মসজিদ থেকে গীর্জা: দ্য মস্ক ক্যাথিড্রাল অব কর্ডোভা

পৃথিবীর ইতিহাসে স্পেনে মুসলিম শাসনের সুত্রপাত হয়েছিল মুর জাতির মাধ্যমে । তারা রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিল কর্ডোভা নগরী কে । একসময় স্পেনে শুরু হয় খিলাফত এবং মোট ২৩ জন খলিফা স্পেন শাসন করেন । ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত মুসলিম শাসনামলে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছেঁ স্পেন । এ সময় স্পেনে শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটে । নির্মিত হয় অনেক লাইব্রেরি, হাম্মাম(গোসলখানা) ও মসজিদ । অসাধারণ নৈপুন্যে তৈরী এসব স্থাপনা কেড়েছিল মানুষের হৃদয় । তাদের মধ্যে অন্যতম কর্ডোভা মসজিদ।  খলিফা প্রথম আব্দুর  রাহমানের শাসনামলে ৭৮৪ থেকে ৭৮৬ সালে আন্দালুসিয়ার কর্ডোভায় নির্মিত হয় ঐতিহাসিক কর্ডোভা মসজিদটি।  পরবর্তীতে অন্যান্য শাসকের মাধ্যমে মসজিদের সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন ঘটে । স্প্যানিশ ভাষায় মসজিদ কে বলা হয় ‘মেজিকেতা’ । তাই স্প্যানিশ ভাষায় এই মসজিদ লা মেজিকেতা নামে পরিচিত।
          Photo Source: Ruralidays.co.uk

এক লক্ষ দশ হাজার চারশত স্কয়ার ফিট আয়তনের মসজিদটির নকশা করেন একজন সিরীয়ান স্থপতি। এর থামের সংখ্যা  ৮৫৬ টি, ৯ টি বাহির দরজা ও ১১ টি অভ্যন্তরীণ দরজা রয়েছে । লাল ডোরাকাটা খিলানগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় স্থাপত্যশিল্পে মুসলিম পান্ডিত্যের কথা।
হৃদয় গ্রাহী নকশা ও স্থাপত্যশৈলীর জন্য নবম ও দশম শতাব্দী তে এটি ছিল সারা বিশ্বের প্রথম সারির মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম ।
কিন্ত মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আন্দালুসিয়া কে বিভক্ত করে ফেলে । মুসলমান দের এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্যাসলের রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলা ১২৩৬ সালে স্পেন দখল করলে এই মসজিদ কে গির্জায় পরিণত করা হয় । তখন থেকে একে বলা হয় দ্য মস্ক ক্যাথেড্রাল অব কর্ডোভা ।

স্থাপনের পর থেকে মুসলিমরা এখানে নামাজ আদায় করেছিল প্রায় পাঁচশত বছর ধরে । এর সুউচ্চ চারকোণা আকৃতির মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন খলিফা তৃতীয় আব্দুর রাহমান ।
এক সময় সুন্দর সেই মিনার থেকে ভেসে আসত আযানের ধ্বনি । কিন্ত গীর্জায় রুপান্তরিত হওয়ার পর মিনারটিতে অসংখ্য  ঘন্টা লাগানো হয়েছে ।
Photo Source: Oukas.info
মসজিদে ঢুকতেই চোখে পড়বে যীশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তি । মসজিদের বিভিন্ন আয়াত ও আল্লাহর নামের ক্যালিগ্রাফির পরিবর্তে এখন শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন তৈলচিত্রের ক্রিশ্চান ফলক ।  মসজিদের ভেতরের দেয়ালে ও দেয়ালসংলগ্ন অংশে খ্রিস্ট ধর্মীয় চিত্র ও ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে । (পিক)
বেশ কয়েক জায়গায় আলাদা করে গির্জার মঞ্চ ও পুণ্যার্থীদের বসার বেঞ্চ রয়েছে । মঞ্চে শোভিত হচ্ছে যিশুখ্রিস্ট ও সাধুদের ভাস্কর্য ।
   Photo Source: Trover.com

মসজিদে জুতা পরিহিত অবস্থায় প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং সেখানে নামাজ আদায় করা নিষিদ্ধ ।
অসাধারণ নৈপুন্যে তৈরি এই মসজিদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মহাকবি আল্লামা ইকবাল রচনা করেছিলেন ৭ টি কবিতা । ১৯৩৩ সালে স্পেন সফরকালে আল্লামা ইকবাল এই মসজিদ পরিদর্শন করেন ৷ মসজিদে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শুধু আল্লামা ইকবালকে মসজিদে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয় ৷ মসজিদে ঢুকেই তিনি আযান দেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন ।

কবি আল্লামা ইকবাল কর্ডোবা মসজিদে সালাত আদায়রত অবস্থায়।
Photo Source: Dawn.com

সেই নামাজে অশ্রুসিক্ত হয়ে   তিনি যে মোনাজাত করেছিলেন তা দুয়ায়ে বালে জিবরীল(Bal e Jibreel) নামে পরিচিত । প্রায় সাতশত বছর পর প্রথম মুসলমান হিসেবে তিনিই এই মসজিদে নামাজ আদায় করার সৌভাগ্য অর্জন করেন । ২০০০ সালের প্রথম দিকে স্প্যানিশ মুসলমানরা এই মসজিদের নামাজ আদায় করার দাবি জানালে তা প্রত্যাখ্যাত হয়।
মুসলিম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন এই কর্ডোভা মসজিদটি এখনো গীর্জা হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে । ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো এ মসজিদটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত দেয় ।

Feature Photo Source: Oukas.info

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *