প্লাস্টিক: আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?

ছোটবেলায় আমরা রাজা মাইডাসের গল্প শুনেছি। গ্রীক পুরাণে বর্ণিত এই রাজা তার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিল যেন তার একটি আশা পূরণ করা হয়। তার ডাক তার ঈশ্বর শুনলে সে চেয়েছিল তাকে এমন এক ক্ষমতা দেওয়া হোক যেন সে যা কিছুই স্পর্শ করবে, সবই যেন সোনায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। ঠিক যেন মানুষ রূপী এক পরশ পাথর! তো পরবর্তীতে তার আশা পূর্ণ হয়। সে যাই স্পর্শ করত, সব কিছুই সোনায় রূপান্তরিত হয়ে যেত! সে তো ছিল মহাখুশী! তার পুরো সিংহাসনটাই এখন স্বর্ণে মোড়ানো! আর কি লাগে! কিন্তু সমস্যাটা বাঁধলো যখন সে তার ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাবার স্পর্শ করলো । কারণ তার স্পর্শে খাবার সোনায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। কিছু খেতে না পারার শোকে তিনি তার মেয়ে ম্যারিগোল্ডকে যেই জড়িয়ে ধরে কাঁদতে যাবে, ওমনি তার স্পর্শ পেতেই তার একমাত্র মেয়েটিও সোনায় রূপান্তরিত হয়ে গেল। পৃথিবীর সবচাইতে ধনী মানুষটির জীবন নিমিষেই একাকীত্ব আর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে গেল।

রাজা মাইডাসের সেই আকাঙ্ক্ষার মতনই আমাদের জীবনেও এরকম একটি আকাঙ্ক্ষা আমাদের স্রষ্টা পূরণ করেছেন যখন আমরা জানলাম কিভাবে বাদামী থকথকে পদার্থকে যাদুকরী জিনিসে রূপান্তরিত করতে হয়!

কি সেই জিনিস? জিনিসটা হচ্ছে প্লাস্টিক। খুবই স্বল্পমূল্যের, স্থায়ী আর সহজলভ্য এই প্লাস্টিক আমাদের জীবনে এক আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। বদলে যায় আমাদের জীবনযাপন, বদলে যায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।

 

প্লাস্টিক কি?

রসায়নের ভাষায় প্লাস্টিক হচ্ছে এক জাতীয় পলিমার। এজন্যই অনেক প্লাস্টিকের নাম ‘পলি’ দিয়ে শুরু হয়। যেমন; পলিইথিলিন (পলিথিন), পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন ইত্যাদি।

“পলিমারকরণ বিক্রিয়ায় পলিমার তৈরি হয়। এ বিক্রিয়ায় অসংখ্য অণু একে অন্যের সাথে রাসায়নিক বন্ধনের সাহায্যে যুক্ত হয়ে উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট   বিশাল কাঠামো তৈরি করে। এ জাতীয় অনুগুলোর এক একটিকে বলা হয় মনোমার। অর্থাৎ পলিমার গঠনের একক হচ্ছে এই মনোমার। পলিমার সাধারণত কার্বন ও হাইড্রোজেন থেকে তৈরি হয়ে থাকে। এছাড়াও অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, সালফার, ক্লোরিন, ফ্লুরিন, ফসফরাস অথবা সিলিকনের সাহায্যেও অনেক সময় পলিমার তৈরি হয়ে থাকে।”

 

প্লাস্টিকের ইতিহাস

১৮৫০ সালে ইংলিশ উদ্ভাবক আলেকজান্ডার পার্ক্স এর কাছে প্রথমবারের মতোন প্লাস্টিক দেখা যায়। এর নাম ছিল পার্কজাইন (Parkesine)। এটিই ছিল সর্বপ্রথম মানুষের তৈরি প্লাস্টিক। তিনি সেলুলোজ হতে প্রাপ্ত জৈব উপাদান দিয়ে পার্কজাইন তৈরি করেছিলেন যা একবার তাপ দিলে বাঁকানো যেত আবার ঠান্ডা হলে তার আকৃতি ধরে রাখতে পারত। পরবর্তীতে ১৮৫৬ সালের দিকে সে খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এরপর ১৯৬২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত Great International Exhibition এ প্রথমবারের মতোন জনসম্মুখে তিনি তার পার্কজাইন উন্মুক্ত করেন। পরবর্তীতে এই অবদানের জন্য তিনি অনেক জায়গায় পুরষ্কিত হন।

পরবর্তীতে ১৮৬৯ সালে জন হায়াট প্রথমবারের মতোন কৃত্রিম পলিমার তৈরি করতে সক্ষম হন। এ আবিষ্কার সে সময়ের জন্য এক আশীর্বাদ ছিল। প্রথমবারের মতোন মানুষ কারখানায় প্রাকৃতিক উপাদান এর বিকল্প কোন উপাদান হাতে পায়।

এরপর ১৯০৭ সালে লিও ব্যাকেলেন্ড প্রথমবারের মতোন সম্পূর্ণ কৃত্রিম প্লাস্টিক তৈরিতে সক্ষম হন। এর মাঝে প্রাকৃতিক কোন উপাদান ছিল না। এর নাম ছিল ব্যাকেলাইট। এটি ছিল খুব ভালো তাপ অন্তরক আর স্থায়ী। একে তাপ দিয়ে সহজেই বাঁকিয়ে যেকোনো আকৃতিতে রূপ দেওয়া যেত।

 

প্লাস্টিক কি সত্যিই আশীর্বাদ ছিল?

সম্পূর্ণ কৃত্রিম প্লাস্টিক তৈরি পরপরই এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। হবেই না কেন? এর মতোন সহজলভ্য আর কি হতে পারে? সবকিছুতেই প্লাস্টিকের ব্যবহার হতে লাগল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই প্লাস্টিকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্লাস্টিকের নাইলন সুতা যুদ্ধে সৈনিকদের প্যারাসুট, হেলমেট ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়েছিল। তখন হার্পারস ম্যাগাজিনের ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসের সংখ্যার ৩০৬ পাতায় একটা আর্টিকেলে যুদ্ধের সরঞ্জামে প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার দেখে তারা লেখেছিল, “plastics have been turned to new uses and the adaptability of plastics demonstrated all over again.”। এ বিশ্বযুদ্ধের পরে প্লাস্টিকের উৎপাদন প্রায় ৩০০ ভাগ বেড়ে গিয়েছিল!

আস্তে আস্তে প্লাস্টিক সর্বত্র ব্যবহার হতে লাগল, সাথে বাড়তে লাগল জঞ্জাল। ১৯৬০ সালে সর্বপ্রথম প্লাস্টিকের আবর্জনা সমুদ্রে পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে সর্বত্র ছড়িয়ে যেতে থাকে প্লাস্টকের অবশেষ। সমস্যাটা হলো, কৃত্রিম প্লাস্টিকের পলিমার চেইন ভাঙতে ৫০০-১০০০ বছর লেগে যায়! অর্থাৎ তৈরি হওয়া সর্বপ্রথম প্লাস্টিক এখনও কোথাও না কোথাও অক্ষত রয়েই গেছে! অথচ আমাদের কাছে প্লাস্টিক ‘আসলো আর গেলো’ ভাবেই ব্যবহৃত হয়।

প্লাস্টিকের প্রায় ৪০ ভাগ প্যাকেজিং এর কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কৃত্রিম প্লাস্টিক তৈরি হবার পর থেকে আমরা এখন পর্যন্ত প্রায় ৮.৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক উৎপাদন করেছি, যেখানে শুধুমাত্র ২০১৬ সালেই এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩৫ মিলিয়ন টন!

Photo Source: Youtube.com/kurzgesagt

১৯০৭ সাল থেকে এখন অব্দি আমরা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক আবর্জনায় পরিণত করেছি। এই সব প্লাস্টিককে যদি এক জায়গায় স্থান দেওয়া হয় এবং একে ঘনকের আকৃতি দেওয়া হয়, তবে এর সাইড লেন্থ হবে প্রায় ১.৯ কিলোমিটার!

Photo Source: Youtube.com/kurzgesagt

এতো আবর্জনার পরিণতি কি? এর প্রায় ৯% রিসাইকেল করা হয়, ১২% জ্বালানো হয় এবং বাকি ৭৯% ই আবর্জনা হিসেবেই রয়ে যায়। প্রতি বছর প্রায় ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিকের আবর্জনা সমুদ্রে তাদের নতুন আবাসস্থল খুজে পায়। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে পতিত প্লাস্টিকের ওজন সমুদ্রের সব মাছের সমন্বিত ওজন অপেক্ষা বেশী হয়ে যাবে!

প্রতিটি সমুদ্রের তীরেই এখন প্লাস্টিকের আনাগোনা, যা ব্যাপকভাবে প্রাণিদের উপর প্রভাব ফেলছে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯০% সামুদ্রিক পাখিরা কিছু না কিছু প্লাস্টিক গলাধঃকরণ করেছে! ফলাফল? প্লাস্টিক পরিপাক হয় না এবং গলায় আটকে যায় যার কারণে প্রাণীরা খেতে পারে না এবং প্রতি বছর অনেক প্রাণী ক্ষুদার্থ থেকেই মারা যায়। ২০১৮ সালে স্পেনের সমুদ্র তীরে একটি মৃত তিমি ভেসে আসে যা তার জীবদ্দশায় প্রায় ৩২ কিলোগ্রাম প্লাস্টিক খেয়েছিল!

২০১৮ সালে স্পেনে মারা যাওয়া তিমি; Photo Source: Theguardian.com

প্লাস্টিকের একটি ভয়ঙ্কর রূপ হচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। গড়ে এর দৈর্ঘ্য ৫ মিলিমিটার এরও কম। এসব সাধারণত টুথপেস্ট আর কসমেটিকস এ ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু মাইক্রোপ্লাস্টিক সবচাইতে বেশী পরিমাণ আসে সমুদ্রে ভেসে চলা আবর্জনা থেকে। কারণ এদের উপরে ইউভি রেডিয়েশন সরাসরি পতিত হতে পারে। যার ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভাঙন ধরে এবং সমুদ্রে ছড়িয়ে যায়। প্রায় ৫১ ট্রিলিয়ন মাইক্রোপ্লাস্টিক সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে, যা সমুদ্রের প্রতিটি প্রাণীই কোননা কোন ভাবে গলাধঃকরণ করছে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা মানুষের উপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব নিয়ে বেশী চিন্তিত। কারণ, প্লাস্টিকের জিনিসপত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোপ্লাস্টিক। যেমন; বোতলে ব্যবহৃত BPA বোতলকে স্বচ্ছ করতে সাহায্য করে কিন্তু এই ক্যামিকেল আমাদের টেস্টোটেরনের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। আবার DEHP বোতলকে নমনীয় করতে সাহায্য করে কিন্তু এর ফলে ক্যান্সারও হতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের অনেক খাদ্যে পাওয়া গেছে। যেমন; মধু, লবন, বিয়ার, টেপের পানি ইত্যাদি। ঘরের ভেতর ঘুরে ফেরা ধুলোতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এক গবেষণায় প্রতি ১০ জনের ৮ জন বাচ্চার দেহেই Phthalate (প্লাস্টিকে ব্যবহৃত ক্যামিকেল) পাওয়া গেছে। প্রায় ৯৩% প্রাপ্তবয়স্কের প্রসাবে BPA পাওয়া গেছে।

তো এই সমস্যা থেকে উত্তোলনের উপায় কি? প্লাস্টিকের ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া? দূর্ভাগ্যবশত এটি সম্ভব না। পরিবেশের উপর এর অনেক পজিটিভ প্রভাব আছে। যেমন একটি প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরিতে খুবই কম পরিমাণ শক্তি আর কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। এছাড়াও এমন কিছু সমস্যা রয়েছে যার সমাধান হিসেবে প্লাস্টিকের বিকল্প অন্য কিছুকে গবেষকেরা আপাতত ভাবতে পারছেন না। যেমন সারা বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ খাবার খাওয়া হয় না যা পরবর্তীতে ঠাঁই পায় রাস্তায়, মাঠে এবং ক্ষতিকারক গ্যাস মিথেন নির্গত করে। এর সমাধান একে প্লাস্টিক ব্যাগে সংরক্ষণ করা, যা একে পচনশীলতার থেকে রক্ষা করে।

এতো আবর্জনা আসছে কোথা থেকে? প্রায় ৯০% আবর্জনাই আসে এশিয়া এবং আফ্রিকার ১০ টি নদী হতে। শুধুমাত্র চায়নার ইয়াংটজি নদীর সাহায্যেই প্রতি বছর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে চলে আসে। বিগত কয়েক যুগ ধরেই চায়না, ইন্ডিয়া, আলজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতোন উন্নয়নশীল দেশগুলোর ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো মানবজীবনের অর্থনৈতিক দিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

এজন্য প্লাস্টিককে চিরতরে বন্ধ করাটা সম্ভব না। করণীয় হচ্ছে শক্তিশালী দেশগুলোর এ নিয়ে আলোচনায় বসা উচিত। প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরা উচিত। আমাদের করণীয় ক্যাম্পেইন করে এর খারাপ দিকগুলো তুলে ধরা। তা না হলে হয়তো আমরাও রাজা মাইডাসের মতোন যা আশা করি নি, তাই পেয়ে যাব কোন এক সময়।

 

তথ্যসূত্রঃ

১) https://en.wikipedia.org/wiki/Plastic

২) http://www.historyofplastic.com

৩) https://www.youtube.com/watch?v=RS7IzU2VJIQ

৪) https://www.plasticsmakeitpossible.com/about-plastics/types-of-plastics/what-are-plastics/

 

Feature Photo Source: Wikimedia Commons

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *