নোয়াম চমস্কির দৃষ্টিতে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ

যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্য বিস্তারের জন্য আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে নিজেদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় তখন আমেরিকার নেতৃস্থানীয় ভিন্নমতাবলম্বী নোয়াম চমস্কির কন্ঠে শোনা যায় প্রতিবাদের সুর। ব্যতিক্রমযুক্ত লেখার জন্য বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বড় পাবলিক বুদ্ধিজীবী হিসাবে সুখ্যাতির পরও তার অধিকাংশ লেখা New York Time, Los Angeles Times, Washington post অথবা Boston Globe এ মুদ্রিত হয়না। সেগুলো মুদ্রিত হয় আমেরিকার আঞ্চলিক খবরের কাগজে। কিন্তু চমস্কির লেখা কলাম ব্রিটেনের পত্রিকায় নিয়মিতভাবে প্রকাশ পেয়ে থাকে।

নোয়াম চমস্কি:

আমেরিকান ভাষাবিদ, যুক্তিবিদ ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কি ১৯২৮ সালের ৭ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রাজনৈতিক বক্তা ও একিভিস্ট পরিচয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তাকে আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনক বলা হয়। তিনি বর্তমান বিশ্লেষণী ধারার দর্শনের অন্যতম পুরোধা। ২০০৫ সালে এক জরিপে তিনি ওয়ার্ল্ডস টপ পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল নির্বাচিত হন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি সারা বিশ্বে বুদ্ধিজীবীদের অনুপ্রেরণা। তার কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণিত, সংগীত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানসহ বিচিত্র বিষয়কে প্রভাবিত করছে প্রতিনিয়ত। উইলিয়াম চমস্কি এবং এলসি চমস্কি দম্পতির সন্তান নোয়াম চমস্কির পুরো নাম আভ্রাম নোয়াম চমস্কি। তরুণ বয়সে তিনি নিউ ইয়র্কের এনার্কিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত হন। ১৯৪৫ সালে দর্শন ও ভাষাতত্ত্বের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৯ সালে দর্শন ও ভাষাতত্ত্বে বিএ ডিগ্রি নেয়ার পর ১৯৫১ সালে হিব্রু ভাষার ওপর অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৫৫ সালে ভাষাতত্ত্বের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। চমস্কি ১৯৫৫ সালে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে গবেষক হিসেবে যোগ দেন। এ প্রতিষ্ঠানেই এখনো শিক্ষক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন ভাষার ওপর। বর্তমানে তিনি প্রফেসর ইমিরেটাস পদে আছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী নীতির বহিঃপ্রকাশ সম্পর্কে নোয়াম চমস্কির বিশ্লেষণ নিয়ে আজকের আয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের আশ্রয়স্থল :

নোয়াম চমস্কির মতে যদি বুশ ডকট্রিন অনুযায়ী সন্ত্রাসের আশ্রয় দাতা দেশগুলো সন্ত্রাসী হিসাবে বিবেচনা করা হয় তাহলে আমেরিকাও সন্ত্রাসের আশ্রয়স্থল। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দুর্বৃত্তদের আশ্রয়দাতা হিসাবে কাজ করে আসছে। এসব দুর্বৃত্তদের কাজকর্ম তাদেরকে সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৯ সাল হতে কিউবাদের বিরুদ্ধে বড় অথবা ছোট মাত্রায় বিভিন্ন আক্রমণাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। অধিকতর সন্ত্রাসী পরিকল্পনার হামলার মাধ্যমে ক্যাস্ট্রোকে হত্যা করা এবং সেই সঙ্গে কিউবা ও কিউবার নাগরিকদের উপর বিদেশি আক্রমণ পরিচালনা করা।

কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো।
Photo Source: Cadenagramonte.cu

ক্যাস্ট্রো বিরোধী সন্ত্রাসীদের যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় দিয়েছে। কিউবার চরেরা সেখানে অনুপ্রবেশ করেছে। ১৯৭৬ সালে কিউবার এয়ারলাইন্স এর ওপর বোমা হামলা করা হয়। এতে প্রায় ৭৩ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এ হামলার রূপকার ও পরিকল্পনাকারী ছিলেন ক্যাস্ট্রো বিরোধী ওরল্যান্ড বুচ। ১৯৮৯ সালে ১ম বুশ তাকে ক্ষমা করে দেন। এক্ষেত্রে বুশ বিচার বিভাগের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারি সন্ত্রাসীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন হাইতির ইমানুয়েল কনস্ট্যান্ট যিনি টোটো নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র তাকে হাইতির হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

আমেরিকার ইরাক আক্রমণ (২০০৩) :

নোয়াম চমস্কির মতে ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিপ্রায় ছিল, তার সামরিক শক্তি বিশ্বে পরিদর্শন করা। যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র পথ হলো অধিকতর দুর্বল শত্রুর ওপর আক্রমণ করা।

         Photo Source: Poriborton.com

সেই সঙ্গে প্রচুর প্রতিরক্ষামূলক প্রচারণা করা যে সেইসব দেশ হলো চূড়ান্ত বিচারে শয়তান। অথবা এমনভাবে প্রচার করা যে, তারা আমাদের দেশে অস্তিত্বের জন্য বিপদজনক। এটিই হলো ইরাকে ওয়াশিংটনের চালচিত্র। জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়াই ইরাক যুদ্ধ সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ইরাক যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কেননা সেখানে আছে অতুলনীয় জ্বালানীর তেল ভান্ডার।

আরব /প্যালেস্টাইন -ইসরাইল যুদ্ধ:

নোয়াম চমস্কির দৃষ্টিতে ইসরাইল -প্যালেস্টাইন সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বিবাদ ও দূর্ভোগের গতি প্রকৃতির প্রধান নির্ধারক। কিন্তু এই অচলাবস্থা নিরসন করা সাধ্যের বাইরে নয়। ইসরাইলের নির্দয় সামরিক দখলদারিত্ব, ভূমি ও সম্পদ নিয়ে নেওয়া, চক্রাকারে ঘটা সহিংসতা সৃষ্টি করেছে পারস্পরিক ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস। দুই রাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধান হচ্ছে এ সংঘাতের প্রকৃত সমাধান।

   আরব-ইসরাইল যুদ্ধে্র অংশ ছবি।
   Photo Source: Katehon.com

কিন্তু তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। যদি ওয়াশিংটন চায়,তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার বাস্তবায়ন হতে পারে। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে দ্বি-জাতীক রাষ্ট্র ইসরাইল -প্যালেস্টাইন গড়ে তোলার সম্ভাবনা ছিল। সেই বছরগুলোতে ইসরাইল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পূর্নাঙ্গ শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠা করারও একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল। এ ধরনের প্রস্তাব ১৯৭১ সালে মিশর দিয়েছিল। তারপর দিয়েছিল জর্ডান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতার অভাবে এ প্রস্তাব আর সামনে এগোয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, সামরিক,কূটনৈতিক মতাদর্শিক ক্ষেত্রে অবিরাম সমর্থন কার্যত ইতিবাচক সমাধানের রাস্তা রুদ্ধ করে রেখেছে। তাই ইসরাইল – প্যালেস্টাইনের ক্ষেত্রে প্রতিদিন দুঃখ ও বেদনাজনক এবং বিভীষিকাময় ঘটনা যুক্ত হচ্ছে। বাড়ছে ঘৃণা, ভয়ভীতি এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা।

৯/১১ পরবর্তি ‘সন্ত্রাসের কাল’:

৯/১১ এর এক বছরের ভেতর আফগানিস্তানকে আক্রমণের আওতাভুক্ত করা হয়। বোমা হামলার শুরুতে আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়। তারপর ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইতিহাসে প্রথমবারের মত বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাষ্ট্রটি একটি নতুন ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’ ঘোষণা করে। এতে বলা হয় তারা স্থায়ীভাবে অন্যান্য রাষ্ট্রের ওপর তাদের প্রভাব ও কতৃত্ব বহাল রাখবে। যে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা শক্তির প্রয়োগ দ্বারা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হবে যাতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সর্বাধিক শক্তি বলে গন্য হয়। জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে যে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধের কথা বলা হয় তা একপ্রকারের ‘সর্বোচ্চ অপরাধমূলক কাজ।”

তথ্যসূত্র :

1)Noam Chomsky, Intervention, City Lights Books (US),May, 2007 2)Imperial Ambitions: Conversations with Noam Chomsky on the Post-9/11 World,Publisher Metropolitan Books, September 15,2005

 

Feature Photo Source: Wikipedia.org

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *