নর্স মিথোলজির চোখে মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিলো যেভাবে

মধ্যাযুগের স্কেন্ডেনেভিয়া বা নরওয়ের অধিবাসীদের সাধারণত নর্স বলা হতো। নর্স মিথলজিতে অসংখ্য দেবদেবীর কথা বলা থাকলেও বেশির ভাগ কাহিনীই সর্বপিতা ওডিন, বজ্রদেবতা থর আর গ্রেট চালবাজ, সুদর্শন লোকিকে নিয়ে লেখা।
চলুন দেখি  সৃষ্টির শুরুতে কেমন ছিলো আমাদের এই মহাবিশ্ব।
নর্স মিথলজি অনুযায়ী সৃষ্টির শুরুতে নিফেলহাম বা উত্তর মেরুতে ছিলো এগারোটি বিষাক্ত নদী,  হুরগেল্মির নামক ঝর্ণা।  আর চারদিকে সবসময়ই ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকতো। আর মুসপেল বা দক্ষিন মেরুতে আগুন জ্বলতো সবসময়, গলিত লাভা খেলা করতো। মুসপেলের কিনারপ্রান্তের এক স্থলভাগে আগুনের তলোয়ার হাতে নিয়ে  দাঁড়িয়ে আছে সুর্ট। তার হাতেই ধ্বংস হবে পৃথিবী।  তার হাতের জ্বলন্ত তলোয়ার দিয়ে সে পুরো পৃথিবী একদিন ধ্বংস করে দিবে।
এবার আসা যাক  দৈত্য আর দেবতাদের কিভাবে জন্ম হয়েছে সে বিষয়ে।
ইমির নামক এক দৈত্যকে বলা হয় সকল দৈত্যের পুর্বপুরুষ। তার থেকেই বাকি দৈত্যদের জন্ম হয় আর তার জন্ম হয়েছে গলে যাওয়া বরফ থেকে। এই গলে যাওয়া বরফ থেকে আধুমালা নামের এক শিংবিহীন গাভীরও জন্ম হয়। আর এই গাভীর দুধ খেয়ে বেড়ে উঠে ইমির। আর আধুমালা নামের সেই গাভী সারাদিন বরফ চাটতে চাটতে তার ভেতর থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে মানুষের আকৃতি আর এর নাম দেয়া হয় বুরিবুরি নামের এই দেবতা হলো সকল দেবতার পুর্বপুরুষ। দৈত্যদের ভেতর থেকেই একজনকে  স্ত্রী হিসেবে বেছে নিলো বুরি আর জন্ম দিলো তাদের প্রথম ছেলে বোর বোর আবার বিয়ে করে আরেক দৈত্য কন্যাকে আর তারা জন্ম দিলো ওডিন, ভিলি আর ভে নামের তিন ছেলে সন্তান।
Photo Source: Pbs.org
এবার আসি মহাবিশ্বের সৃষ্টি কিভাবে হয়েছে সে বিষয়ে।
ওডিন, ভিলি আর ভে তিন ভাই সারাদিন ঘুরে, ফিরে খায় দায় কোন কাজ কর্ম নাই। কিন্তু এভাবে ফিলিং এলোন টাইপের জীবন কর কতদিন। আর তাই তারা একদিন চিন্তা করলো এভাবে আর কতদিন কিছু একটা করা দরকার। আর সেই “কিছু একটা করা দরকার” ভাবনা থেকেই তারা সিদ্ধান্ত নিলো তারা এই মহাবিশ্বের প্রাণের বিকাশ ঘটাবে। কিন্তু বললেইতো আর প্রাণের বিকাশ ঘটানো সম্ভব না। এর জন্যতো একটা পরিবেশ চাই নাকি? আর তাই তারা তিন ভাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো তারা ইমির নামের দৈত্যকে হত্যা করবে। কেননা দৈত্য থাকলে প্রানের বিকাশ ঘটানো সম্ভব না। যেই কথা সেই কাজ। শুভদিন দেখে (যদিও তখন শুভ অশুভ বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিলো কিনা জানি না) তারা ইমিরকে হত্যা করলো। তিন ভাই শুধু ইমিরকে হত্যা করেই থেমে থাকে নি সুন্দরভাবে তার দেহের ব্যবচ্ছেদও করে ফেললো।  তারা ইমিরের চোখের পাঁপড়ি দিয়ে উচু এক দেয়াল বানিয়ে দিলো যাতে বাকি যে দৈত্য আছে তারা যেন প্রানিকূ্লের কোন ক্ষতি করতে না পারে। এ দেয়ালের ভেতরের প্রান্ত হচ্ছে মিডগার্ড, যেখানে মানুষের বসবাস। তিনভাই মিলে ইমিরের মাংস দিয়ে বানালো মাটি, হাড় দিয়ে বানালো পাহাড়-পর্বত আর দাঁত আর বাকি হাড়ের টুকরা দিয়ে বানালো নুড়ি পাথর, বালি, কঙ্কর।
এবার আসা যাক মানুষ কিভাবে বানানো হয়েছিলো সে প্রসঙ্গে।
নর্স মিথলজি অনুযায়ী মানুষ মানুষ তৈরী করা হয়েছে  অ্যাস আর এম্বার গাছের গুড়ি থেকে। দেবতারা এই দুটি গাছে গুড়ি মানুষের সমান করে কাটেন আর এরপর ওডিন এর মধ্যে জোরে শ্বাস নিয়ে প্রাণ দান করে, ভিলি তাদেরকে ইচ্ছাশক্তি, বুদ্ধিমত্তা আর চলার শক্তি দান করে আর ভে দান করে হাত, পা, চোখ, নাক, কান ইত্যাদি নানা অঙ্গ।  মানুষ তো বানানো হলো এবার এদের নাম দেয়ার পালা। দেবতারা মিলে অ্যাস গাছ থেকে বানানো পুরুষের নাম দিলেন অ্যাস্ক আর এম্বার গাছ থেকে বানানো নারীর নাম হলো এম্বলা। অ্যাস্ক আর এম্বলা হচ্ছে মানুষের আদি পিতামাতা।
দ্যি নাইন ওয়ার্ল্ড।
Photo Source: Pinterest.com
সবকিছুইতো তৈরী হলো এবার দরকার সবার জন্য বাসস্থান। কেননা দেবতা, মানুষ, দৈত্য সবইতো আর এক দুনিয়ায় থাকতে পারবে না। দেবতারা মিলে এরও সমাধান করে ফেললো। মহাবিশ্বের যেহেতু তখন জায়গার অভাব ছিলো না তাই প্রত্যেকের জন্য বানানো হলো নয়টি আলাদা আলাদা জগত। এগুলো হলো :
 ১। এসগার্ড, ওডিনসহ সব এসির দেবতারা থাকে এখানে,
২। আলফহেইম, লাইট এলফদের বাসস্থান,
৩। নিডাভেলির, বামনেরা থাকে এখানে,
৪। মিডগার্ড, মানুষের বাসস্থান
৫। জতুনহাইম, বরফ দৈত্যদের বাসস্থান,
৬। ভ্যানাহাইম, ভ্যানিরদের বাসস্থান,
৭। নিফেলহাম, অন্ধকার, কুয়াশাচ্ছন্ন এক জগৎ,
৮। মুসপেল, আগ্নেয়গিরির জগৎ,
৯। হেল, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব না দেখিয়েই মারা যায় তাদের পরবর্তীতে এখানে স্থান হয়।
আর ইগড্রাসিল নামক একটি বিশাল অ্যাস গাছ এই নয়টি জগতকে ঘিরে রেখেছে।
এগুলোতো গেল বইয়ের প্রাথমিক কথাবার্তা।  সবচেয়ে মজার কাহিনীগুলো লেখা হয়েছে এরপরের অংশে। কিভাবে লোকির চালাকির মাধ্যমে থরের চুরি যাওয়া হাতুরি উদ্ধার হয় আর মহাসুন্দরী ফ্রেয়া বেচে যায় থ্রাইম নামক এক দানবকে বিয়ে করার হাত থেকে আর ওডিন কিভাবে দেবতাদের জন্য নিয়ে আসে কাব্যসুরা জানার জন্য পড়তে পারেন নীল গেইম্যানের এই অসাধারন বইটি।

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *