মহাবিশ্ব ও ত্রিভুজের কোণ সমাচার

‘ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি কত?’- এই প্রশ্নটা আমাদেরকে অনেকবারই শুনতে হয়েছে। যারা জানতাম তারা বুলেটের গতিতে উত্তর দিতাম ১৮০ ডিগ্রী। তবে কোন মহাবিশ্বে ত্রিভুজের কোণের সমষ্টি তা অবশ্য স্যার স্পষ্ট করে বলেননি। শুনে খটকা লাগতে পারে, হঠাৎ ধান ভানতে শিবের গীত কেন? ত্রিভুজের কোণের সাথে আবার মহাবিশ্বের সম্পর্ক কী? আচ্ছা, তাহলে খুলেই বলি ব্যাপারটা।

আমরা এখন যে মহাবিশ্বে আছি সেটা সমান্তরাল মহাবিশ্ব। অবশ্য মহাবিশ্ব সম্পর্কে আরো দুইটি ধারণা প্রচলিত আছে। আবদ্ধ মহাবিশ্ব এবং উন্মুক্ত মহাবিশ্ব। ত্রিভুজের সাথে আবার এই তিন ধরণের মহাবিশ্বের একটা সম্পর্ক আছে। আবদ্ধ, উন্মুক্ত ও সমান্তরাল মহাবিশ্বে ত্রিভুজের কোণত্রয়ের সমষ্টি যথাক্রমে ১৮০ ডিগ্রীর কম, ১৮০ ডিগ্রীর বেশি এবং ১৮০ ডিগ্রী।

মহাবিশ্বের তারতম্যের ফলে ত্রিভুজের এই পরিবর্তন বুঝতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে ‘বক্রতা’ সম্পর্কে।

কোনো তলের বক্রতা দুই ধরণের হতে পারে- ধনাত্মক বক্রতা ও ঋণাত্মক বক্রতা। গোলকাকৃতির পৃষ্ঠের বক্রতা হলো ধনাত্মক বক্রতা। পাম্পে ফুলানো একটা চাকার ভেতরের দিকটা হলো ঋণাত্মক বক্রতা বিশিষ্ট। এখন মহাবিশ্বের আকার কেমন এটা আলোচনা করার ক্ষেত্রে প্রথমে আমরা আমাদের পরিচিত তিনটি আকৃতি নিয়ে চিন্তা করি। এই তিনটি আকৃতি হল সমতল আকৃতি (flat shape), গোলকীয় আকৃতি (spherical shape) এবং বক্রতলীয় আকৃতি (hyperbolic shape)। তলগুলোর বৈশিষ্ট্য বুঝার আগে একটি বিশেষ ধরনের জ্যামিতির সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। এটি হলো রেইম্যানের জ্যামিতি (Riemann’s Geometry)।

আমরা যে ধরনের জ্যামিতির সাথে পরিচিত তাহলো ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিতে আমরা যেসব ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ কিংবা আরো অন্যান্য বহুভুজ নিয়ে আলোচনা করি সবগুলোই সমতলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু যদি ক্ষেত্রটি গোলকীয় বা বক্রতল হয়? এটিই হচ্ছে অমর গণিতবিদ গাউসের সুযোগ্য ছাত্র রেইম্যানের কীর্তি!

রেইম্যান প্রথম গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন যে, ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি গোলকীয় পৃষ্ঠে দুই সমকোণের চেয়ে বেশি এবং বক্রতলীয় ক্ষেত্রে দুই সমকোণের চেয়ে কম হবে। এবং তিনি এও বলেন যে, গোলক বা বক্রপৃষ্ঠে দুইটি বিন্দুর মধ্যে সর্বনিম্ন দূরত্ব হবে একটি বক্ররেখা। খটকা লাগতে পারে, কেননা প্রচলিত জ্যামিতিতে আমরা জানি দুটি বিন্দুর সর্বনিম্ন দূরত্ব হলো সরলরেখা। কিন্তু সরলরেখা কল্পনা করলে তো সেটা সমতল ক্ষেত্রে চলে যায়, কাজেই সেটা

ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির আওতাধীন হয়ে যায়! রেইম্যান জ্যামিতি থেকে আরও দেখা যায়, সমতল ক্ষেত্রের দুটি সমান্তরাল রেখাকে যদি গোলকীয় ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে তারা একসময় নিজেদের ছেদ করবে। আবার বক্রতলে নিয়ে যাওয়া হলে তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে।

Photo Source: Bigganjatra.blog

উপরোক্ত আলোচনার সারকথা হল যে উন্মুক্ত মহাবিশ্বের বক্রতা হচ্ছে ধনাত্মক বক্রতা এবং আবদ্ধ মহাবিশ্বের বক্রতা হচ্ছে ঋণাত্মক বক্রতা। রেইম্যানের জ্যামিতি থেকে জানলাম যে ধনাত্মক বক্রতলের দুইটি বিন্দুর সংযোজক রেখা ধনাত্মকভাবে বক্র হবে এবং বিপরীতক্রমে ঋণাত্মক বক্রতলের কোনো দুইটি বিন্দুর সংযোগকারী রেখা ঋণাত্মকভাবে বক্র হবে।

উন্মুক্ত মহাবিশ্বে একটি ত্রিভুজের বাহুত্রয় ধনাত্মক বক্রতায় তাকবে। ফলে ওই ত্রিভুজের কোণত্রয় সমতলে অবস্থিত কোনো ত্রিভুজের কোণের চেয়ে বেশি প্রশস্থ হবে। ঠিক একারণেই উন্মুক্ত মহাবিশ্বে ত্রিভুজের কোণত্রয়ের যোগফল সমতলের ত্রিভুজের চেয়ে বেশি হবে। অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রী অপেক্ষা বেশি হবে।

অন্যদিকে আবদ্ধ মহাবিশ্বে একটি ত্রিভুজের বাহুত্রয় ঋণাত্মক বক্রতায় তাকবে। ফলে ওই ত্রিভুজের কোণত্রয় সমতলে অবস্থিত কোনো ত্রিভুজের কোণের চেয়ে চাপা হবে। ঠিক একারণেই আবদ্ধ মহাবিশ্বে ত্রিভুজের কোণত্রয়ের যোগফল সমতলের ত্রিভুজের চেয়ে কম হবে। অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রী অপেক্ষা কম হবে।

 

Feature Photo Source: Java67.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *