স্টেমসেল: প্রকৃতির নিজস্ব আরোগ্য কৌশল এবং দন্ত চিকিৎসাতে এর ব্যবহার

বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে সর্বপ্রথম ‘স্টেম সেল’ এর ধারনা দেন রুশ বিজ্ঞানী ম্যাক্সিমভ। কোষ ও কোষের গঠন আবিষ্কার তারও বহু আগে, বৃটিশ প্রকৌশলী রবার্ট হুক এর হাত ধরে। জীবদেহের গঠন ও কাজের মূল এ একক নিয়ে বিংশ শতাব্দীতে গুরুত্বপূর্ন অনেক কাজই করেছেন আধুনিক কোষ বিদ্যার জনক কার্ল পিয়েরে সোয়ানসন। ধারনা করা হয়, মানবদেহে প্রায় ট্রিলিয়ন কোষ আছে।

Photo Credit: PicSnaper

এককোষী জাইগোট এমব্রায়োজেনেসিস পদ্ধতিতে ক্রমান্বয়ে মরুলা, ব্লাস্টুলা এবং গ্যাস্ট্রুলা থেকে পরিণত হয় পূর্ণাঙ্গ শিশুতে। মাতৃগর্ভে এ প্রক্রিয়া প্রায় নয় মাস ধরে চলে। এককোষী এই জাইগোট থেকে জন্ম নেয় মানবদেহের প্রায় দুইশ ধরণের কোষ। এই ধরণের কোষগুলো বারবার বিভাজিত ও পৃথক হয়ে তৈরী করে বাকি সমস্ত কোষ।

দেহের এ শ’দুয়েক প্রাথমিক কোষগুলোই যেনো বৃক্ষের কান্ডের ন্যায়। তার থেকে শাখা-প্রশাখা-উপশাখার মতো তৈরী হয় দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, রক্তকণিকা ইত্যাদি। তাই বিশেষ ধরণের এই কোষ গুলোর নাম দেয়া হয়েছে ‘স্টেমসেল’।

স্টেমসেল হতে উৎপন্ন হওয়া কোষ, যেমন স্নায়ু কোষ, লিভার কোষ, রক্ত কণিকা; Photo Credit: Pinterest

স্টেমসেলের বিশেষত্ব হলো এরা প্রয়োজনে বিভিন্ন স্পেশালাইজড কোষে পরিণত হতে পারে, সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে। স্টেমসেল নিয়ে যদি কালচার করা যায় তাহলে আমরা মানবদেহের যেকোন ধরণের কোষ তৈরী করতে পারবো, প্রতিস্থাপন করতে পারবো যেকোন অঙ্গ। কোষ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে রোগ সারিয়ে তোলার এ পদ্ধতিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিজেনারেটিভ মেডিসিন’ বলা হয়। আশা করা যায় ভবিষ্যতে ডায়বেটিস, পারকিনস, অ্যালঝাইমার, মাসক্যুলার ডিস্ট্রপি, এমনকি ক্যান্সার এর মতো রোগ প্রতিরোধ করাও সম্ভব হবে এ চিকিৎসা পদ্ধতিতে।

স্টেমসেলের কয়েকটি প্রকারভেদ হলো এম্বাইয়োনিক স্টেমসেল, ফিটাল স্টেমসেল, এডাল্ট স্টেমসেল ইত্যাদি যাদের সংগ্রহ করা হয় ব্লাস্টোসিস্ট থেকে।

যে ব্লাস্টোসিস্ট থেকে এ কোষগুলো নেয়া হয় সেটি আর বাঁচবে না। যা অনেকটা ভ্রূণ হত্যার মতোই। ফলে নৈতিকতার বিচারে এটি সামাজিক ভাবে গৃহীত হয় নি। অবশ্য টেস্টটিউব বেবি গবেষণায় ব্যবহৃত অপ্রয়োজনীয় ব্লাস্টোসিস্ট থেকে এ কোষ গুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তবে আজ বলবো এডাল্ট স্টেমসেল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ন আবিষ্কার সম্পর্কে।

এবার চলে যাই সুদূর আমেরিকার মেরিল্যান্ড স্টেট- এ। কয়েক বছর আগে পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির অ্যানাটমি, জীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও প্রফেসর সানতিয়াগো শি তার মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন মেরিল্যান্ডে। সেখানে তার ছয় বছরের মেয়ে জুলিয়ার প্রথম দুধ দাঁত পড়ে। প্রফেসর শি অভিজ্ঞ চোখে দাঁতটি নিয়ে পরীক্ষা করে তিনি কিছু গোলাপী কোষ দাঁতের গোড়ায় দেখতে পান।

তিনি বুঝতে পারেন এগুলো ডেন্টাল পাল্প কিন্তু তিনি মনের থেকে এই সন্দেহ দূর করতে পারেননি যে এই ডেন্টাল পাল্পের অনেকগুলো বায়োলজিক্যাল বৈশিষ্ট আছে। এর কিছু সপ্তাহ পর জুলিয়ার দ্বিতীয় দাঁতটি পড়ার পর তিনি আর দেরি না করে দাঁতটির ডেন্টাল পাল্প থেকে স্টেম সেল আলাদা করেন এবং সংরক্ষণ করেন এবং তার টিস্যু কালচার মিডিয়ামে।

রিজেনারেটিভ ডেন্টাল পাল্প; Photo Credit: Pennsylvania University

সংরক্ষিত সেই টিস্যুগুলো ধীরে ধীরে বিভাজিত হয়। তার এ স্টেমসেলের বৈশিষ্ট ছিলো ডেন্টাল পাল্প থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের।

অন্যান্য গবেষকরা ত্বক, রক্ত এবং হৃদপিন্ডের কোষ থেকে এই স্টেম সেল আলাদা করেছিলেন। প্রফেসর শি এই স্টেম সেলের নাম দেন ‘SHED’। যাকে বলা যায়, মানুষের ক্ষণস্থায়ী দাঁত থেকে প্রাপ্ত স্টেমসেল।

তার এ গবেষণা প্রকাশিত হয় National Academy Of Scienceএ। তিনি ও তার সহযোগী গবেষকদের কাজ নিয়ে প্রকাশিত এ জার্নালে বলা হয়,

SHED কোষ গুলো খুব ধীরে বিভাজিত হয় এবং বৃদ্ধিপায় কিন্তু কিছু সময় পর দ্রুতগতি প্রাপ্ত হয় এবং অধিক শক্তিশালী এবং প্রাণবন্ত কোষ তৈরী করে। এই কোষ গুলো আবার পৃথক হয়ে ডেন্টাল পাল্প, স্নায়ু কোষ এবং চর্বি তৈরী করতে পারে।

প্রফেসর সানতিয়াগো শি; Photo Credit: Medical Xpress

সানতিয়াগো শি’র এক দশকের এই গবেষণা এবং ক্যারিয়ারের মূল চালিকা শক্তি এসেছিলো আপাতদৃষ্টিতে একটি দুধ দাঁত থেকে, তার মেয়ের প্রথম দুধ দাঁত।

এরপর আসা যাক Translational Medicine জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধের দ্বৈত গবেষণার ফলাফলে। একই সাথে পেনসিলভানিয়াতে শি এবং চিনের ঝিন ঝিয়ান প্রদেশের Fourth Military Medicine University– তে গবেষণা করেছিলেন ইয়ান ঝিন, কুন ইয়ান। তারা বলেন,

শিশুদের দাঁত থেকে নেয়া এডাল্ট স্টেম সেল দিয়ে দাঁতের ছোটো বড় ইনজুরি নিরাময় এমনকি মৃত দাঁত প্রতিস্থাপন করা যাবে। এমনকি যেখানে রক্তনালী ও স্নায়ুবিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

তারা এই কোষের নাম Human Deciduous Pulp Stem Cells (HDPSC) রাখেন। ডেন্টিস্টরা অবশ্য দাঁতের এ সমস্যাতে অ্যাপেক্সিফিকেশন পদ্ধতি ব্যবহার করেন। কিন্তু এ চিকিৎসা রোগীর ডেন্টাল পাল্প প্রতিস্থাপন নিয়ে কিছুই করতে পারে না।

অ্যাপেক্সিফিকেশন এর চেয়ে HDPSC কতটা কার্যকরী তা বুঝার জন্য এক ক্লিনিক্যাল জরিপের সহয়তা নেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে দাঁতের ইনজুরি প্রাপ্ত ত্রিশটি বাচ্চার মধ্যে বিশ জনের উপর নতুন আবিষ্কৃত HDPSC পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বাকি দের সনাতন অ্যাপেক্সিফিকেশন পদ্ধতি দেয়া হয়।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, HDPSC পদ্ধতি শিশুদের দাঁতে পুনরায় সংবেদনশীলতা এনে দিয়েছে। তাদের ঠান্ডা বা গরম উদ্দীপনা অনুভব করতে পারে। তারা যেন তাদের হারানো দাঁত পুনরায় ফিরে পেয়েছে।

প্রফেসর শি এই শিশুদের ডাটা প্রায় দুয়ের অধিক প্রায় তিন বছর ধরে পর্যবেক্ষণে রেখে দেখেন যে ক্ষতিগ্রস্ত দাঁতের চিকিৎসায় এই পদ্ধতিটি নিরাপদ এবং কার্যকরী। কিন্তু এই বাচ্চাদের মধ্যে একজন দুর্ঘটনাবশত নতুন এই দাঁতে আঘাত পায় যা গবেষকদের আরো বেশি সুযোগ দেয় এ নিয়ে আরো বিস্তারিত জানার।

যাই হোক এ ছিল দাঁতের চিকিৎসায় খুবই গুরুত্বপূর্ন পদক্ষেপ কিন্তু এ বিষয়ে এখনো অনেক কাজ রয়ে গেছে। যেমন বৃদ্ধ লোকদের এ পদ্ধতিতে সবগুলো দাঁত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় যাদের সবগুলো পার্মানেন্ট দাঁতই পড়ে গিয়েছে। তাছাড়া HDPSC চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত করতে প্রচুর গবেষণা দরকার ফলে এটি WHO, FDA– র মতন সংস্থাগুলো দ্বারা অনুমোদিত হবে.

যদি এরকম চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোকে আরও নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ করা যায়, তবে আমরা আরো বেশি শিশু এবং বয়ষ্কদের সুস্থ সবল সাদা দাঁতের বিকশিত হাসি দেখতে সক্ষম হব।

তথ্যসূত্রঃ ScienceAlert

 

Feature Photo Source: Pinterest.co.uk

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *