পৃথিবী বিখ্যাত ১০ গুপ্ত সংগঠন

১. স্কাল এন্ড বোন্‌স

স্কাল এন্ড বোন্‌স এর সদস্য (জর্জ বুশ ঘড়ির বাম পাশে), ১৯৪৭।
Photo Source: Mintpressnews.com

দ্য অর্ডার অব স্কাল এন্ড বোন্‌স হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গোপন সংস্থা। এদের মূল নাম ছিল ব্রাদারহুড অব ডেথ বা মৃত্যুর ভ্রাতৃসংঘ। যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্রদের প্রাচীনতম গুপ্ত সংগঠন। ১৮৩২ সালে এই সংগঠন গঠিত হয়। অভিজাত কিছু মানুষের জন্য এই সংগঠনের সদস্য হওয়া ছিল সহজ। এই সংগঠনটি বর্তমানে ম্যাসনিক অনুষ্ঠান পালন করে। প্রতি বৃহস্পতিবার এবং রবিবার সদস্যরা একটি ভবনে মিলিত হয় যেটিকে তারা ডাকে- টম্ব।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সংরক্ষক জুডি স্কিফ এর ভাষ্য অনুযায়ী ১৯৭০ সাল পর্যন্ত স্কাল এন্ড বোন্‌স এর সদস্যদের নাম গোপন রাখা হতোনা, কিন্তু উৎসব গুলো পালিত হতো। বুশ প্রেসিডেন্টদের দুইজনই ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এই সংগঠনের সদস্য ছিলেন। এছাড়া সংগঠনের অন্য অনেক সদস্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

এই সংগঠন নিয়ে অনেক রকম গুজব প্রচলিত আছে তার মধ্যে জনপ্রিয় একটি হলো- CIA এই সংগঠনের সদস্যরাই তৈরী করেছিল। অবশ্য ২০০৭ সালে CIA একটি বিবৃতিতে এরকম মতবাদকে অস্বীকার করে। তবুও স্কাল এন্ড বোন্‌সকেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে ধারণা করা হয়।

 

২. ফ্রিম্যাসন

ফ্রিম্যাসনদের বাৎসরিক সভা (১৯৯২)
Photo Source: Youtube.com

১৭১৭ সালে গ্র্যান্ড ম্যাসনিক লজ তৈরী করা হয়। এই সংগঠনে তিন ধরনের সদস্য শ্রেণি আছে। প্রথম ডিগ্রি, দ্বিতীয় ডিগ্রি এবং তৃতীয় ডিগ্রি। তবে প্রাথমিক দিকে এই শ্রেনি বিভাগে তৃতীয় ডিগ্রি ছিলনা। ১৭৫০ সালে তৃতীয় ডিগ্রি প্রচলিত হয়। এই কারনে অবশ্য ম্যাসনদের মধ্যে সমস্যা শুরু হয়। কোনো সদস্য যখন তৃতীয় ডিগ্রিতে পৌঁছায় তখন তাকে মাস্টার ম্যাসন বলা হয়।

ম্যাসনরা তাদের সভা গুলো আনুষ্ঠানিকভাবেই পালন করে। এতে বিভিন্ন চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন কম্পাস, বর্গ ইত্যাদি। এগুলো দিয়ে “ঈশ্বর মহাবিশ্বের মহান স্থপতি” এই বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়। ম্যাসনদের তিনটি ডিগ্রি হলোঃ

  • প্রবিষ্ট শিক্ষানবিশঃ এই ধাপে একজন সংগঠনের সাধারণ সদস্য হতে পারে।
  • ফেলো ক্রাফটঃ এটি ইন্টারমেডিয়েট পর্যায়ের ডিগ্রি যেখানে একজনকে ম্যাসনারি                                                        সম্পর্কে অনেক ধারণা দেওয়া হয়।
  • মাস্টার ম্যাসনঃ বেশিরভাগ ম্যাসনিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে হলে এই ডিগ্রি অর্জন করতে হবে।

ম্যাসনরা সভাতে এবং নিজেদের মধ্যে পরিচিত হতে কিছু ইঙ্গিত ব্যবহার করে। এই চিহ্নগুলো দিয়েই তারা তাদের সংগঠনের সদস্যদের চিনতে পারে। মধ্যযুগের ম্যাসনরা ভিন্ন ঢঙের পোশাক পরতো। যেমন- এপ্রোন।

ম্যাসনের সদস্য হতে হলে প্রথমে একজন ম্যাসনের সুপারিশ প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে তিনজনের সুপারিশও লাগতে পারে। এছাড়া সদস্য হতে হলে নূন্যতম ১৮ বছর হতে হবে।

 

৩. রসিক্রুসিয়ান

রসিক্রুসিয়ানদের গুপ্ত প্রতীক।
Photo Source: Historicmysteries.com

১৪৫৯ সালে তিনটি ডকুমেন্ট প্রকাশিত হওয়ার পর রসিক্রিসিয়ানের ধারণা প্রবর্তিত হয়, মনে করা হয় এরা হলো ১৬০০ সালের একদল জার্মান প্রটেস্ট্যান্ট। এই ডকুমেন্টগুলো ব্যাপকভাবে পঠিত হয়েছিল এবং ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল যে ১৭ শতককে ফ্রান্সিস ইয়েটস রসিক্রুশিয়ান ইনলাইটেনমেন্ট হিসেবে ধারণা করেছেন। মোট তিনটি ডকুমেন্ট ছিল। প্রথম ডকুমেন্টে একজন রহস্যময় আলকেমিস্ট (ক্রিশ্চিয়ান রোজেনক্রুজ) নিয়ে বলা হয় যিনি পৃথিবীর নানা স্থানে গিয়ে গুপ্ত বিদ্যা অর্জন করেন। দ্বিতীয় ডকুমেন্টে একদল গোপন আলকেমিস্টের কথা বলা হয় যারা কিনা ইউরোপের রাজনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিল। তৃতীয় ডকুমেন্টে ক্রিশ্চিয়ান রোজেনক্রুজের আবিষ্কার বর্ণনা করা হয়েছে।

রসিক্রুসিয়ানের বর্তমান সদস্যরা দাবি করে যে এই সংস্থা ডকুমেন্টগুলো প্রকাশিত হওয়ারও বহু আগে থেকেই ছিল। রসিক্রুসিয়ানদের মধ্যে ম্যাসনদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

 

৪. অর্ডো টেমপ্লিস ওরিয়েন্টিস

ওটো সরঞ্জাম নিয়ে ক্রোওলি দাঁড়িয়ে আছেন।
Photo Source: Ayay.co.uk

 

দি ওটো (অর্ডার অব দ্য টেমপলস অব দ্য ইস্ট) ম্যাসনারি মডেলের সংস্থা। ম্যাসনারি মডেলের হলেও এলিস্টার ক্রোওলি এর নেতৃত্বে এই সংগঠনটি থেলেমা নামক এক নীতি শুরু করে। এই নীতি একক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত- “Do what thou wilt shall be the whole of the law, love is the law, love under the will”

এর সদস্যদের ২টি শ্রেণি। অভিজ্ঞতা অনুসারে পদ উপরে উঠবে। ওটো দাবি করে সারা পৃথিবীতে তাদের ৩০০০ এর বেশি সদস্য আছে।

তাদের আচার অনুষ্ঠানগুলো অনেক নিয়ম কানুন মেনে পালন করা হয়।

 

৫. হার্মেটিক অর্ডার অব দ্য গোল্ডেন ডন

গোল্ডেন ডনের চিহ্ন।
Photo Source: Forbiddensymbols.com

উক্ত সংগঠনটি তিনজন ম্যাসন ডক্টর উইলিয়াম রবার্ট উডম্যান, উইলিয়াম ওয়েইন ওয়েস্টকোট, স্যামুয়েল লিডেল ম্যাকগ্রেগর ম্যাদারস প্রতিষ্ঠা করেন। এরা ফ্রিম্যাসনের পাশাপাশি এংলিয়া এর সোসাইটাস রসিক্রুসিয়ানা এর সদস্য ছিলেন। গোল্ডেন ডনের নীতিমালা খ্রিষ্টান ধর্ম, ক্বাবালা, হার্মেটিসিজ্‌ম, প্রাচীন ইজিপ্টের ধর্ম, ফ্রিম্যাসনারি, আলকেমি ইত্যাদি থেকে নেওয়া হয়েছে। এই সংগঠনের দুইজন বিখ্যাত সদস্য হলেন উইলিয়াম ইয়েটস এবং এলিস্টার ক্রোওলি।

এর মূল ডকুমেন্টগুলোকে সাইফার ডকুমেন্ট হিসেবে ডাকা হয়। এগুলো পরে ইংরেজিতে রূপান্তরিত করা হয়। ডকুমেন্টগুলো ৬০ ফোলিও নিয়ে গঠিত যেগুলোতে যাদুকরী নীতির কথা উল্লেখ রয়েছে।

 

৬. দ্য নাইটস টেম্পলার

মধ্যযুগীয় টেম্পলারের তরবারি।
Photo Source: Bladesandbows.co.uk

বর্তমানের নাইটস টেম্পলাররা হলো ম্যাসনারির একটি অফ-শুট। এদের প্রকৃত নাইটস টেম্পলারদের সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃত নাইটস টেম্পলাররা ছিলেন ১২ শতকের একদল ধর্মীয় মিলিটারি। ম্যাসনিক টেম্পলাররা এরকম কোনো দাবিও করেনা।  তবে তারা মধ্যযুগীয় নাইটস টেম্পলারদের চিহ্ন ব্যবহার করে।

এর সদস্য হতে হলে একজনকে খ্রিষ্টান মাস্টার ম্যাসন হতে হবে। তবে এটি একটি স্বতন্ত্র সংস্থা।

 

৭. ইলুমিনাতি

পিরামিড ইলুমিনাতির একটি প্রতীক।
Photo Source: Documentarytube.com

১৭৭৬ সালের ১লা মে ইলুমিনাতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মুক্তচিন্তাবিদদের একটি সংগঠন। এর অনুসারীরা এর নামকরণ করে ইলুমিনাতি। এই সংস্থা এখন বাভারিয়ান ইলুমিনাতি নামে পরিচিত। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই সংস্থার সদস্য। যদিও এখানে ম্যাসনারির অনেক সদস্য রয়েছে কিন্তু একে কখনো ম্যাসনারিদের সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়না। ইলুমিনাতিরা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মে বিশ্বাসী নয়। তাদের ধর্ম হলো মানবধর্ম। এই কারণে একটি ব্যাপক ধারণা হলো ইলুমিনাতিরা বিশ্বব্যাপী এই মানবধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইলুমিনাতি নিয়ে অনেক ধারণাই রয়েছে। মনে করা হয় আমেরিকান সংস্থা স্কাল এন্ড বোন্‌স হলো ইলুমিনাতির একটি শাখা।

অনেকে আবার মনে করে ইলুমিনাতিরাই পৃথিবীর সকল গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ছড়িয়ে আছে এবং তারাই পৃথিবীর সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। এরকম একটা ধারণা আছে যে তারা ওয়ান ওয়ার্ল্ড অর্ডার প্রতিষ্ঠা করতে চায় যার মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে নাস্তিক্যবাদ এবং মানবধর্মের উপর।

 

৮. দ্য বিল্ডারবার্গ গ্রুপ

এই সংস্থাটি অন্যান্য সংস্থা থেকে আলাদা। এর আনুষ্ঠানিক কোনো মেম্বারশিপ নেই। তবে এটি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গ্রুপ যারা প্রতি বছর সভা করে।

 

৯. দ্য প্রায়োরি অব সিওন

প্রায়োরি অব সিওনের প্রতীক।
Photo Source: Imperiya.by

ড্যান ব্রাউনের বিখ্যাত বই দ্য দা ভিঞ্চি কোড প্রকাশিত হওয়ার পর প্রায়োরি অব সিওন নিয়ে অনেক কৌতূহল ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু যারা যারা এই গ্রুপের সদস্য হতে চায় তাদের জন্য দুঃখের বিষয় হলো এই সংস্থাটি কাল্পনিক। ১৯৫৬ সালে এই একদল প্রতারক এই নামে একটি সংগঠন চালু করে।

বিখ্যাত কিছু বই- দ্য হলি ব্লাড এবং দ্য হলি গ্রেইল এর লেখকরাও এই প্রতারনার‍্য ভুল পথে পরিচালিত হয়েছেন।

 

১০. অপাস দেই

Photo Source: Stjosemaria.org

অপাস দেই ক্যাথলিক চার্চের একটি সংগঠন।  ড্যান ব্রাউনের দ্য দা ভিঞ্চি কোডে বলা হয়েছে অপাস দেই হলো একটি গুপ্ত সংগঠন যারা প্রায়োরি অব সিওনকে পরাজিত করতে চায় এবং খ্রিষ্টান ধর্মের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে চায়।

খ্রিষ্টান চার্চগুলো সব গুপ্ত সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে কিন্তু অপাস দেই এর তদন্তকারীরা বারবারই দাবী করছে এরা কোনো অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ গোপনে কাজ করছে।

Feature Photo Source: Thecoolist.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *