ইতিহাস পাল্টে দেয়া পাঁচটি রমজান

আলহামদুলিল্লাহ্, পবিত্র রমজান আজ প্রথম দিন। আরবি বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই মাস যেমন অত্যন্ত বরকতময় তেমনি বহুল প্রতীক্ষিতও বটে।এই মাসেই মহান আল্লাহ তায়ালা কুর’আন নাযিল করেন। রমজান মাস এলে মুসলিমদের মাঝে ইবাদাতের বরকত ও প্রশান্তি যেন আরো বেড়ে যায়।

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম কয়েকটি যুদ্ধ ও মুসলিমদের কয়েকটি শ্রেষ্ঠতম বিজয় অর্জিত হয়েছিল পবিত্র রমজান মাসে যা ইতিহাসের গতি পাল্টে দিয়েছিল।

 

১.বদরযুদ্ধঃ

                Photo Source: Prophetic-path.com

ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ ও প্রথম বিজয় হচ্ছে বদরের যুদ্ধ। ইসলামের ইতিহাসে এই যুদ্ধটির তাৎপর্য অনেক। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তার গুটিকয়েক জানবাজ সাহাবী রমজানের প্রখর রোদ উপেক্ষা করে জিহাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। সুসজ্জিত হাজার কুরাঈশদের বিরুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন।

তাদের এই অনমনীয় দৃঢ়তা ও অসম সাহসের এই নজির পেশ করার কারণে মহান আল্লাহ ফেরেশতা নাযিল করে তাদের সাহায্য করেছিলেন। ৩১৩ জনের সেই মহিমান্বিত সেনাবাহিনী সুসজ্জিত সহস্রাধিক মুশরিক সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে ইসলামের নবগঠিত ছোট্ট কাফেলাকে রক্ষা করেছিল। দিনটি ছিল হিজরী ২য় সনের ১৭ রমজান (ঈসায়ী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৩ মার্চ,৬২৪ সন)

২.মক্কা বিজয়ঃ

ইসলামের ইতিহাসে মক্কা বিজয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি ঘটনা।রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নবুয়াত লাভের পর যে মক্কার লোকেরা তার উপর অত্যাচার করেছিল,যাদের কারণে প্রিয় নবীজীকে রাতের আঁধারে মদীনায় হিজরত করতে হয়েছিল সেই তিনিই এবার বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন। যে লোকেরা তাকে ও তার সম্মানিত সাহাবীদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল তাদের একবাক্যে ক্ষমা করে দিলেন। দুনিয়ার ইতিহাসে এমন কোনো নজির হয়ত আর নেই। কা’বা শরিফের সকল মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা হয়। ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র শহর থেকে শুরু হয় এক নতুন ইতিহাস।

মক্কা বিজয়ের পর থেকেই ইসলামের দাওয়াত বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত হওয়া শুরু হয়।

হিজরী ৯ম সনের ১৮ রমজানের (ঈসায়ী ১১ জানুয়ারি,৬৩০ সন) পবিত্র দিনে এই বিজয় অর্জিত হয়েছিল।

৩.গোয়াডিলথের যুদ্ধঃ

৯২ হিজরীর (ঈসায়ী ১৯ জুলাই,৭১১ খ্রিস্টাব্দ) রমজান মাসের এক পবিত্র দিনে মরক্কোর উপকূল থেকে জাহাজে করে সাগর পার হয়ে ইউরোপের মাটিতে পা রাখেন বীর সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ। উমাইয়া গভর্নর সেনাপতি মুসা বিন নুসায়েরের দাস থেকে নিজ যোগ্যতায় সেনাপতি হওয়া মুর সেনাপতি সমগ্র ইউরোপের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন দুঃসাহসী নেতৃত্ববলে আইবেরীয় উপদ্বীপ জয়ের কারণে। প্রথম জীবনে ছিলেন দাস, শেষ জীবনে খুবই নিঃস্ব অবস্থায় ইন্তেকাল করেন, কিন্তু এর মাঝের অল্পকিছু সময়ের মধ্যেই নিজেকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেনানায়কদের একজন হিসেবে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তারিক বিন যিয়াদ। জিব্রাল্টারে পা রেখে নিজেদের চেয়ে কয়েকগুণ বড় এক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাকীটা ইতিহাস।

আন্দালুসিয়ায় উমাইয়া খিলাফাহ এবং ৮০০ বছরের মুসলিম শাসণের গোড়াপত্তন হয় তারিক বিন যিয়াদের এই বিজয়ের ফলেই।তারিক বিন যিয়াদের এই বিজয় ইতিহাসের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একসময় এই আন্দালুস খিলাফাহর নেতৃত্বে ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রভূমীতে পরিণত হয় যা অন্ধকার ইউরোপের বুকে ছিল বাতিঘরের মত। বাগদাদের পর একসময় স্পেনের কর্ডোভা ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরী।

৪.হাত্তিনের যুদ্ধঃ

              Photo Source: Catchthispilum.com

মহান শাসক ও মিসরীয় যোদ্ধা সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়্যুবী মুসলিম জাহানের প্রখ্যাত একজন বীর। কুর্দি বংশোদ্ভূত এই মুসলিম সেনাপতি ক্রুসেডারদের ৮৮ বছরের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন আল-কুদসকে। মিসরের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর থেকেই তিনি ক্রুসেডারদের রাজ্যকে চারদিক থেকে ঘিরে আনছিলেন। একে একে সিরিয়া ও হিজাজ সালাহউদ্দীন আইয়্যুবীর অধীনে আসে। জেরুজালেম পুনরুদ্ধারে হাত্তিনের যুদ্ধ ছিল একটি প্রধানতম নিয়ামক। এই যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেছিলেন রমজান মাসের এক পবিত্র দিনে। ২৭ রমজান সারারাত ইবাদাত বন্দেগীতে কাটিয়ে পরদিন আক্রমণ শুরু করেন এবং যুদ্ধজয়ের ফলে সুলাইমান (আ.) কতৃক নির্মিত আল-আকসা মসজিদ যা পুনরুদ্ধার করেছিলেন ফারুকে আজম উমার ইবনে আল খাত্তাব (রা.) সেই পবিত্র ভূমি আবারো মুসলিমদের অধীনে আসার পথ কণ্টকমুক্ত হয়। ঈসায়ী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ছিল ৪ জুলাই,১১৮৭ সন।

৫.আইন জালুতের যুদ্ধঃ

চিত্রশিল্পীর চোখে আইন ও জালুতের যুদ্ধ

মুসলিমদের তখন চরম দুঃসময়। মোঙ্গলদের হামলায় কেঁপে উঠেছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্ব। তাতারদের ভীতি মানুষের মনে এতটাই বড় ধরণের রেখাপাত করেছিল যে তারা মনে করতো তাতাররা পরাজিত হয় না। একে একে মুসলিম বিশ্বের সমৃদ্ধ শহরগুলো মোঙ্গলদের হাতে ধ্বংস হতে থাকে। আব্বাসীয় খিলাফাতের রাজধানী বাগদাদ ধ্বংস করে দেয়। সমগ্র মুসলিম সম্রাজ্যের পতন হয় এই ভয়ংকর শত্রুর হাতে। তখন মুসলিমদের একটি জনপদই অক্ষত ছিল। একটি শেষ দুর্গ এবং সেটি ছিল মিসর।

মামলুক সুলতান সাইফুদ্দীন কুতুয মোঙ্গলদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের অপেক্ষা না করে একটি শেষ চেষ্টার জন্য নিজের সৈন্যদের একত্রিত করে বর্তমান ফিলিস্তিনের আইন জালুতে মুসলিম বিশ্বের শেষ শক্তিধর সেনাবাহিনী হিসেবে তখন পর্যন্ত অপরাজেয় মোঙ্গল সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হন।

কিন্তু আইন জালুতের ময়দানেই মোঙ্গলদের পরাজয় রচিত হয়। সেনাপতি বাইবার্স ও সুলতান কুতুযের যোগ্য নেতৃত্বে অসাধারণ সাহসিকতা প্রদর্শন করে মামলুক বাহিনী মোঙ্গলদের পরাজিত করে যার ফলে মোঙ্গলদের ব্যাপারে মানুষের ভুল ধারণা ভেঙ্গে যায়। আইন জালুতের এই বিজয় কেবল মুসলিম বিশ্বকেই রক্ষা করেনি,আইন জালুতের ময়দানের সেই মহান বিজয় সমগ্র বিশ্বকে তাতারীদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।

দিনটি ছিল হিজরী ৬৫৮ সনের ২৫ রমজান, ঈসায়ী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ছিল ১২৬০ সনের ৩ সেপ্টেম্বর।

 

তথ্যসূত্রঃ

 

Feature Photo Source: Umrahexperts.co.uk

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *