জর্ডানের রাজনৈতিক সংকট : জর্ডানের হাতে কী মসজিদুল আকসার দায়িত্ব অব্যাহত থাকবে?

আল-আকসা মসজিদ মুসলমান ও ইহুদিদের জন্য পবিত্র স্থান। ১৯৬৭ সালের আরব -ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল এটি দখল করে নেয়। এ পবিত্র স্থানের কর্তৃত্ব নিয়ে ইসরাইলের সাথে আরব বিশ্বের অনবরত দ্বন্দ্ব চলছে কয়েক দশক ধরে।

আল-আকসা মসজিদ

জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ মুসলমানদের প্রথম কিবলা। আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণটি একইসঙ্গে মুসলিম ও ইহুদিদের জন্য পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত হয়। মুসলিমরা একে আল হারাম আল শরিফ নামে ডেকে থাকেন। আর ইহুদিরা এ স্থানটিকে টেম্পল মাউন্ট বলে থাকে। ১৯৬৭ সালের আরব যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে তখন শুধু মুসলিমরাই আল-আকসায় নামাজ পড়তে পারতো। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় প্রার্থনার সুযোগ পেত ইহুদিরা। মেনে চলতে হতো অনেক নিয়ম। বিগত ৫১ বছরে এই চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। আর ইসরায়েল এখন আল আকসার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

জর্ডানের রাজনৈতিক সংকট ও সরকার পরিবর্তন

সম্প্রতি জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী হানি আল মূলকি গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন এবং তার স্থলে ওমর আল রাজ্জাজ ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

 জর্ডানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ওমর আল রাজ্জাজ।
  Photo Source: Aljazeera.com

মধ্যপ্রাচ্য এরকম গণ আন্দোলনের মুখে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা খুবই বিরল। ২০১১ সালে অনুরূপভাবে তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া এবং সিরিয়াতে সাধারণ জনগণ সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু এসব গণআন্দোলে সরকারি বাহিনী অনেক আন্দোলনকারীদের নির্মমভাবে দমন করে। তিউনিসিয়াতে জয়ন আল আবেদিন বিন আলী, মিসরের হুসনি মোবারক গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারান। লিবিয়াতে গাদ্দাফি ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন কিন্তু বিদ্রোহী জনগণ ন্যাটো বাহিনীর সহায়তায় তার নিজ শহর সিরতে তাকে হত্যা করে। গণআন্দোলনের মুখে এসব শাসকের পরাজয় ঘটলেও সিরিয়াতে বাশার আল আসাদ এখনো টিকে আছেন। এবছর ইরানেও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকার বিরোধী আন্দোলনের উত্থান ঘটে। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এ আন্দোলন ইতিমধ্যে প্রতিহত করেন। হাসান রুহানি এবং আয়াতুল্লাহ খামেনির মতে এ আন্দোলন ছিল আমেরিকার ষড়যন্ত্র। জর্ডানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হানি আল মূলকি কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সমর্থিত নতুন একটি কর বিলের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এ বিলের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ আন্দোলন গড়ে তোলে, জর্ডানের জনগণের মতে নতুন এই কর বিলের কারণে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া হাজার-হাজার বিক্ষোভকারী সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়। প্রধানমন্ত্রী হানি মূলকিকে সরিয়ে দিতে বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহর প্রতি আহবান জানান তারা। প্রথমদিকে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য ছিল সরকারের পক্ষ থেকে আরোপিত বিল প্রত্যাহার করে নেওয়া, যে বিল ছিল সাধারণ জনগণের জন্য বোঝাস্বরূপ। যখন সরকার সাধারণ জনগণের এ চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হল তখন সাধারণ জনগণ সরকারের পদত্যাগের আহবান জানাল। অপরদিকে জর্ডানের রাজা আব্দুল্লাহ এ গণআন্দোলন এড়িয়ে যেতে অক্ষম হলেন যার ফলে তিনি মূলকির জায়গায় ওমর আল রাজ্জাজকে ক্ষমতায় বসান।

আব্দুল্লাহ বিরোধী প্ররোচনা ও আল -আকসা মসজিদের দায়িত্বের পরিবর্তন প্রচেষ্টা

মক্কা ও মদিনার পর মুসলমানদের পবিত্র স্থান হচ্ছে আল-আকসা মসজিদ। আন্তর্জাতিকভাবে মসজিদুল আকসার স্বীকৃত মোতওয়াল্লি হলেন জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহ। বর্তমানে আব্দুল্লাহ -এর শাসনের বিরুদ্ধে জর্ডানের বিভিন্ন গোত্রের প্রভাবশালী নেতারা বিরোধীতা শুরু করেছে। আব্দুল্লাহকে যদি ক্ষমতাচ্যুত করা যায় তাহলে বেশি লাভবান হলো জায়নবাদি ইসরাইল। কারণ জর্দানে বাদশাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা গেলে মসজিদুল আকসার মোতওয়াল্লির দাবি আর থাকবে না।

  জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ।
 Photo Source: Themedialine.org

যার ফলে ইসরাইলের হাতে চলে যেতে পারে মসজিদ আল-আকসার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জর্ডানের বিভিন্ন গোত্র জনগণকে প্ররোচনা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বনী সখরা গোত্র। তাদের নেতা ফারেজ আল ফয়েজকে জর্দানে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার আহ্বান জানানোর পর গ্রেফতার করা হয়। তিনি বাদশাহ আবদুল্লাহকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, তার গোত্রের লোকদের বাদশাহর আনুগত্য গ্রহণের জন্য তিনি আর বলবেন না।

নেতানিয়াহুর জর্ডান সফর ও জর্ডানের বাদশাহকে আশ্বস্ত

জর্ডানের বাদশা ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
Photo Source: Aljazeera.com

তুরস্ক এবং মিসরের পাশাপাশি জর্ডান হচ্ছে আরো একটি মুসলিম রাষ্ট্র যার সাথে ইসরাইলের কূটনীতিক সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। জর্ডানের রাজধানী আম্মানে এ দুই নেতার মধ্যে এই বৈঠক হয়। নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে বলা হয়, ‘জেরুজালেম শহরের পবিত্র স্থাপনাগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে বৈঠকে নেতানিয়াহু জর্ডানের বাদশাকে আশ্বস্ত করেছেন।’ বৈঠকে বাদশা আবদুল্লাহ জোর দিয়ে বলেন- মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি সব সম্প্রদায়ের জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে পবিত্র এই শহর নিয়ে দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে হবে। কিন্তু ইতিমধ্যে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তরের মাধ্যমে দ্বি-রাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ইসরাইল আল-আকসা মসজিদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইবেনা এর নিশ্চয়তা কোথায়?

Feature Photo Source: Islam21c.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *