মজলুমের জন্য মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের গৌরবগাঁথা ইতিহাস

আজ যে ইউরোপ জ্ঞানবিজ্ঞানে এতো উন্নত, এই ইউরোপে জ্ঞানবিজ্ঞানের আলো ছড়িয়েছিলো মুসলিমরা। মুসলিমরা ইউরোপের স্পেন দখল করে নিয়ে জ্ঞানবিজ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলো৷ অবাক লাগলেও সত্য যে, মুসলিমরা স্পেন আক্রমণ করেছিলো, খ্রিস্টান মেয়েদেরকে তাদের খ্রিস্টান রাজা কর্তৃক ধর্ষণের কারণেই। মুসলমানদের স্পেন বিজয় একদিক থেকে যেমন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গর্বের ইতিহাস তেমনি মজলুমের জন্য অপশক্তির সাথে লড়াই করার দৃষ্টান্তও বটে।

উমাইয়া খিলাফতের সময় স্পেনের এক খৃষ্টান গভর্নর আফ্রিকা ও মিসরের আমীর মুসা ইবনে নুসাইরের দরবারে এ ফরিয়াদ নিয়ে এসেছিল । তার নাম ছিল কাউন্ট জুলিয়ন। স্পেনের রাজা রডারিক ছিল একজন অত্যাচারী শাসক। তার বহুবিধ অপকর্মের অন্যতম ছিল, সে তার প্রজাদের উঠতি বয়সের তরুণীদের ‘রাজ প্রশিক্ষণ” এর নাম করে তার অধীনে রেখে তাদের সাথে কামচাহিদা চরিতার্থ করতো। জুলিয়নের অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে ফ্লোরিডা। রডারিক তার সাথেও কামচাহিদা চরিতার্থ করে। কণ্যা পিতা জুলিয়ান কে তার সম্ভ্রম হারানোর কথা জানায়। গভর্নর জুলিয়নের অন্তরে রডারিক ও তার শাসন ক্ষমতার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা তরঙ্গায়িত হতে থাকে।

ঐতিহাসিক লেইন পোল, প্রফেসর দুজী ও স্যার মেকুয়েল, মুসা ইবনে নুসাইর ও গভার্নর জুলিয়ানের  যে আলাপ হয়েছিল তা তারা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। গভার্নর জুলিয়ন স্পেনের সৌন্দর্য আর স্পেনের নারীদের সৌন্দর্যের প্রলোভন দেখিয়ে মুসা কে প্রভাবিন্বিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু মুসা কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না। তখন জুলিয়ন তার রাজিকীয় তলোয়ার মুসার পায়ের নিচে অর্পণ করল এবং বন্ধুত্বের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু তাতেও যখন মুসা স্পেন আক্রমনে রাজি হলেন না, তখন জুলিয়ন তার মেয়ের বেইজ্জতীর কথা প্রকাশ করল। এবার মুসা রাজী হলেন, তার তলোয়ার কোষমুক্ত করলেন, কারণ ইসলাম তো সদা মজলুমদের পক্ষে।

মুসা খলীফা ওলীদ ইবনে আব্দুল মালেকের নিকট স্পেন আক্রমনের অনুমতি প্রার্থনা করেন। খলীফা অনুমতি প্রদান করেন। মুসা তারেক বিন যিয়াদ (রহঃ) এর নেতৃত্বে বড় একটি সেনাবাহিনী আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন।

সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদ (রহঃ) ।
Photo Source: Bookofdaystales.com

তারেককে যে ফৌজ দেয়া হয়েছিল তার সংখ্যা ছিল সাত হাজার। যখন জাহাজ নোঙ্গর তুলে নিল তখন তীরে সমবেত হাজার হাজার নর-নারী ও শিশু-কিশোর দু’হাত উপরে তুলে তাদের জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করছিল। এ সাত হাজার ফৌজের অধিকাংশের ভাগ্যেই ছিল স্পেনে দাফন। তারা আল্লাহর পয়গাম সমুদ্রের অপর পারে পৌঁছানোর জন্যে চিরতরে বিদায় হয়ে যাচ্ছিল। সে ঐতিহাসিক তারিখটি ছিল ৭১১ খৃষ্টাব্দের ৯ই জুলাই।

স্পেন উপকূলে নামার পর তারিক নির্দেশ দিলেন, “সব কটি জাহাজে আগুন লাগিয়ে দাও।” তার এ নির্দেশ অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না, তখন তারিক সে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন । সে ভাষণের সারমর্ম ছিল, “হে বাহাদুর যুবক ভাইয়েরা! এখন পিছু হটবার ও পলায়ন করার কোন সুযোগ নেই। তোমাদের সম্মুখে দুশমন আর পশ্চাতে সমুদ্র। না পিছনে পলায়ন করতে পারবে না সামনে। এখন তোমাদের সামনে বিজয়লাভ বা শাহাদতবরণ ছাড়া আর তৃতীয় কোন পথ অবশিষ্ট নেই। আর সব দেশই আমাদের দেশ, কারণ এ সবই আমাদের আল্লাহর দেশ।”

Photo Source: Theconversation.com

রডারিক সেনাপতি থিওডমীরকে তারেকের মোকাবেলা করার জন্য প্রেরণ করে। লড়াইয়ে সে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। পত্রযোগে জানায় যে, “এমন এক জাতির আমি মুখোমুখী হয়েছি, যারা বড় বিস্ময়কর এক জাতি। তারা আসমান থেকে নেমে এসেছে নাকি জমিন ফুঁড়ে উঠে এসেছে তা’ আল্লাহই ভাল জানেন।”
রডারিক তার সেনাপতির পত্র পেয়ে প্রায় একলাখ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী তৈরি করেন তারেকের সাথে মোকাবেলা করার জন্য।
এদিকে মুসা বিন নুসাইর আরো পাঁচ হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন। ফলে তারিকের মোট সৈন্য সংখ্যা বারো হাজারে উপনীত হয়। লাক্কা প্রান্তরে রডারিকের বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজয়বরণ করে পালিয়ে যায়। রডারিক নিজেও ঐতিহাসিক এ লড়াইয়ে নিহত হয়।

এ বিজয় মুসলমানদের জন্য সমগ্র ইউরোপের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। এরপর মুসলমানগণ স্পেনের সমস্ত শহর পদানত করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে।
তারা স্পেনের তৎকালীন রাজধানী টলেডো জয় করেন। তাদের অগ্রাভিজান অব্যাহত থাকে এমনকি তারা ফ্রান্সের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পিরনীজ পর্বতমালার পাদদেশে পৌঁছে যায়।

কিন্তু খলিফার নির্দেশে তাদের অগ্রাভিযান থামিয়ে দিতে হয়। তা না হলে হয়ত আজ ইউরোপের ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে হত। তাইতো ঐতিহাসিক গীবন লিখেছেন, “যদি ঐ মুসলমান জেনারেল সম্মুখে অগ্রসর হবার সুযোগ পেতেন, তাহলে ইউরোপের স্কুলে ইঞ্জিলের পরিবর্তে কুরআন পড়ানো হতো এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও মুহাম্মাদের রিসালাতের সবক দেওয়া হতো। আর আজকে রোমে পোপের পরিবর্তে শায়খুল ইসলামের হুকুম কার্যকর হতো।”

এ সকল বিজয়ের পর স্পেন আন্দালুসে পরিণত হয় যেখানে মুসলমানগণ আট’শ বছর পর্যন্ত শাসন কার্য চালায়। এ সময়ে তারা এখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির অতুলনীয় প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করে। তারা এ ভূখন্ডকে পৃথিবীর সর্বাদিক উন্নত ভূখন্ডে পরিণত করেন। কিন্তু তারা যখন বিলাসিতা, বাদ্য ও সঙ্গীতের তানে বিভোর হয়ে গাফলতের চিরনিদ্রায় শায়িত হল তখন এ স্বর্গভূমি তাদের হাতছাড়া হল আর সেখানে তাদের অস্তিত্বের কোন চিহ্ন অক্ষত রইল না!

 

Feature Photo Source: Ozy.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *