মহাবিশ্বের বুকে কতো ক্ষুদ্র আমরা?

ছোটবেলায় যখন আমাদের পৃথিবীর মানচিত্র দেখতাম, তখন আমাদের দেশ খুঁজে পেতে একটু কষ্ট করতে হত। নিজের এলাকার বিশালত্বের নিকট আমি ছিলাম একেবারে নগণ্য, গণায় ধরবার মতন না। এরপর গ্রাম থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে দেশ! কতো বড় আমার দেশ! সেই দেশকে আবার মানচিত্রে দেখলে নিজের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়তাম।

এরপর আরেকটু বড় হয়ে ছায়াপথ, মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানবার পরে একটা প্রশ্ন মনে এসেছে বারবার, ‘আদৌ আমি আছি কি?’

আজকে আপনাদেরও এই প্রশ্নের সম্মুখীন করবার চিন্তা মাথায় আসল।

নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একটিবারের জন্য সন্দিহান হয়ে উঠবার জন্য আপনি প্রস্তুত তো? চলুন তবে।

এই হচ্ছে আমাদের পৃথিবী, যেখানে আপনি, আমি পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছি।

Photo Source: Nasa.gov

আমাদের সৌরজগৎ আর আমাদের পৃথিবীর স্বজনেরা।

Photo Source: Reddit.com

পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব। খুব বেশী একটা দূর বলে মনে হচ্ছেনা, তাইনা?

Photo Source: Wikipedia.com

দূরত্বের কথাটা আরেকবার ভেবে দেখুন। আমাদের সৌরজগৎ এর সকল গ্রহ এই দূরত্বের মাঝে অনায়াসে এটে যাবে।

Photo Source: Foxnews.com

প্রায় ৬ বিলিয়ন কিলোমিটার দূর হতে ভয়েজার ১ স্পেস প্রোব এই বিখ্যাত ছবিটি তুলে, যা ‘Pale Blue Dot’ নামে পরিচিত। এই ছবিতে এরো দিয়ে পৃথিবীকে দেখানো হয়েছে।

Photo Source: Planetary.org

প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১১ কিলোমিটার বেগে চলমান ভয়েজার-১ আগামী ৩০,০০০ বছরেও এ বেগ নিয়ে আমাদের সৌরজগতের প্রান্তকে অতিক্রম করতে পারবে না।

আমরা আমাদের সৌরজগৎ ছেড়ে আরোও দূরে গেলে ‘Interstellar Neighbourhood’ এ চলে আসব। এ অঞ্চল থেকে ‘আলোকবর্ষ’ এর সাহায্যে দূরত্ব পরিমাপ করা হয়। এক আলোকবর্ষ সমান প্রায় ৯,৪৬১,০০০,০০০,০০০ কিলোমিটার!

Interstellar Neighbourhood; Photo Source: Pinterest.com

উপরের ছবিটিতে লাল এরো দিয়ে দেখানো ডটটি হচ্ছে আমাদের সবচাইতে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারি। ‘সবচাইতে কাছের’ দেখে আবার বেশী কাছে ভেবে বসবেন না! এটি আমাদের থেকে প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে! ভয়েজার-১ যদি তার বর্তমান গতি (প্রতি সেকেন্ডে ১১ কিলোমিটার) নিয়ে সেখানে পৌছাতে চায়, তবে তাকে প্রায় ৭০,০০০ বছর চলতে হবে! আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক,

Photo Source: Youtube.com

আপনি যদি ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় গাড়ি চালিয়ে পৃথিবী হতে প্রক্সিমা সেন্টারিতে যেতে চান তবে আপনার সময় লাগবে এই মহাবিশ্বের বয়সেরও প্রায় ৬ গুণ বেশী বছর!

এরপর আরো দূরত্বে গেলে আমরা আমাদের গ্যালাক্সিকে দেখতে পাব। যার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রায় এক লাখ আলোক বর্ষ!

Photo Source: Youtube.com

গ্যালাক্সির ছোট্ট হলুদ ডটটা দেখছেন? হ্যাঁ, এখানেই আমাদের বসবাস। শুধু তাই না, এই ছোট্ট ডটটার শেষ প্রান্তই মানব ইতিহাসে বেতার তরঙ্গ দ্বারা অতিক্রান্ত সর্বোচ্চ দূরত্ব। অর্থাৎ, এই হলুদ ডটের মাঝেই আমাদের বেতার তরঙ্গ বিস্তারের সকল ইতিহাস বিদ্যমান। ডটটির এর বিস্তার প্রায় ২০০ আলোকবর্ষ!

আমাদের এই গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন (১ বিলিয়ন=১০০ কোটি) এরও অধিক সংখ্যক নক্ষত্র ও গ্রহ রয়েছে। রাতের আকাশে আমি আপনি যা দেখতে পাই তা গ্যালাক্সির খুবই খুবই খুবই ছোট্ট একটা অংশ। নিচের ছবিতে বক্স করে দেখানো এরিয়ার ৯৯% আমরা রাতে আকাশে তাকালে দেখতে পাই।

Photo Source: Youtube.com

গ্যালাক্সি ছেড়ে আরো দূরে গেলে আমরা গ্যালাক্সি সমূহের লোকাল গ্রুপে পৌছে যাব। এই গ্রুপে আমাদের গ্যালাক্সি সহ আরো ৫৪ টি গ্যালাক্সি রয়েছে। এর বিস্তার প্রায় ১০ মিলিয়ন (১ মিলিয়ন=১০ লক্ষ) আলোকবর্ষ!

Local Group of Galaxies; Photo Source: Wikipedia.com

লোকাল গ্রুপ ছেড়ে আরো দূরে গেলে আমাদের দেখা মিলবে ‘Virgo Supercluster’ এর। এর অভ্যন্তরে আমাদের লোকাল গ্রুপের মতোন আরো ১০০ লোকাল গ্রুপ অবস্থিত। এর এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্তের দূরত্ব প্রায় ১১০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ!

Virgo Supercluster, এখানে প্রতিটা ডট এক একটি গ্যালাক্সি; Photo Source: Wikipedia.com

আরো দূরে গেলে আমরা ‘Laniakea Supercluster’ এর দেখা পাব। এটি আমাদের গ্যালাক্সি সহ লাখখানেক গ্যালাক্সিকে ধারণ করে রেখেছে। এর এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তের মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রায় ৫২০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ!

Laniakea Supercluster; Photo Source: Wikipedia.com

আরো দূরে গেলে আমরা আমাদের চোখ দ্বারা যে অব্দি দেখেছি, অর্থাৎ আমাদের ‘Observable Universe’ চোখে পড়বে। যার অভ্যন্তরে রয়েছে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন (১ ট্রিলিয়ন=১ লক্ষ কোটি) গ্যালাক্সি যা ধারণ করে রেখেছে পৃথিবীর সমস্ত বালুকণার চাইতেও অধিক নক্ষত্র! এর প্রস্থ প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ!

Observable Universe, ছোট লাল বাক্সে Laniakea Supercluster অবস্থিত; Photo Source: Wikipedia.com

তবে মাথায় রাখবেন, এই অংশ কিন্তু শুধুমাত্র আমরা যতটুকো দেখতে সক্ষম হই। এর বাইরের জগত সম্পর্কে আমরা এখনও অবগত হতে পারি নি। কারণ এর বাইরের কোন কিছু হতে আলো এখনও আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌছায় নি। কারণ হিসেবে দায়ী এদের বিশাল দূরত্ব, যেখান থেকে আলো এখন অব্দি পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে নি। আবার মহাকাশের কিছু অংশ আলোর চাইতেও বেশী গতিতে সম্প্রসারিত হওয়ার দরুন এদেরকে আমরা কখনই দেখতে পাব না, কখনই না! এতে বোঝাই যাচ্ছে আমাদের দেখতে পাওয়া এই বিশাল মহাবিশ্বের অংশটি পুরো মহাবিশ্বের নগণ্য একটি অংশ মাত্র!

তো মহাবিশ্ব কতবড়ো? এলান গুথ এর কসমিক ইনফ্লেশন তত্ত্বানুযায়ী, আমাদের এই সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব আমাদের ‘Observable Universe’ অপেক্ষা ১৫ সেক্সটিলিয়ন গুণ বড়! যাকে সংখ্যায় প্রকাশ করতে হলে ১৫ এর পাশে ২২ টি শুন্য দিতে হবে! উদাহরণ দিলে বলা যায় যদি আমাদের ‘Observable Universe’ কে একটি লাইট বাল্বের অভ্যন্তরে কল্পনা করি এবং সেটিকে প্লুটো গ্রহের এক জায়গায় স্থান দেই তবে কসমিক ইনফ্লেশন অনুযায়ী মহাবিশ্বের বাকি অংশ হবে প্লুটোর বাকি অংশের সমান! অর্থাৎ প্লুটো গ্রহে উক্ত লাইট বাল্বটি রাখলে বাল্ব কতৃক দখলকৃত জায়গা ব্যতীত পুরো অংশ হবে আমাদের অজানা মহাবিশ্ব!

কি? নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে?

 

Feature Photo Source: Armaghplanet.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *