সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ ও বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি।

ভৌগলিক বা সাংস্কৃতি উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সিয়েরা লিওন। কিন্তু এ দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই গভীর ও আন্তরিক যে, এ দেশের ভাষাকে নিজেদের করে নিয়েছে আফ্রিকার দেশটি। কি কারণে বাংলাকে সিয়েরা লিওন বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হলো তার প্রেক্ষাপট নিয়েই আজকের আয়োজন।

  সিয়েরা লিওনের মানচিত্র।
 Feature Photo: Worldatlas.com

সিয়েরা লিওন হচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশ এবং একসময় এটি ব্রিটিশ উপনিবেশের কবলে ছিল। এর অবস্থান পশ্চিম আফ্রিকান দেশ লাইবেরিয়া ও ঘিনির মধ্যবর্তী স্থানে। এর আয়তন প্রায় ২৭,৯২৫ বর্গ মাইল। এ রাষ্ট্রের রাজধানী ট্রিটডিও এবং এটি আফ্রিকার অন্যতম পাহাড় ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্বলিত শহর। সিয়েরা লিওন শহরে আফ্রিকার ১৩ টি উপজাতি বসবাস করে এবং এখানকার অধিবাসীর সবাই কৃষ্ণাঙ্গ। এ উপনিবেশটি গড়ে তোলা হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মুক্ত ক্রীতদাসদের নিয়ে। এরা সবাই ছিলো নিগ্রো ক্রীতদাস। মূলত এ কাজটি শুরু হয়েছিল সিয়েরা লিওন সোসাইটি নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে। ব্রিটেন ১৮২৯ সালে তার সাম্রাজ্যে দাস ব্যবসা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু তারপরও গোপনে গোপনে এ ব্যবসা চলতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৮৭ সালে দাস ব্যবসায়ীদের একটি জাহাজ ব্রটিশ বাহিনী কতৃক আটক করা হয় এবং এসব দাসদের মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ মুক্ত দাসদের সিয়েরা লিওন সোসাইটি ১৮৮৭ সালে পশ্চিল আফ্রিকান দেশ সিয়েরা লিওনে প্রেরণ করে এবং সেই সঙ্গে প্রেরিত হয় ৩০ জন ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ বারবনিতা। মুক্ত ক্রীতদাস ও বারবনিতাগণ মিলে গড়ে তোলে সিয়েরা লিওন নামক ব্রিটিশ উপনিবেশ। এ ব্রিটিশ অধিবাসিগণ নিজেদের ক্রিয়োল নামে পরিচয় দিত। এ ক্রিয়েল শ্রেণীর সাথে স্থানীয় আফ্রিকানদের সংঘর্ষ হতো। কিন্তু স্থানীয় আফ্রিকানগণ পরাজিত হয়। ফলে এখানে ব্রিটিশ উপনিবেশ কায়েমী রূপ লাভ করে যা বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
সিয়েরা লিওনের স্বাধীনতা ও গৃহযুদ্ধঃ
১৯৬১ সালে সিয়েরা লিওন প্রজাতন্ত্র ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা উত্তর সিয়েরা লিওন সহ আফ্রিকান দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। এর অন্যতম কারণ ছিল অপর্যাপ্ত ও অসম সম্পদের বন্টন এবং অসম অর্থনৈতিক উন্নয়ন। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ আফ্রিকা ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধশালী মহাদেশ। কিন্তু এ সম্পদ সর্বত্র একই ছিলনা। অপরদিকে উপনিবেশ শক্তিবর্গ সকল দেশের সকল অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর দেশীয় শাসকবর্গ এ ধারা অব্যাহত রাখেন। তাছাড়া আফ্রিকাতে রয়েছে অসংখ্য গোত্র। তাই আফ্রিকান রাজনীতি গোত্রগুলো দ্বারা আবৃত। সমাজে ছোট ও বড় গোত্রগুলোর মধ্যে চলে স্বার্থের সংঘাত। স্বাধীনতার পর আফ্রিকার দেশগুলোতে রাজনৈতি ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসে বড় দলগুলো। ফলে অন্যান্য গোত্রের সাথে শুরু হয় ক্ষমতা নিয়ে সংঘাত। দীর্ঘ দিনের গোত্রীয় সংঘাতের অবসান না করে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ নিজেদের স্বার্থেই আফ্রিকার সীমানা নির্ধারন করার সময় গোত্রতন্ত্রকে বিভক্ত করে আরো সংঘাতের দিকে আফ্রিকানদের ঠেলে দেয়। ফলে স্বাধীনতা পরবর্তী আফ্রিকানদের সংঘাত চরমে উঠে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ হয়ে উঠে অস্থিতিশীল। স্বাধীনতা উত্তর আফ্রিকার গোত্রীয় সংঘাতের অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে সিয়েরা লিওন। ১৯৯১ সালে সিয়েরা লিওনে গৃহযুদ্ধ চরমভাবে আত্মপ্রকাশ করে। এ গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায় The Revolutionary United Front নামক বিদ্রোহী ও গেরিলা সংগঠন। এ যুদ্ধের ফলে সংঘটিত হয় গণহত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন। ফলে সিয়েরা লিওনের রাজনৈতিক পরিবেশ চরমভাবে অশান্ত হয়ে উঠে।

Photo Source: Newstatesman.com

এ প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে সরকার ও বিদ্রোহী সংগঠনের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ১৯৯৭ সালে বিদ্রোহী সংগঠন শান্তি চুক্তি ভঙ্গ করলে আবার শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। নির্বাচিত সরকার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনের জন্য বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ কামনা করে, যা সহিংসতাকে আড়ো বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন সংঘাতের ফলে দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে। অর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য জাতিসংঘ এগিয়ে আসে। জাতিসংঘ তার শান্তিবাহিনী সিয়েরা লিওনে প্রেরণ করে।
শান্তিবাহিনী প্রেরণ ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতিঃ
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নেয়। বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে যোগ দেয়। বাংলাদেশ থেকে ৭৭৫ জন সেনার প্রথম দলটি সিয়েরা লিওনের দক্ষিণ অঞ্চলে লুঙ্গি নামক স্থানে দায়িত্ব নেয়। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে আরও সেনা সিয়েরা লিওন যায় এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ হাজার ৩০০ জন সেনা একত্রে সিয়েরা লিওনে কর্মরত ছিলেন।

শান্তি প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ দল ২০০৫ সালে ফিরে আসে। সর্বমোট প্রায় ১২ হাজার সেনা সিয়েরা লিওনে দায়িত্ব পালন করেন।
শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশ গঠনে বাঙালি সেনাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালের ১২ ডিসেম্বর সিয়েরা লিওনের প্রেসিডেন্ট আহমেদ তেজান কাব্বা বাংলা ভাষাকে সিয়েরা লিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন।

আহমেদ তেজান কাব্বা।                                 Photo Source: Slconcordtimes.com

বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকটি রাজ্য ব্যতীত আর কোথাও বাংলা ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে এই প্রথম স্বীকৃতি পায়। প্রেসিডেন্ট কাব্বা বাংলাদেশ সেনাদলের নির্মিত ৫৪ কিলোমিটার সড়ক উদ্বোধনকালে এই ঘোষণা দেন। বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি ওলুয়েমি আদেনজি, জাতিসংঘ বাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল ড্যানিয়েল ইসমায়েল ওপান্ডেসহ আরও অনেকে। বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট কাব্বা ২০০৩ সালের ২১ অক্টোবর তিন দিনের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসেন।

Feature Photo Source: Africanarguments.org

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *