আলী বানাতঃ ক্যান্সার যার কাছে উপহার ছিলো

আপনাদের উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন রেখে লেখাটি শুরু করছি,

ধরুন, আপনার হাস্যজ্জল চলমান জীবনের একটা সময়ে আপনি কোনভাবে জানতে পারলেন যে আপনার হাতে আর মাত্র ৭ মাস আছে। কি করবেন আপনি?

আলী বানাত, ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমে বসবাসকারী একজন সফল ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ১৯৮২ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি মূলত পেশায় ছিলেন একজন ইলেক্ট্রিশিয়ান। নামকরা এক সিসিটিভি কোম্পানির মালিক ছিলেন তিনি। মাত্র ২১ বছর বয়সেই নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গড়ে তুলেন।

মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির অধিকারী এই উদ্যোক্তা আর দশটা মানুষের মতোন বসবাস করতেন না। তার হাতে থাকতো প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার ব্রেসলেট, পায়ে থাকতো লুই ভিটনের লাখখানেক টাকার জুতা, মাথার জন্য ছিলো গুচি ক্যাপের রেয়ার সব কালেকশনস। চলাফেরার জন্য ব্যবহার করতেন ৫০ কোটি টাকারও বেশী দামের ফেরারী কোম্পানির স্পাইডার মডেলের গাড়ি। তার সামান্য একজোড়া স্যান্ডেলেরই দাম ছিলো ৬০,০০০ টাকার মতোন!

৫০ লক্ষ টাকার সেই ব্রেসলেট; Photo Source: Youtube

 

৫০ কোটি টাকা মূল্যের স্পাইডার মডেলের ফেরারি; Photo Source: Youtube

 

৬০ হাজার টাকা মূল্যের স্যান্ডেল; Photo Source: Youtube.com/user/OnePathNetwork

আলিশান এসব আধুনিকতার স্রোতে দিনগুলো ভালোই কাটছিল। প্রায় তিন বছর আগের কথা, ২০১৫ সাল। একদিন চা খাওয়ার সময় হঠাৎই তার জিভ পুড়ে গিয়ে সেখানে ফোস্কা পড়ে যায়। তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন, কিনা কি ভেবে শরীর চেকআপ করলেন। রিপোর্ট আসলো। সেখানে লেখা ফোর্থ স্টেইজ টেস্টিকুলার ক্যান্সার! কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই ডাক্তার তাকে জানিয়ে দিল যে তার হাতে সময় আর মাত্র ৭ মাস!

কি করবে সে? এ রোগের প্রতিষেধকও যে নেই! বড্ড দেরী হয়ে গেছে! এতো টাকা দিয়ে কি করবে যদি সে নিজেই না থাকে? অনেক চিন্তাভাবনার পর সে তার জীবনের মোড় ঘোরাবার সিদ্ধান্ত নিল। এভাবে আর চলাটা যে সম্ভব নয়!

বলা বাহুল্য, ক্যান্সার ধরা পড়বার পর তা তার জীবনে এক আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। যে পর্যায়ে মানুষ এসে থেমে যায়, জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণতে থাকে, ঠিক সেখানে এসে আলী বানাত অন্য পথ বেছে নিলেন।

সে বুঝেছিল যে একটা ফেরারি স্পাইডারের চেয়ে খালি পায়ে আফ্রিকায় দৌড়ে বেড়ানো একটি শিশুর জন্য এক জোড়া জুতোর দাম বেশি। সেসব শিশুদের হাসির মূল্য যে তার এতো সম্পদের ধারে কাছেও নেই!

Photo Source: Aboutislam.net

বদলে গেলো আলী বানাতের চিরচেনা জীবন। তিনি একটি চ্যারিটির পরিকল্পনা করলেন। ধীরে ধীরে শখের জিনিসগুলো বিক্রি করে দিলেন। সাথে সফল ব্যবসাটিও। চলে গেলেন আফ্রিকার টগোতে। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে গড়ে তুললেন MATW (Muslims Around The World) নামের একটি প্রজেক্ট।

MATW লেগো; Photo Source: Matwproject.org

পরবর্তীতে One Path Network থেকে তার একটি ইন্টারভিউ বের হয়। যা তার পরিচয় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিল। Living Muslim এর Host, মোহাম্মদ হোবলোস তার ইন্টারভিউটি নেন। ভিডিও টাইটেল ছিলো ‘Gifted With Cancer’। টাইটেলটি অদ্ভুদ মনে হচ্ছে তাইনা? স্বাভাবিক। ক্যান্সার আবার ‘Gifted’ কি করে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর তার উক্তিতে রয়েছে।

এখন সে জীবনের কোন প্রান্তে রয়েছে আর তার কি হয়েছে প্রশ্নের উত্তরে আলী বানাত বলেন,

At this point in my life, Alhamdulillah I have been gifted by Allah with cancer throughout my body and I have changed my whole life to helping people

“কেন সে একে গিফট বলছে”, এমন প্রশ্নের উত্তরে সে কাঁদতে কাঁদতে বললো,

Alhamdulillah it is a gift because Allah has given me a chance to change

সে MATW প্রজেক্ট কে নিয়ে পুরোদমে লেগে পড়লো। তার তৈরি অনলাইন ফান্ডে গত তিরিশ মাস হতে এখন অব্দি প্রায় ১০ কোটিরও বেশী টাকা জমা হয়েছে, এবং প্রতিনিয়তই এখানে ডোনেট করে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এছাড়াও Commonwealth Bank of Australia- তেও তার একটি চ্যারিটি ফান্ড ছিলো। কিন্তু তার চ্যারিটি একাউন্টটি কোনো সতর্কতা ছাড়াই কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। আলী বানাতের দাবি ছিলো যে তার চ্যারিটিটি ইসলামিক ছিলো বলে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেছেন মুসলিম চ্যারিটি যা কিনা অনেক সময় পশ্চিমা বিশ্বে টেররিস্ট বা সন্ত্রাসী ফান্ডিং হিসেবে গণ্য করা হয়।  অনেক সময় জেনেও তারা হয়রানী করার উদ্দেশ্যে তা করে থাকে।

তার প্রজেক্ট হাজারো মানুষকে সাহায্য করেছে। আলী একাই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গিয়ে স্পন্সর জোগানোর জন্য অনেক পরিশ্রম করেছে, এতে তার উদ্দেশ্য ছিল যেন প্রজেক্টের ১০০ ভাগ ডোনেশনই প্রজেক্টে ব্যয় করা যায়।

Photo Source: Aboutislam.net

পরবর্তীতে তার প্রজেক্ট MATW বিধবা নারীদের জন্য প্রায় ২০০ ঘর, একটি মসজিদ, একটি স্কুল ও একটি মেডিকেল সেন্টার তৈরীর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। টগোতে তিনি একটি মসজিদ ও একটি স্কুল বানিয়েছিলেন। এছাড়াও তার প্রজেক্ট লেবাননে সিরিয়ান শরণার্থী ও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্য করেন।

কাজ করতে করতে একসময় শুয়ে পড়লেন আলী। ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। যেই মানুষটা একদিন চেয়েছিলেন বয়স ত্রিশে অবসর নিবেন, আল্লাহ তাকে ঠিকই ত্রিশে ঐ অবসরের খবর পাঠিয়েছেন আর সাথে দিয়ে দিয়েছিলেন লাইফ চেইঞ্জিং এক রোগ দিয়ে যা তার নিকট একটি ‘Gift’.

হাসিখুশি চেহারাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। দুরারোগ্য ব্যাধি। আর পারলেন না। গত ২৯ মে মাগরিব ওয়াক্তের সময় তিনি মারা যান। বেঁধে দেওয়া ৭ মাস না, তিনি বেচেছিলেন আরো ২৫ মাসের মতন। গত ৩০ তারিখ হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে তার জানাজা সম্পন্ন হয়।

মনে আছে লেখার একদম প্রথমে একটা প্রশ্ন করেছিলাম? লেখাটা পড়ে কি বুঝলেন? নিজের বিবেককে প্রশ্নটি আরেকবার করুন। উত্তরটা শুনুন।

 

তথ্যসূত্রঃ

১) https://everipedia.org/wiki/ali-banat/amp/

২) http://aboutislam.net/family-society/muslims-4-humanity/gifted-with-cancer-ali-banat-works-to-help-less-fortunate/

৩) https://www.gofundme.com/matwproject

৪) https://en.m.wikipedia.org/wiki/Ali_Banat

৫) https://metro.co.uk/2018/05/30/muslim-millionaire-turned-humanitarian-ali-banat-dies-from-gift-of-cancer-7589893/

 

Feature Photo Source: Instagram.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *