ট্রয় নগরীঃ সত্যি নাকি কল্পনা

ট্রয়। অমরত্বের সোপান কে অতিক্রম করে চলা এক অজর অবিনাশী নাম। হিট্টাইট সাম্রাজ্যের এই সর্বাধিক শক্তিশালী করদ রাজ্যের কাহিনী আমাদেরকে উদ্বেলিত করেছে গত ৩২০০ বছর ধরে। হেক্টরঊ ,একিলিস,প্যারিস,প্রিয়াম আর অ্যাগামেনন। এক সময়ে আমরা জানতাম এই ট্রয় এর কাহিনী নিছক কল্পনা। তবে সেটা আর আজকে নেইউ। আজকে আমরা জানি যে ট্রয় ছিল একদম সত্যি ঘটনা বা ট্রয় এর যুদ্ধ সত্যিই হয়েছিল। আর তা হয়েছিল ইজিয়ান সাগর এর তীরে দুই শক্তি মাইসেনিয়ান গ্রীক আর হিট্টাইট ট্রয় এর ভেতরে। তাহলে দেখা যাক আসলেই এই ট্রয় ছিল আমাদের এই ধরাতে নাকি এটা আসলেই এক কল্পকথা।

চিত্রঃ মাইসিনিয়ান গ্রীস।
Photo Source: Wikipedia.org

উপরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে মাইসিনিয়ান গ্রীস রাজ্যকে। আর তার পাশে দেখা যাচ্ছে তাদের প্রতিপক্ষ ট্রয় কে। ট্রয় আর মাইসিনিয়ানদের লড়াই এর মাঝে আজকে যেমনভাবে হেলেন আর গ্রীক দেবদেবীদের আনা হয়েছে, এই যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে এমন ছিল না। মূলত ট্রয় নগরীর অ্যানাতোলিয়া থেকেই আদি গ্রীক জাতি সমূহের উত্থান। গ্রীস এর আদি নিবাসী রা বর্তমানে বুলগেরিয়া বা থ্রেস এ অবস্থান করেন।

 

কোন ট্রয় ?

আমরা এমনিতে জানি যে ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়েছিল ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে। তবে আমরা কি এটা জানি যে প্রথম ট্রয় নগরী তৈরি হয়েছিল ক্যালিওলিথিক বা তাম্র যুগে? সেই নগরী বা ট্রোয়াস ভিলেজ ধ্বংস হয় এই গ্রীকদের হাতেই। যে ট্রয় এর কথা আমরা পড়ে থাকি , সেটিকে আর্কিওলজিস্টরা বলেন Troy VII বা ট্রয় সপ্তম।

নিচে এই ট্রয় এর সমগ্র মানচিত্র দেওয়া হল।

চিত্রঃ ট্রোয়াস উপকন্ঠ, এর মাঝে  একদিকে ট্রয় নগরীকেও দেখা যাচ্ছে।
Photo Source: Wikipedia.org

সেই ট্রয়াস ভিলেজ আজকে বিগা পেনিনসুলা নামে পরিচিত। আর সেই ভিলেজ থেকে তৈরি হয়েছিল অনেকগুলো শহর। যাদের মাঝে ছিল লেজেন্ডারি ট্রয় নগরীও। আসলে এই ট্রয় এর নাম এসেছে গ্রীক ভাষা থেকে। এর আদি আসল নাম ছিল হিট্টাইট ভাষাতে। সেই নামটি ছিল টারুইসা (Taruiša.)। আবার অনেক পণ্ডিত এর মতে সেটি ছিল উইলুসা (Wilusa)।

এই কারণে আমরা বলতে পারি বার বার ধ্বংস হতে হতে সপ্তম ট্রয় নগরী হোমার এর ইলিয়াডে অমরত্ব লাভ করে।

আজকের ট্রয় কোথায় ?

আজকের ট্রয় যে স্থানে অবস্থিত , তাকে বলা হয় হিসারলিক এর স্তুপ। অপর কথাতে Mound of Hisarlic। এই হিসারলিক মাউন্ড থেকেই বের হয়ে আসে ইতিহাসের আলোকচ্ছটা ট্রয় নগরীর কথা। এই হিসারলিক মাউন্ড কে বহু আগে থেকেই তুর্কিরা পবিত্র জ্ঞান করতেন। আর এই ট্রয় কে জ্ঞান করতেন ইতিহাস এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে। ট্রয় এর যে ক্ষেত্রটি রয়েছে সেখানে এমনকি তারা কোন বাড়িঘর পর্যন্ত তৈরি করেননি প্রায় ১৮০০ বছর ধরে। তারা এর আশেপাশে বাড়ি  তৈরি করলেও ট্রয় নগরীকে রাখতেন অক্ষত।

হিসারলিক এবং ট্রয় এর বিভিন্ন স্তর, প্রথম কমলা স্তর এ তৃতীয় ট্রয় এর অবস্থান দেখানো হয়েছে, এরপরের গোলাপি স্তর এর মাঝে ট্রয় যুদ্ধের ট্রয়। তার উপরে দেখানো হয়ে পারসিক যুগের ট্রয় নীল স্তর এর মাধ্যমে। যার উপরিভাগে এখনও প্রাচীন ভবন বিদ্যমান। পেড্রো তাফুর নামের একজন ষোড়শ শতকের অভিযাত্রী ট্রয়-কে দেখেছিলেন ধ্বংসাবশেষ রূপে সেটা জানিয়েছিলেন তার ডায়েরিতে।

হিসারলিক দুর্গের এক লীলাভূমি। এমনকি এর নামের অর্থই হচ্ছে দুর্গের স্থল বা Place Of Fortress.

 

ট্রয় এর যুদ্ধ কি আসলেই হয়েছিল? হোমার কি সত্যি বলেছিলেন ?

 

হোমার এর ন্যায় একজন অন্ধ ভিক্ষুক যিনি তার জীবদ্দশাতে কখনই গ্রীস এর বাইরে যাননি। তিনি তার ইলিয়াডে এমন সব নগরীর কথা উল্লেখ করে গেছেন যেগুলো মাইসিনীয় সভ্যতার সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তার লেখনিতে সেই সময়কার এথেন্স আর স্পার্টার কথাই শুধু আসেনি এসেছে Pylos বা পিলিয়াস শহরের কথা। যা প্রায় ৪০০ বছর আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও তিনি হিসারলিক এর পূর্বনাম মাউন্ট ইডা বা ইডার পাহাড় এর কথা উল্লেখ করেছিলেন তার লেখনিতে। ইডার উপরে যে ট্রয়’র কথা তিনি বলে গেছেন, সেখানে আজকে সত্যিই আমরা ট্রয় এর ধ্বংসাবশেষ পেয়েছি।

চিত্রঃ হোমার এর প্রদান করা শহর সমূহের নাম এবং অবস্থান।
Photo Source: Atlantisbolivia.org

মাইসিন সভ্যতার প্রমাণ ইলিয়াড সম্পর্কেঃ

আমরা জানি ইলিয়াড এর সভ্যতা ছিল মাইসিনিয়। মাইসিনিয় লিপি লেখা হত লিনিয়ার বি টেকনিক দিয়ে। লিনিয়ার বি ছিল ছোট ছোট লিপি যা একদম সরলরৈখিক ভাবে তৈরি করা হত। সেখানে আমরা দেখা পাই একিলিস নামের গ্রীক পক্ষের এক মহাযোদ্ধার। যদিও এই একিলিস ছিল একজন শেপার্ড বা রাখাল। একিলিসের নাম পাওয়াতে আমরা দেখতে পাই যে সেই সময়ে এটি ছিল প্রচলিত নাম। এটি কোন সিম্বোলিক নাম না। তবে হোমার এর সময়কালে কেউ এসব নাম রাখত না। তবে নসোস আর পিলিয়া থেকে যে সমস্ত প্রত্ননিদর্শন উদ্ধার করা হয়েছে, তাতেও ট্রয় এর নামটার সাথে সাথে, তার সেই সময়ের নায়কদের নামও পাওয়া গেছে। এটাই প্রমাণ করে যে ইলিয়াড ইতিহাস নির্ভর কল্পনা নির্ভর না।

 

হিট্টাইট প্রমাণ

আমাদের মাঝে ট্রয় এর সবথেকে জোরালো প্রমাণ এসেছে হিট্টাইটদের কাছ থেকে। আমরা জানি যে হিট্টাইটরা ছিল ট্রয় এর প্রতিবেশী সাম্রাজ্য। অনেকে মনে করে থাকেন ট্রয় ছিল হিট্টাইটদের একটি অধীন রাজ্য।

আমরা হিট্টাইট দের অথ্য থেকে জানতে পারি, তাদের পাশে আহিউয়া নামের এক রাজ্যের অবস্থান ছিল। সেখানকার রাজ্যকে তারা নাম করণ করেছিলেন উইলুসা। এই ব্যপারে সর্বপ্রথম প্রত্নতত্ত্ববিদ এমিল ফুরিয়ার তার গবেষণাতে উল্লেখ করেন ১৯২৫-২৬ সনে। এরপরে তিনি তার গবেষণার মাধ্যমে দেখান যে এক রাজা আলাক্সাউন্ডস (আলেক্সান্ডার) এর সাথে হিট্টাইট সম্রাট মুয়াতাল্লি একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনেকেই হয়ত জানেন না যে আলেক্সান্ডার ছিল প্যারিস এর অপর নাম। হেক্টর এর মৃত্যুর পর প্যারিস হয়েছিলেন ট্রয় এর রাজা। অনেকের মতে Willusa ছিল ইলিরিয়া এর হিট্টাইট নাম। আর ট্রোজান এরিয়া’র কাছাকাছি এলাকাকে ইলিরিয়া নামেই ডাকা হত প্রাচীন গ্রীসে। আর আহিউয়া ছিল মূলত একেয়ান(অ্যানাতোলিয়ান) গ্রীক দের নাম।

তবে ট্রোজান রা মূলত গ্রীক ছিলেন না। ছিলেন হিট্টাইট। তাদের কাছ থেকে পাওয়া গয়না, তাদের পটারি বা মৃৎশিল্পের মাঝে আমরা পাই যে সেটি ছিল পুরোপুরি হিট্টাইট।

আজও আমাদের মাঝে ট্রয় এক বিস্ময় এর নাম। ট্রয় এর মাঝে আমরা খুঁজে পাই বীরত্ব কে । প্রেম কে, নিয়তি কে। আর এর সাথে সাথে ট্রয় আমাদের মাঝে নিয়ে আসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরনো এক যুদ্ধ দামামাকে। যে যুদ্ধের গাথা আমরা পাই এক অন্ধ ভিক্ষুকের কাছ থেকে। যিনি ট্রয় এর কাহিনী কে গানের আকারে বলে ভিক্ষে করতেন গ্রীস এর রাস্তাতে রাস্তাতে। তাদের শহরের চারপাশ দিয়ে ঘেরা পরিখা যা ১৯৯৩ সালের ম্যাগনেটিক রিডিং এ পাওয়া গেছিল হিসারলিক এর। এটাই প্রমাণ করে যে এই যুদ্ধ সত্যিই সেই সময়ে হয়েছিল। কিন্ত সেটি ছিল মূলত ধাতুর জন্য। স্বর্ণ আপেল বলতে মূলত সেই সময় এর ব্রোঞ্জ এর অবারিত ভান্ডার যা ছিল ট্রয় এর মাঝে তাকে লুট করার জন্যই এসেছিল গ্রীকরা। সে গাথা হয়তবা এতটা মহান হত না। এই কারণে হেলেন নামের এক কাল্পনিক নারীর আবির্ভাব ঘটিয়েছিলেন মহাকবি হোমার ।

 

আজকে জানলাম আমরা ট্রয় এর কথা। এর পরের বার কথা হবে ট্রোজান ওয়ার নিয়ে। আসলে কি ছিল সেই যুদ্ধ। আজকে এই পর্যন্তই।

Feature Photo Source: Ancientworldwonders.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *