ভ্যাম্পায়ার অব স্যাকরেমেনটোঃ এক তরূণ মানষিক রোগীর নৃশংসতার কথা

সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা দাদী-নানীর কাছ থেকে ভূত-প্রেতের গল্প শুনে এসেছি। হরর বই কিংবা মুভিতে দেখেছি লোহমর্ষক সব অতিপ্রাকৃতিক কাহিনী। কিনতু কখনও সামনা সামনি এসব ঘটনার সম্মুখিন হওয়া হয়নি। তবে আজকে এমন একজন মানুষের কথা তুলে ধরবো যার কেচ্ছা-কাহিনী শুনলে শরীরের লোম শিউরে উঠবে।

একজন মানুষও যে এতো ভয়ংকর হতে পারে তা হয়তো কখনো আমাদের ভাবনাতেও ছিলোনা। মানুষটির নাম রিচার্ড ট্রেনটন। জন্ম ১৯৫০ সালের মে মাসেএকদম ছোটবেলা থেকেই অস্বাভাবিক আর ভীতিপূ্র্ণ সব কাজের প্রতি তার ঝোক ছিলো। অদ্ভুত সব কাজ সে করে বেড়াতো। দশ বছর বয়সে সে বাড়ির আশেপাশের বিভিন্ন অবলা ও পোষা প্রাণীদের উপর অত্যাচার চালাতো। কখনো আগুন ধরিয়ে দিতো কখনো বা একদম মেরেই ফেলতো। এরপর খুব তাড়াতাড়িই সে অ্যালকোহল, মারিজুয়ানাসহ বিভিন্ন মাদক দ্রব্যের প্রতি নেশাগ্রস্ত হয়ে পরে

রিচার্ড ট্রেনটন চেজ।
Photo Source: historicmysteries.com

সে প্রায় বলে বেড়াতো যে সে নাকি হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছে। আবার কখনো বলতো যে তার মাথার খুলির আকৃতি নাকি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে।  ধীরে ধীরে সে আরো অদ্ভুত সব আচরণ করতে শুরু করে। রিচার্ড ট্রেনটন মাঝের মধ্যেই মাথায় কমলালেবু ধরে রাখতো যাতে করে সে তার মস্তিষ্কে সরাসরি ভিটামিন সি পায়। হাই স্কুলে ওঠার পর তার পাগলামির সাথে সাথে মাদকাসক্ততাও বেড়ে যায়। প্রাণী হত্যাটাও তার নেশায় পরিণত হয়। তবে সে শুধু প্রাণী হত্যাই করতো না বরং হত্যা করার পর তাদের রক্তও পান করতো। শুনতে জঘন্য লাগলেও ট্রেনটন সত্যি সত্যিই এরকম পাগলামী করতো।

সে একা থাকতেই বেশি পছনদ করতো। ঘরে একাকী থাকাকালে ঘোরাফেরা করতো নগ্ন অবস্থায়। একসময় সে তার আপন মাকে সন্দেহ করতে শুরু করে যে তার মা তাকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে।

তার ভাবনাগুলো অদ্ভুত থেকে আরো অদ্ভুততর হতে থাকে। সে মনে করে তার বেঁচে থাকার জন্য তাজা রক্তের দরকার। আর সেই উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালে ট্রেনটন একটা খরগোশ হত্যা করে, হত্যার পর রক্তগুলো সংগ্রহ করে এবং তারপর সে রক্তগুলো ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় পুশ করে।

এরপর তাকে ভর্তি করানো হয় মানষিক রোগের চিকিৎসালয়ে। তবে সেখানে তাকে যে ট্রিটমেন্ট দেয়া হয়েছিলো তা আদৌ কার্যকর ছিলো কিনা তা নিয়ে রয়েছে অনেক জল্পনা কল্পনা। এমনকি চিকিৎসালয়েও সে কোনরকম পাখি জোগাড় করে তা হত্যা করে খেতো এবং হত্যার পর সংগ্রহ করা রক্ত পুরো শরীরে মেখে ঘুরে বেড়াতো। খুব নিষ্ঠুরভাবে সে কুকুরের উপর অত্যাচার চালিয়ে রক্ত সংগ্রহ করতো। আর তখন থেকেই রিচার্ড ট্রেনটনকে ‘ড্রাকুলা’ নামে ডাকা হতো।

কিন্তু রোগ নিরাময় না হওয়া সত্বেও ১৯৭৬ সালে চিকিৎসালয় থেকে ট্রেনটনকে তার মায়ের তত্ত্বাবধায়নে ফিরিয়ে দেয়া হয়। বাসায় ফেরার পর ট্রেনটনের পাগলামী আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে ছোট ছোট প্রাণী হত্যা করে তাদের রক্ত পান করা তার নিত্যদিনের কাজ হয়ে যায়। বাজার থেকে সে দুইটা কুকুর কেনে শুধুমাত্র সেগুলোর রক্ত দিয়ে গোসল করার জন্য।

 নিজেও নোংরা থাকতো। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মানুষ ঘৃণায় দূ্রে সরে যেতো। আর প্রতিবেশীদের গর্বের সাথে বলে বেড়াতো তাদের হাড়িয়ে যাওয়া পোষা প্রাণীকে সে কিভাবে হত্যা করেছে। তার মনে বিশ্বাস জন্মে যে তার রক্ত পাউডার হয়ে যাচ্ছে আর তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে তাজা রক্ত দরকার। একবার তাকে নেভাদার এক পার্কে পুরো রক্তমাখা শরীর নিয়ে উদ্ভ্রানতে্র মত ঘুরতে দেখা যায়। পরবর্তীতে রক্ত পরীক্ষা করলে যখন প্রমাণিত হয় যে রক্তগুলো গরুর ছিলো তখন পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।

Photo Source: Listverse.com

 এরপর একদিন হঠাৎ ট্রেনটন হ্যানডগান নিয়ে প্রতিবেশীর বাসায় এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। কিনতু কোন মানুষ আঘাতপ্রাপ্ত না হওয়ায় সেবারের মত ট্রেনটন বেঁচে যায়। তবে বিভিনন পোষা প্রাণীকে নির্দয়ভাবে হত্যার পর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তার মানুষ হত্যা করার পর্ব শুরু হয়।

১৯৮৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর রাস্তায় ৫১ বছর বয়সী এ্যামব্রোজ গ্রিফিন নামের এক পথচারীকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর প্রায়ই সে বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে বিশৃংখলা তৈরীর চেষ্টা করতো। পরের বছর, কোন এক সন্ধাবেলায় ডেভিড ও টেরেসা নামের দুই দম্পতির বাড়িড় দরজা ভেঙে ঢুকে পরে। সে সেখানে টেরেসাকে হত্যা করে যে কিনা ছিলো গর্ভবতী। তিনটি বুলেটের আঘাতে টেরেসার মৃত্যুর পর ট্রেনটনের নৃশংসতা আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। এরপর সে ছুড়ি দিয়ে টেরেসার মৃতদেহকে খন্ড বিখন্ড করে। এমনকি এও শোনা যায় যে সে ঐ মৃতদেহের কিছু অংশ ভক্ষণও করেছিলো। তারপর মৃতদেহে থেকে ঝড়া রক্ত ট্রেনটন পান করে।

এই ঘটনা ঘটনার কিছুদিন না যেতেই ট্রেনটন এবার হানা দেয় ৩৮ বছর বয়সী ইভলিন মিরথের বাসায়। মিরথের বাড়িতে ঢুকেই সে প্রথমে খুন করে মিরথের প্রতিবেশী মেরেডিথকে। তারপর একে একে মিরথ, তার ছয় বছর বয়সী পুত্র এবং ২২ বছর বয়সী ভাতিজা জেসনকে।

টেরেসার সাথে যা করেছিলো আরো জঘন্যভাবে তা সে ইভরিন মিরথের সাথেও করে। অতীতের সব খারাপ কাজের তুলনায় এই ঘটনাটি ছিলো সবচেয়ে ভয়ংকর। এই ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পরে সারা শহরে। রিচার্ড ট্রেনটনকে তার নৃশংস সব কর্মকান্ডের জন্য বলা হতে থাকলো ‘দ্যি ভ্যাম্পায়ার অব স্যাকরামেনটো’ ।

পরবর্তীতে কারাগারে আত্মহত্যার মাধ্যমে পৃথিবী মায়া ত্যাগ করে ভ্যাম্পায়ার খ্যাত রিচার্ড ট্রেনটন।

Feature Photo Source: YouTube.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *