চেঙ্গিস খান ও মোঙ্গলদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

প্রায় আটশত বছর পূর্বে একজন ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন অর্ধেক পৃথিবীর অধিপতি হিসাবে। তার নেতৃত্বে বিভিন্ন সভ্যতাকে পরাভূত করা হয়েছিল। একজন উপজাতি, শিকারি এবং পশু চরানো রাখাল হয়েও বিভিন্ন সাম্রাজ্যের শক্তিকে পদানত করেছিলেন। যেসব শহর তার চলার পথে পড়ত প্রায়ই সেসব হারিয়ে যেত, নদীর গতিপথ পাল্টে যেত। তার নাম হচ্ছে চেঙ্গিস খান, গোবি মরুভূমি থেকে বেরিয়ে আসা একজন উপজাতি গোত্রপ্রধা। এখন আমরা চেঙ্গিস খানকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন রহস্য নিয়ে আলোচনা করব।

চেঙ্গিস খান।                               Photo Source: Biography.com

চেঙ্গিস খানের বাল্যকাল

চেঙ্গিস খান ১১৬২ সালের বসন্তকালে বুরখান কালদুনের ঢালে ওনোন নদীর তীরে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম তিমুজিন। তিমুজিন শব্দের অর্থ ‘উৎকৃষ্ট লোহা’। চীনা ভাষায় এর অর্থ হলো ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ ‘। তার যখন জন্ম হয় তখন তার পিতা ইয়ুসুগেই ছিলেন অন্য একটি গোত্রের সাথে যুদ্ধাবস্থায়। বালক তেমুজিন বা চেঙ্গিস খানের বাবা ছিলেন একজন গোত্রপ্রধান। বাল্যকালে তেমুজিনের কাজ ছিল মাছ শিকার করা, ঘোড়ার পাল ও গবাদি পশুকে দেখাশোনা করা। তেমুজিনের  বাবা হুয়েলোন নামক একজন মহিলাকে লুট করে বিয়ে করেন। যার সন্তান হিসাবে তেমুজিনের জন্ম। ইতিমধ্যে তাতাররা একদিন তেমুজিনের পিতা ইয়ুসুগেইকে হত্যা করে। পিতার মৃত্যুর পর তেমুজিনের সংগ্রামী জীবন শুরু হয়। তেমুজিন মাছ চুরির অপরাধে তার সৎ ভাইকে খুন করে। পিতার সাথে শত্রুতার সূত্রে তৈয়ুচিদ গোত্রের লোকেরা তেমুজিনকে বন্দী করে। চতুর তেমুজিন এ বন্দীদশা থেকে পালিয়ে আসেন। তেমুজিনের বাবা যেমন তার মাকে মেরকিত গোত্র থেকে তুলে এনেছিলেন তার প্রতিশোধ হিসাবে তারা তেমুজিনের স্ত্রী বর্তিকে তুলে নিয়ে যায়। তার একবছর পর তেমুজিন তার স্ত্রীকে আবার ফিরেয়ে আনেন।

চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য :

চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য ছিল চীন, ভারতসহ এশিয়া ও ইউরোপের প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল। চেঙ্গিস খান ১২১১ সালে চীনের জিন সাম্রাজ্য ও ১২১৫ সালে জিয়া সাম্রাজ্য দখল করে। ১২১৪ সালের মাথায় চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য পূর্বে জাপান সাগর থেকে পশ্চিমে কাজাখিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। চেঙ্গিস খান ১২১৯ সালে তিয়েনশাল পর্বতমালা পেরিয়ে মধ্য এশিয়াতে পা রাখেন এবং ১২২০ সালে প্রবল প্রতাপশালী খোয়ারেজেম সাম্রাজ্য তার পদানত হয়। এছাড়া আফগানিস্তান হয়ে ভারতের পাঞ্জাব পর্যন্ত চলে এসেছিল মোঙ্গল বাহিনী। ককেশাস ও কৃষ্ণসাগরের আশে পাশের অঞ্চল গুলোও একে একে অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে চেঙ্গিসের সাম্রাজ্যে। ইউরোপে চেঙ্গিসের জয়রথ পৌঁছেছিল বুলগেরিয়া হয়ে ইউক্রেন পর্যন্ত। চিরকাল অজেয় রাশিয়াও তার হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

চেঙ্গিস খানের হত্যাযজ্ঞ

     গ্রেট খালদুন পর্বত।                                                 Photo Source: Mongoliatravel.guide

চেঙ্গিস খানের নিষ্ঠুরতার, বর্বরতার ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনা গুলো অনেকটা কাল্পনিক ঘটনার মতই মনে হয়। ইরানি ইতিহাসবীদ রশীদ আল দীন মঙ্গোলদের হত্যাযোগ্য ও নির্মমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, মঙ্গোল বাহিনী মার্ভে আনুমানিক সত্তর হাজার আর নিশাপুরে আনুমানিক দশ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিলো। ১২৭৯ সালে শেষ হওয়া তাদের চীন অভিযানে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছিলো কোটির ঘরে। উরগেঞ্চে মঙ্গোল বাহিনীর চালানো গণহত্যায় মারা যায় প্রায় দশ লক্ষ মানুষ। ধারণা করা হয় চেঙ্গিস খানের বিভিন্ন অভিযানে মারা পড়েছিল প্রায় ৪ কোটির মত সাধারণ মানুষ যা তৎকালীন পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ।

চেঙ্গিস খানের সন্তানাদি

চেঙ্গিস খানের চার সন্তান ছিল। জোচি খান, চাঘাতাই, ওগেদেই খান এবং তলুই খান। এদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ ও জনপ্রিয় ছিল তার বড় ছেলে জোচি খান। কিন্তু জোচির পিতৃ পরিচয় নিয়ে চেঙ্গিস খানের সন্দেহ ছিল। কিন্তু তিনি তার স্ত্রী বোর্তির কারণে তার এই সন্তানকে ত্যাগ করতে পারেননি। মোঙ্গল নিয়ম অনুযায়ী বড় ছেলে পাবে বাবার জমির সবচেয়ে বড় অংশ। তারপর তার মেজ ছেলে, তারপর সেজ ও সবশেষে ছোট ছেলে পাবে কেবল বাবার ঘর ও পশুপাখির দখল। মোঙ্গল সাম্রাজ্যকে চার ভাগে ভাগ করে চেঙ্গিস খান তার বড় ছেলে জোচি খানকে দেন পশ্চিমের কিপচাক খানাত, চাঘাতাইকে দেন মধ্য এশিয়া ও খোরসান, মঙ্গোলিয়া মূলভূমি পায় ছোট ছেলে তলুই খান আর চীনের বিশাল অংশসহ সাম্রাজ্যর খান-ই-খানান হন ওগেদেই খান। চেঙ্গিস খানের সুযোগ্য ছেলে জোচি খানকে চেঙ্গিস খান জীবিত থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়। ধারণা করা হয় চেঙ্গিস খানই চক্রান্ত করে তার ছেলে জোচি খানকে হত্যা করেন।

চেঙ্গিস খানের কবরের রহস্য

চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর থেকে তার সমাধি খোঁজার চেষ্টা চলছে কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ তার সন্ধান পায়নি। পৃথিবীর ইতিহাসে ত্রাস সৃষ্টিকারীর সমাধি নিরাপদে লুকিয়ে আছে। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর তার মৃত্যুর খবর গোপন রাখা হয়। গোপনীয়তার জন্য শবযাত্রার সময় যেই সামনে আসল তাকে হত্যা করা হলো। ধারণা করা হয়, তার কবরে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ঢেলে দেওয়া হয়। তার সাথে কবর দেওয়া হয় বিভিন্ন দেশ থেকে জয় করে আনা মনি মুক্তা। কবর খোড়ার কাজে ব্যবহার করা সব শ্রমিককে হত্যা করা হয়। তারপর শত শত ঘোড়া চালিয়ে দেওয়া হলো কবরের উপর যাতে কোন চিহ্ন সেখানে না থাকে। চারদিকে প্রচুর গাছ লাগানো হয়। তারপর একে একে সেখানে উপস্থিত সব সৈনরা আত্মহত্যা করল, যাতে তাদের সম্রাটের কবর কেউ শনাক্ত করতে না পারে। তাই আজ পর্যন্ত চেঙ্গিস খানের কবর কেউ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়নি।

তথ্যসূত্র :

১/ হ্যারলড ল্যাম্ব : চেঙ্গিস খান সব মানুষের সম্রাট।

২/ প্রিন্স মোহাম্মদ সজল: সানজাক – ই উসমান :অটোমানদের দুনিয়ায়।

 

Feature Photo Source: Camrea.org

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *