দীর্ঘদিন ফল এবং সবজি টাটকা রাখার সংরক্ষণ পদ্ধতি

ব্যাগ ভর্তি সতেজ ফলমূল ও সবজি নিয়ে আপনি বাসায় ফিরলেন এবং তাদের আপনি সোজা ঢুকিয়ে রাখলেন রেফ্রিজারেটরে। ব্যাস,  আপনার এমন নিশ্চিন্ততাই পরিণামে বয়ে আনতে চলেছে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার। দিনকতক পরে রেফ্রিজারেটরের দরজা খুলেই লক্ষ্য করলেন এদের সতেজাভের পরিবর্তে কেমন শুকনো ও অসাড়তায় আচ্ছাদিত হয়ে আছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, এর জন্য দায়ী আপনার গতানুগতিকভাবে ফল ও সবজি সংরক্ষণ পদ্ধতি। এখন থেকেই যদি এই ধারার ইতি টেনে  সাথে দীর্ঘদিন সতেজ এবং তরতাজা রাখতে আপনি আগ্রহী হয়ে থাকেন তবে এই পরামর্শগুলো আপনার জন্যই।

ফলমূল এবং শাকসবজিকে আপনি জোর করে চাইলেও একসাথে কোনদিনই রাখতে পারবেন না, তা সে মেঝে, ভাঁড়ার ঘরই কিংবা ফ্রিজের ড্রয়ারই হোক না কেন।

Photo Source: Wonderopolis.com

কিন্তু কেন? এমন আজগুবি কথা শুনে যে কেউই বিপাকে পড়ে যেন বাজার করাই আবার বন্ধ করে না দিয়ে থাকেন তাই সঠিকভাবে সংরক্ষণের প্রেক্ষিতেই জবাব দিয়েছেন বিখ্যাত গবেষকমন্ডলী। ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খাদ্য বিজ্ঞান’ বিষয়ের  এমিরেটস অধ্যাপক ব্যারি সোয়ানসোন তাঁর বক্ত্যব্যে বলেছেনঃ ‘ অনেক ফলকর্তীক ইথাইলিন গ্যাস নিঃসরিত হওয়ার ফলে সবজি দ্রুত পরিপক্ক হয়ে এতে পচনের সৃষ্টি হয়। এছাড়া কখনই শাকসবজি আঁটসাঁটভাবে ব্যাগে রাখা যাবে না, কারন শাকসবজির শ্বসন প্রক্রিয়া সচল রাখাটা অতীব জরুরী তাই প্রয়োজনীয় ব্যবধানে রেখে সঠিক বায়ু চলাচল নির্বিঘ্ন হওয়া চাই। প্রয়োজনে বায়ু চলাচল নিরোধক ছোট ছিদ্রযুক্ত প্লাস্টিক ব্যাগ অথবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য জালের ব্যাগে স্বচ্ছন্দে রাখা যাবে।‘

অন্যদিকে, পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ও খাদ্য গবেষক এমেন্ডা জে ডিরিং বলেছেনঃ ’ সংরক্ষণের পূর্বে কখনই শাকসবজি ধোয়া উপযোগী হবে না। কারণ স্যাঁতস্যাঁতে ভাব ব্যাকটেরিয়া উৎপাদনে বিশেষ অনুকূল।‘

 

১। রসুন

বায়ুচলন নির্বিঘ্ন এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রা বিশিষ্ট স্থানে উন্মুক্ত পাত্রে রাখতে হবে। সাথে তার বন্ধু পেঁয়াজ থাকলেও মন্দ হয় না। তবে কখনই রসুনের উপরিভাগে কাগজের ন্যায় পাতলা খোসা তুলতে যাবেন না (শুধুমাত্র রান্নার পূর্ব ব্যতীত), কারণ বাইরের অসংখ্য ধূলাবালি থেকে এটি রসুনকে রক্ষা করে থাকে।

২। পেঁয়াজ

কিছু পরিষ্কার প্যান্টিহস নিয়ে ওতে পেঁয়াজ পুরে দিয়ে প্রতিটি জয়েন্টে ভালভাবে গিঁট দিয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রা যুক্ত স্থানে ঝুলিয়ে দিতে হবে। সংরক্ষণের অপর একটি পদ্ধতি অবশ্য আছে; তা হল, স্বাভাবিক তাপমাত্রায় মেঝেতে রাখুন শুধুমাত্র আলুর সংস্পর্শে রাখা চলবে না। এছাড়া কখনই পেঁয়াজ ফ্রিজে রাখবেন না কারণ ঠান্ডার ফলশ্রুতিতে  তা নরম হয়ে যাবে এবং আলো পূর্ণ স্থান থেকেও সরিয়ে রাখতে হবে নচেৎ এটি তিক্ত স্বাদযুক্ত হয়ে যাবে।

৩। আলু

ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন সাথে ঠান্ডা স্থান হবে সংরক্ষণের জন্য উৎকৃষ্ট। এইক্ষেত্রে রেফ্রিজারেটর মোটেই উপযুক্ত নয়, কারণ  ফ্রিজের ঠান্ডার উপস্থিতিতে আলুর শর্করা চিনিতে রূপান্তরিত হয়ে এর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। কাগজের ব্যাগে ও ঠান্ডা স্থানে (যেমনঃ ভাঁড়ার ঘর/স্টোর ঘর) আলু সংরক্ষণ করুন, তবে প্লাস্টিকের চাইতে কাগজে রাখায় এর শ্বসন প্রক্রিয়া সহজ হয়। কিন্তু বিশেষ করে পেঁয়াজ এবং ফলমূল (যেমনঃ আপেল) থেকে দূরে রাখতে হবে নতুবা এদের থেকে ক্ষরিত ইথাইলিন গ্যাসের প্রভাবে আলুর পার্শ্বমঞ্জরি বৃদ্ধি ঘটবে।

৪। শতমূলী

‘’Cooks Illustrated Magazine’’ কর্তীক স্বীকৃত চারটি সংরক্ষণ পদ্ধতি রয়েছে। তবে সর্বোত্তম পদ্ধতিটি হচ্ছে ডাঁটার নিম্নাংশ থেকে আধা ইঞ্চি ছেঁটে দিতে হবে। এবার একটি গ্লাসে  অল্পপরিমাণ পানি নিয়ে ওতে  সেগুলো দাঁড় করিয়ে ফ্রিজে রাখুন। এর সাদৃশ্য অনেকটা পানিতে ভিজিয়ে রাখা ফুলের তোড়ার মতই। এই প্রক্রিয়ায় শতমূলী চারদিন সতেজ থাকবে তবে প্রতিবার ব্যবহারের পূর্বেই ডাঁটার প্রান্তভাগ ছেঁটে নিতে হবে।

৫। গাজর

প্রথমেই গাজরের ডগা ছেঁটে দিতে হবে কারণ এতে গাজরে আদ্রভাবের উদ্রেক ঘটে এবং এটি নরম হয়ে পড়ে। ফ্রিজের ড্রয়ারে প্রায় দুই সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায়, তবে সেইজন্য একটি খোলা ( আবদ্ধ নয় এমন) জিপ-টপ-ব্যাগে গাজরকে ছেঁটে রেখে দিতে হবে, কিন্তু কখনই খোসা ছাড়ানো যাবে না। এছাড়াও দীর্ঘস্থায়ী ভাবে সংরক্ষণের জন্য গাজরকে কিউব অথবা প্রলম্বিত টুকরো করে মজবুতভাবে আবদ্ধ পানিপূর্ণ পাত্র ডুবিয়ে রাখতে হবে। তবে বিশেষভাবে খেয়াল রাখবেন যাতে সচরাচর পানি পরিবর্তনে ত্রুটি না হয়।

৬। ব্রাসেলস স্প্রাউট

এর কাণ্ড বেশ দীর্ঘস্থায়ী। তা সংরক্ষণের জন্য রেফ্রিজারেটরে কাণ্ডের শেষাংশ পানিতে ডুবিয়ে রেখে দিতে পারেন, প্রয়োজন মত কিছু পাতাও ছেঁটে দিতে পারেন। ব্রাসেলস স্প্রাউটের বহিরাংশের কচি পাতা ঝরে যাওয়ার আশংকা থাকলে তা প্লাস্টিক পলিব্যাগে পুরে ভালভাবে মুড়ইয়ে ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন, তবে এই জন্য পাতা ছাঁটার কিংবা ধোয়ার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র রান্নার পূর্বেই ওকাজ দুটো করে নিতে হবে। মনে রাখবেন, যত বেশিদিন একে সংরক্ষণ করবেন ততই গাড়ভাবে এর স্বাদ উপলব্দি করা যাবে।

৭। শসা

ঠান্ডা একেবারেই সহ্য হয় না এর। ‘’৫০ ডিগ্রির নিচে থাকলেই এটি দ্রুত বিনষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে’’ এমন মন্তব্যই করেছেন ডেভিস শহরে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।  তবে একান্তই যদি রাখতে হয় তবে তিনদিনের বেশি নয়। শসাকে যথাসম্ভব কলা, তরমুজ, টমাটো থেকে দূরে সরিয়ে রাখা চাই কেননা এদের থেকে সৃষ্ট ইথাইলিন গ্যাস এর জন্য মোটেই উপযোগী নয়।

৮। পাথুনি বা সেলেরি শাক

একে দীর্ঘদিন সতেজ রাখতে চাইলে মজবুতভাবে আবদ্ধ ধাতব পাত্রে পুরে ফ্রিজে সংরক্ষণ করাই যায়, এতে উৎপন্ন ইথাইলিন গ্যাস বের হতে পারে সহজেই, কিন্তু প্লাস্টিক ব্যাগে রাখা মোটেই উপযুক্ত হবে না। প্রতিবার ব্যবহার শেষে ভালভাবে মুড়িয়ে রাখতে হবে, পাথুনি শাকের ডাঁটা গাজরের ন্যায় সংরক্ষণ করতে চাইলে পানিপূর্ণ আবদ্ধ পাত্র রেখে দিতে পারেন।

৯। টমাটো

এর সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে বিরোধ বেশ লক্ষ্যণীয়।  টমাটো কোথায় কীভাবে রাখব? কাণ্ড উপরদিকে না নিচেরদিকে থাকবে? ফ্রিজে  নাকি বাহিরে রাখতে হবে? এই চলমান বিতর্কের সমাধান দিয়েছেন নর্থ ক্যারোলিনার বিখ্যাত টমাটো গবেষক এবং ‘টমেটোর মহাকাব্য’ (Epic Tomatoes) নামক গ্রন্থের লেখক ক্রেগ লিহোলিয়ার।  তিনি ২০০৮ সনে উক্ত বিতর্কের প্রেক্ষিতে Cook’s Illustrated Magazine– এ জবাব দিয়েছেন যে,’ একটি আদর্শ আকৃতির টমাটোর কাণ্ডভাগ থাকবে নিচের দিকে এতে করে কাণ্ডের চারদিকের আদ্রভাব বজায় থাকবে এবং কাণ্ডের পচনশীলতায় বাধা দিবে। তিনি তাঁর বিবৃতিতে  আরোও বলেছেন এই পদ্ধতি নির্ভর করবে টমাটোর প্রজাতির উপর। পাতলা চামড়ার টমাটো থেকে পুরো চামড়ার টমাটোতে অবশ্যই বৈচিত্র থাকবে। আরোও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে; টমাটো ফ্রিজে রাখা নিয়ে Cook’s Illustrated সহ অনান্যরা আজকাল তাদের মত পরিবর্তন করেছে। যতদিন পর্যন্ত না টমাটো সম্পূর্ণ পরিপক্ক হচ্ছে ততদিন ফ্রিজে থাকলেও এর স্বাদে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না অধিকন্তু এটি দীর্ঘদিন ভাল থাকবে। তো বাহিরে থাকা টমাটো সম্পূর্ণ পেকে গেলেও অসুবিধা নেই, কাণ্ডভাগ নিচে রেখে রেফ্রিজারেটরের প্লেটে সংরক্ষণ করতে পারেন। কাটা টমাটোকে যদি  সংরক্ষন করতে চান তবে অবশ্যই বাতাস নিরোধক যেকোনো পাত্রে রাখুন, এতে টমাটোর কটু স্বাদ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না। শুধুমাত্র পরিবেশনের পূর্বে স্বাভাবিক তাপমাত্রা রেখে স্থির করে নিতে হবে।

১০। কলা

যত্নসহ সুন্দরভাবে কলার থোকা থেকে আলাদা করে নিতে হবে। এবার প্লাস্টিকের মোড়ক দ্বারা প্রতিটি কাণ্ড মুড়িয়ে নিতে হবে। এই পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে ইথাইলিন গ্যাস নিঃসরণ রোধ হবে এবং কলা দ্রুত পাকবে না। এছাড়াও কলা যদি মোটামুটি পর্যায় পেকে যায় আপনি ফ্রিজে একে সংরক্ষণ করতে পারেন। বিশেষত ঠান্ডার উপস্থিতি কলাকে অপেক্ষাকৃত দ্রুত পাকার হাত থেকে রক্ষা করবে।

সায়েন্স এ্যালার্ট অবলম্বনে।

Feature Photo Source: Berkelywellness.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *