প্রোগ্রামিং-কোডিং না জেনেও যে অ্যাপ মিলিয়নিয়ার

টেকনোলজি নিয়ে কাজ করে  বিলিয়নিয়র মিলিয়নিয়র হওয়া মানুষগুলোর সফলতার গল্প শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিল গেটস, স্টিভ জবস, মার্ক জুকারবার্গদের নাম। এদের প্রত্যেকেই তারা যে বিষয় নিয়ে কাজ করে সেই বিষয়ের উপর ওস্তাদ। কিন্ত আজকে আমরা এমন একজন মানুষের সফলতার গল্প শুনবো যে টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে  হয়ে উঠেছে একজন অ্যাপ  মিলিয়নিয়র। যদিও কোডিং, প্রোগ্রামিং, টেকনোলজি নিয়ে যার সামান্যতম অভিজ্ঞতাও ছিলোনা। আমাদের অনেক পছন্দের মোবাইল অ্যাপসের জনক এই মানুষটা। শুনলে আরো চমকপ্রদ লাগবে যে এই মানুষটার সফল হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান একটা রোড এক্সিডেন্টের আর তার এন্ট্রিপ্রিনিউয়ারশিপের জার্নিটাও শুরু হয়েছিলো হসপিটালের বেড থেকে।

চাদ মুরেটা
Source: canaltech.com.br

তো জানা যাক সেই সফলতার গল্পটা।

সময় টা তখন ২০০৩ সাল। কোস্টাল ক্যারোলিনা ইনিভার্সিটি থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টের উপর সদ্য গ্রাজুয়েট করে বের হয়েছে চাদ মুরেটা। এবার কিছু একটা করতে হবে। আর সেই তাগিদেই চাদ মুরেটা রিয়াল ইস্টেট ব্যাবসায় ইনভেস্ট করতে শুরু করে। ২০০৬ সালে নিজেই একটা রিয়াল ইস্টেট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসা চালাতে থাকে। কিন্তু কোনভাবেই যেনো নিজেকে স্থির করতে পারছিলেননা চাদ মুরেটা। একে তো ব্যবসায় মন্দা অন্যদিকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন তাকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। পরিবার, বনধুবান্ধব থেকে নিজেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে সে। এভাবেই যাচ্ছিলো দিনকাল।

এবারের সময়টা ২০০৯ সাল। অনেক দিন পর একটা ছুটির দিন পায়া গেলো। চাদ মুরেটা সোজা চলে গেলো এনবিএ বাস্কেটবল খেলা দেখতে। বাস্কেটবল খেলা দেখে বাসায় ফিরে আসার সময় মুরেটা যখন ড্রাইভিং করছিলো তখন সে তার দূর্ভাগা জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় মগ্ন ছিলো। দিনকে দিন যে তার ব্যবসার অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এরকমই দুশ্চিন্তা করতে করতে হঠাতই মুরেটা রাস্তায় তার চলন্ত গাড়ির সামনে একটি হরিণ দেখতে পায়। মুরেটা যথাসম্ভব চেষ্টা করলো হরিণটাকে বাঁচাতে, কিন্ত যা হবার তা ততক্ষণেই হয়ে গেছে।

মুরেটার গাড়ি প্রায় চারবার ডিগবাজি খায়। মুরেটা এক্সিডেন্টের পর সে নিজেকে রক্তাক্ত অবস্থায় আবিষ্কার করে।

তাকে হসপিটালে ভর্তী করা হয়। আর সেখানেই তাকে কাটাতে হয় প্রায় ছয় মাস। এই হসপিটালের বেডে শুয়ে থাকা অবস্থাতেও দুশ্চিন্তা যেনো মুরেটার পিছু ছাড়ছে না। মুরেটার একমাত্র সঙ্গী ছিলো তার আইফোন। সেই আইফোনও মুরেটা তার এক্স-গার্লফ্রেন্ডের দেওয়া আইপড এক্সচেঞ্জ করে পেয়েছে। সে হসপিটালের বেডে শুয়ে শুয়ে অ্যাপস ডাউনলোড করে আর তা ব্রাউজিং করতে থাকে।

Source: slideshare.net

ঠিক এমন সময় মুরেটার এক বনধু তাকে পত্রিকায় মোবাইল অ্যাপস নিয়ে একটা আর্টিকেল পড়তে দেয়। সেও যথারীতি আর্টিকেলটা পড়ে। আর এই আর্টিকেলটাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তখন শুধু আর ডাউনলোড নয় বরং সে খুব আগ্রহের সাথে ইন্টারনেটে অ্যাপস কিভাবে বানাতে হয়, কিভাবে তা পরিচালনা করতে হয় এসব নিয়ে ঘাটতে তাকে।

সে তার কল্পনাশক্তিকেও কাজে লাগায়। তার মাথায় খেলতে থাকে নানারকম অ্যাপসের ধারণা। সে মোবাইল সিকিউরিটি নিয়ে ভাবে,ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে মোবাইল সিকিউরিটি ঠিক রাখার চিন্তা ভাবনা তার মাথায় উকি দিতে থাকে। কিন্তু এখানে যে মহা সমস্যাটা ছিলো সেটা হচ্ছে মুরেটার  প্রোগ্রামিং তো দূ্রে থাক প্রযুক্তি সম্বন্ধেই তার জ্ঞান একেবারে তুচ্ছ। না, মুরেটা আর কষ্ট করে প্রোগ্রামিং শিখবে না। সে একজন এ্যাপ ডেভলপার কে হায়ার করে আনবে। কিন্ত আবার সমস্যা দেখা দিলো। মুরেটার কাছে তো ডেভোলপার হায়া্র করার মত টাকা-পয়সা নেই। সে ছুটলো তার সৎ-বাবার কাছে টাকার জন্য। আর তার সৎ-বাবা তাকে প্রায় ১৮০০ ডলার ধার দেয়। এই টাকা নিয়েই মাঠে নামে চাদ মুরেটা। ডেভোলপারকে দিয়ে তৈরী করিয়ে নেয় ‘Fingerprint Security Pro’ নামের একটি আইওএস অ্যাপ।

এই অ্যাপস বানানোর পর মুরেটাকে আর পেছন দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১১ সালের মধ্যে এই অ্যাপসটি অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরের জনপ্রীয়তার তালিকায় ২৭ নাম্বারে চলে আসে।

কিন্ত মুরেটা এই অ্যাপস থেকে কত টাকা আয় করেছিলো?

এই প্রশ্নের উত্তরটাও চমকপ্রদ।৫০০,০০০ ডলারের থেকেও বেশি। বাংলাদেশের টাকায় যা ৪ কোটি টাকার সমান প্রায়।

শুধু্মাত্র এই Fingerprint Security Pro’ই নয় বরং আরো প্রায় অর্ধ শত খানেক অ্যাপসের জনক এই চাদ মুরেটা। যদিও সে কোনদিনও কোডিং করেনি তবুও তার মাথা থেকেই চমৎকার চমৎকার সব অ্যাপসের আইডিয়া বের হয়েছে। অ্যাপল স্টোরের আরেকটি জনপ্রীয় অ্যাপসের  নাম  ‘Emoji’.  এই  অ্যাপসের আইডিয়াটাও কিন্ত চাদ মুরেটার।

চাদ মুরেটা প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে, কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র হই বা না হই, কোডিং আমাদের আয়ত্বে থাকুক বা না থাকুক, যদি আমরা আমাদের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটা চমৎকার আইডিয়া বের করতে পারি আর তার পেছনে লেগে থাকতে পারি তাহলে সফলতা আসবেই।

 

Leave a comment

One thought on “প্রোগ্রামিং-কোডিং না জেনেও যে অ্যাপ মিলিয়নিয়ার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *