থাকেন।

অথচ আমাদের দেশে এখনো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ মানুষই হিচহাইকিং সম্পর্কে কিছুই জানে না, নামটাও শোনে নি। পাশের দেশ ভারতেরও একই অবস্থা। তবে ভারতে সেখানে পশ্চিমা অনেকে এসে কিন্তু হিচহাইকিং করে যান। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের অবস্থা আরো কিছুটা উন্নত। ওখানেও সাধারণ লোকদের এর সঙ্গে পরিচয় নেই। কিন্তু কেউ হিচহাইকিং করতে চাইলে তেমন সমস্যাও হয় না। কয়েকজন পর্যটক নিজেদের অভিজ্ঞতায় জানিয়েছেন, পাকিস্তানের চালকেরা সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি সতর্কও করেন। তারা জানিয়ে দেন- এবার আমার মতো ভালো চালক পেয়েছো বলে বেঁচে গেছো। পরে কিন্তু এই ঝুঁকিটা নেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু যারা ঝুঁকি নিতে অভ্যস্ত, তারা পরেরবারও ঝুঁকি নেন। এবং বেশিরভাগ হিচহাইকাররা নিরাপদেই হাইকিং করতে পারেন।

বাংলাদেশের রোমাঞ্চ প্রিয়দের জন্য হিচহাইকিং একটা ‘গ্রেট অপরচুনিটি’। আমাদের দেশে দর্শনীয় স্থান নেহাত কম নয়। সুতরাং একটু ঝুঁকি নিয়ে হলেও অ্যাডভেঞ্চারের খোজে বেরিয়ে পড়ুন। নতুন একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করুন।

 

Feature Photo Source: Pixabay.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *