স্নো-বল আর্থ ও বসন্ত

এখন বর্ষাকাল। আর কিছুদিন পরেই হয়ত আমরা পাবো শীতকাল কে। ঘুরতে ঘুরতে আমাদের এই পৃথিবী এমন একটি অবস্থানে আসতে যাচ্ছে যেখানে সেটি আবার কয়েকটি মাস এর জন্য বিষুব রেখার এক পাশে কম আর আরেকপাশে অনেক বেশী সূর্যালোক লাভ করবে, হয়ে উঠবে একদিকে ঠাণ্ডার রোগী আর আরেকদিকে সর্দিজ্বরের রোগীর মত, যা আমাদেরকে এক বর্ণিল পরিবেশ উপহার দিবে। শীত এর হিম হিম কুয়াশা এর মাঝে দীর্ঘ ৫টি মাস কাটিয়ে আমরা আবারও শিশির কণাদেরকে বিদায় জানাবো রাত কাটিয়ে সকালটা আসা মাত্রই!

তবে আমাদের এই পৃথিবী কিন্তু এরকম ছিল না, এমনকি এমন একটা সময় ও ছিল যে সময়ে শীতই ছিল সবথেকে বড় সত্য আমাদের এই পৃথিবীর কাছে। আর এমন অবস্থাতে পৃথিবী একদিন দুইদিন না, ছিল প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর! পৃথিবীর এই অবস্থা কে বলা হয় স্নো-বল আর্থ। কেননা এই সময়ে সমগ্র পৃথিবী ছিল পুরু বরফ এর আচ্ছাদনে ঢাকা আর ছিলনা শীত বাদে আর কোন ঋতু।

Photo Source: Bbc.co.uk

সেই সময় প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে রোডেশিয়া নামের এক সুপার কন্টিনেণ্ট ছিল সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। কন্টিনেন্টাল ড্রিফট থিওরি অবলম্বনে এই সময়ে পৃথিবী একক একটি সুপার কন্টিনেণ্ট বা মহা-মহাদেশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেটি আমাদেরকে ২০ কোটি বছর আগের প্যানজিয়ার (প্যালেজোয়িক যুগের শেষে এবং মেসোজোয়িক যুগের প্রথম দিকে বিদ্যমান মহাদেশ) এর কথা স্বরণ করিয়ে দেয়। তবে এটাই যে সর্বপ্রথম স্নোবল আর্থ ছিল তাই না, বরং এর আগেও প্রায় ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে “হুরোনিয়ান হিমকরণ” এ আমাদের পৃথিবী ছিল প্রায় ৩০ কোটি বছর ধরে শীতের চাদরে বন্দি।

তাহলে সবথেকে বড় যে প্রশ্ন টা আমাদের মাথাতে আসে সেটা হচ্ছে কেন আর কি কারণে এই ধরণের স্নো-বল আর্থ এর উৎপত্তি ঘটে?

উত্তরের প্রথমেই পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট চক্রের কথা জানা যাক, যাকে বলা হয় কার্বোনেট-সিলিকেট চক্র। এই চক্র তখন গঠিত হয় যখন যুগ যুগ ধরে সিলিকন ভিত্তিক পাথর সমূহ প্রকৃতির শক্তির সামনে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্রের তলদেশে চলে যায়। ভূপৃষ্ঠে সিলিকন এর পরিমান কিন্ত কম নয়! প্রায় ১৪% সিলিকেট যৌগ ধীরে ধীরে গ্যাস আকারে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যেতে থাকে আর বিভিন্ন কার্বনেট পাথরগুলো তা শোষণ করে নিতে থাকে। এর ফলে এক সময়ে আমাদের বায়ুমণ্ডলে আর কোন গ্রিন হাউজ গ্যাসই অবশিষ্ট থাকে না!

এই কারণে তখন পৃথিবীতে নিজের তাপ ধরে রাখার জন্য বায়ুমণ্ডলে যে সকল গ্রীণ হাউজ গ্যাস সমূহ উপস্থিত থাকে, তাদের অনুপস্থিতিতে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে যায় প্রায় বেশ কয়েক ডিগ্রী, আর এই গ্যাস এর অস্তিত্ব না থাকার কারণে রাতের বেলাতে একেবারেই তাপ ধরে রাখা সম্ভব হয় না আমাদের পৃথিবীর পক্ষে। ফলে দিনের বেলার উত্তাপ রাতে মহাবিশ্বে বিলীন হয়ে যায়।

ধীরে ধীরে পড়ে যাওয়া বরফের মাঝে আটকে থাকে কার্বন ডাই অক্সাইড এর সমুদয় গ্যাস, যা কার্বনেট আকারে কোনভাবেই বের হতেই পারে না। আর এই পুরু বরফ এর স্তর ছিল পৃথিবীর জন্য মড়ার উপর খাড়ার ঘা এর মত। কেননা এই পুরু বরফ এর উপরে সূর্যের তাপ, আর আলো প্রতিফলিত হয়ে আরও বেশী মাত্রাতে ফিরে যেত বায়ুমণ্ডলে। কেননা পুরু বরফ বিন্দুমাত্রও তাপ শোষণ করে না। এই কারণে শুধুমাত্র ইকুয়েটর বা বিষুবীয় অঞ্চল ব্যতীত সমগ্র পৃথিবী এর তাপমাত্রা কমে গিয়ে দাঁড়ায় মাইনাস ৭২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড!

Photo Source: Bbc.co.uk

তবে বিষুবীয় অঞ্চলে তখনও গ্রীষ্মকালের অস্তিত্ব ছিল, ছিল গন্ধক এর হ্রদ আর Hot Springs বা গরম পানির কুণ্ড। এই কারণে সেই গ্রীষ্ম ছিল আমাদের ধারণার থেকেও অধিক গরম! কেননা সমস্ত প্রতিফলিত তাপ বিষুব অঞ্চল কে আরও বেশী উত্তপ্ত করে তুলত, আর পৃথিবীর অবস্থা ছিল অনেকটা সর্দি জ্বর এর রোগী এর মত, একদিকে প্রচন্ড শীত আরেকদিকে প্রচন্ড গরম!

তবে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ী, এই স্নো-বল আর্থ ছিল আমাদের স্রষ্টারই এক ইশারা! কেননা এই মহাশীত থেকে যেসব এককোষী প্রাণীরা বেঁচে গিয়েছিল, তারাই আমাদের মাল্টিসেলুলার বা বহুকোষী প্রাণীদের ভিত্তি রচনা করেন। এই কারনেই এই স্নো-বল আর্থ এর চক্র না থাকলে আমাদের পৃথিবীতে বহুকোষী জীব কি করে আসত সেটা আমাদের অজানা, হয়তবা আরও কয়েক বিলিয়ন বছর লেগে যেত পারত আমাদের পৃথিবীতে এর উৎপত্তির।

আর এই চক্র এর আবির্ভাব ঘটে একেবারে সঠিক সময়ে। এই স্নো-বল আর্থ এর পরবর্তী ডেভনিয়ান যে সময়কাল বা পিরিয়ড ছিল, সেই সময়েই আমরা সকল বহুকোষী আধুনিক জীবের পূর্বপুরুষদের দেখা পেতে শুরু করি। এই কারণে বলতেই হয় যে সব শীত এর পরেই আসে একটা করে প্রাণ এর বসন্ত। আর কার্বনেট সিলিকেট চক্র এর এই আবর্তন এর কারণে ভবিষ্যতে হয়ত আমাদের মানবজাতিকেও পড়তে হতে পারে আরও একটা মহা বরফ যুগ এর মধ্যে, সেটাও এখন তারই হাতে যিনি আমাদের কে এখানে পাঠিয়েছেন। আমরা এক কসমিক ওডিসি এর সাক্ষী যেন, যেন সাক্ষী এক মহাজাগতিক ঋতু পরিবর্তনের! আর এর মাঝেই আমাদের মাঝে আসে নতুন যুগের নতুন এক বসন্ত।

 

Feature Image Source: News.cnrs.fr

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *