প্রাচীন ভারতের কিছু আবিষ্কার যা পশ্চিমারা নিজেদের বলে দাবী করে

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থ-বিত্তে প্রাচীন ভারতীয়রা অনেক অগ্রসর ছিলো। তারা শুধু পূজা-অর্চনা বা যুদ্ধে-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলোনা যা মিডিয়া সর্বদা আমাদের দেখায়। প্রাচীন ভারতীয়দের এই অমূল্য জ্ঞান সম্পদের কথা পৃথিবীর কারো অজানা ছিলোনা। ধাতব বিজ্ঞান থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান, যোগব্যায়াম থেকে যুদ্ধবিদ্যা বা গণিতশাস্ত্র থেকে খেলা-ধুলা সর্বত্রই ছিলো অগ্রসর। আর এই কারণেই বারংবার বিদেশী শক্তির আক্রমনের স্বীকার হয় সম্পদশালী ভারত। প্রাচীন ভারতে বেদ, মহাভারত ও রামায়ণে ঘুরে ফিরে অনেকবার এসব আধুনিক সরঞ্জাম ও শাস্ত্রের কথা এসেছে। এমন অনেক নিত্য-প্রয়োজনীয় আবিষ্কার আমরা ব্যবহার করছি যা প্রাচীন ভারতীয়দের আবিষ্কার এবং ভুলবশত এসব আমরা পশ্চিমাদের অবদান বলে জানি ও পশ্চিমারা নিজেদের বলে দাবী করে। প্রকৃতপক্ষে ভারতীয়রা যখন এসব আবিষ্কার করে ব্যবহার শুরু করেছে আজকের ইউরোপ-আমেরিকা তখন গুহামানব যুগে বাস করে। তো চলুন আজ এমন কিছু আবিষ্কারের কথা জেনে আসি।

১) লোহাঃ

আধুনিক বিশ্ব লোহা বা আয়রন ছাড়া কল্পনাও করা যায়না। আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি এই আয়রন। লোহা ও ইস্পাত শিল্প প্রাচীন ভারতীয়রা প্রথম রপ্ত করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ অব্দে অর্থাৎ আজ থেকে তিন হাজার দুইশত বছর আগে প্রথম লোহার টআয়রন নামে পরিচিত ছিলো। প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যতায় প্রথম লোহার ব্যবহার দেখা যায় যার স্থানীয় নাম ছিলো ‘তেলুরিকলোহা। ‘এই আয়রন ভূ-পৃষ্ঠেই পাওয়া যেত যার সাথে ধূমকেতুতে পাওয়া লোহার সাদৃশ্য রয়েছে। এতে ৬-৮% নিকেল থাকতো।

২) কালিঃ

প্রাচীন ভারতীয়রা শুধু তথ্য ও জ্ঞান অর্জনই করেনি, তারা সেই জ্ঞান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লিখে রাখার উপাদান কালিও আবিষ্কার করেছে। লেখার কালো কালি প্রাচীন ভারতীয়রা আবিষ্কার করে যা ‘মসি’ নামে পরিচিত ছিলো। বাংলায় কালির সমার্থক শব্দও মসি। সাধারণত হাড়ের শেষাংশ থেকে এই কালি বানানো হতো। তাছাড়া যেকোন কিছু পোড়ালে কালো কার্বন কালি হিসেবে পাওয়া যেত যা মসি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। লেখার জন্য সূচালো নিবওয়ালা কলমের প্রচলন হয় দক্ষিন ভারতে। এই কালি আজো ব্যবহৃত হচ্ছে সভ্যতা গড়তে।

Photo Source: Pontodasartes.com

৩) তাস-দাবা

তাস বা কার্ড যা খেলে আমাদের অসল সময়গুলি কাটাই ও বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিনোদন জুয়া যা ক্যাসিনোতে খেলা হয় তার প্রথম প্রচলন হয় এই প্রাচীন ভারতে। সংস্কৃতেকার্ড ‘ক্রিডা-পাত্রিম’ নামে পরিচিত যার অর্থ খেলার টুকরা। তাছাড়া দাবা যা বিশ্বে বুদ্ধিমত্তা পরিমাপ ও বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয় সেটাও প্রাচীন ভারতীয়দের আবিস্কার।

Photo Source: History.chess.free.fr

৪) হীরকখনিঃ

কোহিনুর হীরা।
Photo Source: thebetterindia.com

প্রাচীন ভারতীয়রা সর্বপ্রথম হীরার খনি আবিষ্কার করেন। অষ্টাদশ শতকে ব্রাজিলে হীরার খনি আবিস্কারের আগে ভারতীয় খনিটিই ছিলো হীরার একমাত্র খনি। প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে ভারতের মধ্যস্থলে হীরার খনি আবিষ্কৃত হয়। ১০৫,৬ ক্যারেটের কোহিণুর হীরা যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হীরকখণ্ড, অন্ধ্রপ্রদেশের কুল্লুর খনিতে পাওয়া যায়। ব্রিটিশ বেনিয়ারা অজস্র সম্পদের সাথে এই হীরাটিও লুট করে যা এখন ‘টাওয়ার অব লণ্ডন’ এ ব্রিটিশদের মুকুটে শোভা বর্ধন করছে।

৫) ফ্লাশ টয়লেটঃ

যেসব ফ্লাশযুক্ত আধুনিক কমোডকে আমরা ‘ইংলিশ কমোড’ বলি তার উৎপত্তি সিন্ধু উপত্যকায় যা ‘হরপ্পাসভ্যতা’ নামে পরিচিত। হরপ্পারা কিছু খ্যাপাটে গোছের ছিলো পরিস্কার-পরিচ্ছনার ব্যাপারে। তারা সম্পূর্ণ শহরে উন্নতমানের ড্রেনেজ ব্যবস্থার সাথে যুক্তকরে। হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ারিং’র ব্যাপারে তাদের দক্ষতা ছিলো প্রচুর।

 ৬) শূণ্যঃ

আধুনিক যুগ বিজ্ঞানের যুগ আর সব বিজ্ঞানের মূল হলো গণিত। প্রাচীন যুগে রোমানরা মাত্রকিছু বর্ণ দিয়ে হিসাব করতো যা খুবই সময় সাপেক্ষ ও বড় অংক করা যায়না। তখন দশমিকের ব্যবহার শুরু হয়নি।

Photo Source: Examveda.com

শূন্যকে কোন সংকেত বা প্রতীক হিসেবে ব্যবহার না-করে সরাসরি সংখ্যা হিসেবে সফলভাবে ব্যবহারের অবিমিশ্রকৃতিত্বপ্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদদের। খৃষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীর দিকে ভারতে বাস্তব সংখ্যা দ্বারা হিসাব নিকাশ করার সময় শূন্য ব্যবহৃত হত। এমনকি শূণ্য কে ব্যবহার করে যোগ, বিয়োগ, গুন ও ভাগও করা হত। খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় শতকের মধ্যে ভারতীয় গণিতবিদ পিঙ্গলা “বাইনারি সংখ্যা” দিয়ে হিসাব-নিকাশ করার পদ্ধতি বের করেন। তিনি একটি ছোট অক্ষর এবং একটি বড় অক্ষরের সমন্বয়ে তা করতেন যা আধুনিক কালের মোর্সকোডের মত। তাঁর সমসাময়িক গণিতবিদরা সংস্কৃত শব্দ শ্যূন্যে য়া থেকে বাংলা শূন্য শব্দটি গ্রহণ করেন।

গণিতবিদ আর্যভট্ট।
Photo Source: Iaspaper.net

ভারতীয় উপমহাদেশের গণিতবিদ আর্যভট্টের একটি বই-এ পাওয়া যায়, স্থানমস্থানমদশগুণম। এখানে হয়তবা তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন, স্থানে স্থানে দশ গুণের কথা। তবে এখানেও শুন্যের কথা লুকায়িত ছিল। শেষ পর্যন্ত শুন্যকে সংখ্যার পরিচয় দেন ব্রহ্মগুপ্ত। তার ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত নামক বই-এ প্রথম শুন্যকে সংখ্যা হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। শূন্যের সাথে যোগ,বিয়োগ, গুণের কথা এই বই-এ সঠিকভাবে দেয়া হয়। এছাড়া মহাবীর এবং ভাস্কর শুন্য নিয়ে কাজ করেন। তবে এই নতুন সংখ্যা পদ্ধতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয় আরবরা।

 

Feature Photo Source: Worldhistory.us

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *