কাশ্মীরে রাজ্যপালের শাসন: কি চায় কাশ্মীরের জনগণ?

কাশ্মীর ছিল একসময় স্বাধীন দেশ। আজ কাশ্মীর দু’টুকরো হয়ে চলে গেছে ভারত ও পাকিস্তানের দখলে। ভারত মনে করে পাকিস্তান কাশ্মীরের একটা অংশ অবৈধভাবে দখল করেছে। পাকিস্তান ও জম্মু কাশ্মীরের ক্ষেত্রে ভারতকে দখলদার বলে মনে করে। অপরদিকে কাশ্মীরের জনগণ নিজেদের পরিচয় দেয় কাশ্মীরি বলে। কাশ্মীর নিয়ে জটিলতার কারণে সাধারণ জনগণ ভারত ও পাকিস্তানকে নিজেদের আপন বলে মনে করেনা। বর্তমানে জম্মু কাশ্মীরে বিজেপি ও পিডিপি জোটের ভাঙ্গনের ফলে কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজ্যপালের শাসন শুরু হয়েছে।কিন্তু এ রাজ্যপালের শাসন কি কাশ্মীরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বয়ে আনতে পারবে?

 

২০১৫ সালের নির্বাচন ও বিজেপি-পিডিবি জোট গঠন

২০১৫ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যসভা নির্বাচনে ২৮টি ও ২৫টি আসনে জিতে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয় পিডিপি ও বিজেপি। কিন্তু পিডিবি ও বিজেপির মধ্যে অসমঝোতার কারণে প্রথম দিকে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয় এ দুটি দল। যার ফলে প্রেসিডেন্টের আদেশে গভর্নর শাসিত শাসন চালু করা হয় জম্মু-কাশ্মীরে। ৪৯ দিন পর পিডিপির সাথে বিজেপির জোট গঠনের মধ্যে দিয়ে গভর্নর শাসিত ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়।

যার ফলে ২ মার্চ, ২০১৫ সালে ভারতের জম্মু কাশ্মীরের মূখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ।

মুফতি সাঈদ; Photo Source: Financialexpress.com

তার এ শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ, বর্ষীয়াণ নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি এবং মুরালি মনোহর জোশি। প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল পিডিপি।

 

মুফতি সাঈদের মৃত্যু ও কাশ্মীরের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী

২০১৬ সালের শুরুতে (জানুয়ারি মাসে) জম্মু-কাশ্মীরের মূখ্যমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ সাঈদ মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুর পর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন সাঈদের মেয়ে মেহবুবা মুফতি।

মিস মুফতির বাবা মারা যাবার পর তাঁর পদে কে আসবেন, কোয়ালিশন সরকারের ভবিষ্যত কী হবে সেটি নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সঙ্গে বেশ কতদিন একধরনের বাকবিতণ্ডাও চলে।

বাবার মৃত্যুর পর মেহবুবা মুফতি মুখ্যমন্ত্রী হতে চাননি। তাঁর অভিযোগ ছিল, জোট সরকারের মৌলিক চুক্তিগুলি লঙ্ঘন করছে বিজেপি। সেই অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করে বিজেপি।

তারপর থেকে জম্মু ও কাশ্মীরে সরকার গঠন নিয়ে বিজেপি ও পিডিপির মধ্যে টালবাহানা শুরু হয়। যার ফলে পুনরায় কাশ্মীরে রাজ্যপালের শাসন জারি রয়েছে।

জম্মু ও কাশ্মীরে নতুন করে নির্বাচন হবে কিনা তা নিয়েও আলাপ আলোচনা শুরু হয়।

পরবর্তীতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন মিস মুফতি। মুদির সাথে মেহবুবা মুফতির ইতিবাচক আলোচনা হয় ।

তারপরই দুটি দলের অচলাবস্থা কাটে এবং কাশ্মীরে পুনরায় জোট সরকার গঠিত হয় এবং জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম মহিলা মূখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন মেহবুবা মুফতি।

 

জম্মু-কাশ্মীরে রাজ্যপালের শাসন

বিজেপ পিডিপির সঙ্গে চলতে থাকা জোট সরকার থেকে বেরিয়ে আসার ফলে সেখানে জারি করার পথ সুগম হলো। কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক সংস্থান অনুযায়ী সেখানে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয় না, হয় রাজ্যপালের শাসন। জম্মু-কাশ্মীরে বিজেপি রাজ্যপালের শাসনের পথ সুগম করার পর সেখানে জঙ্গি দমনের ব্যাপক আয়োজন হচ্ছে। ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত বলেছেন, রাজ্যপাল শাসনে সেনা অভিযানের পথ সুগম হবে। আইপিএস অফিসার দিলীপ কুমারকে কাশ্মীরের রাজ্যপালের উপদেষ্টা করা হয়েছে ।সেনাবাহিনী ২১জন জঙ্গি নেতাদের তালিকা তৈরি করেছে। তাদের খতম করতে পারলেই কাশ্মীরের অশান্তি লাগব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় সরকার ও সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী এদের জঙ্গী বলে শিকার করলে ও এদের বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে কাশ্মীরি জনগণের কাছে। তাই সেনাবাহিনী বা পুলিশ যাদের জঙ্গি বলে হত্যা করে,তাদের জানাজায় কখনো ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার মানুষের সমাগম হয়।

কাশ্মীরি জনগণের আন্দোলন; Photo Source: Defenceaviationpost.com

তাই সাধারণ জনগণ তাদের প্রিয়জনদের হত্যার কারণে পুলিশের উদ্দেশ্য পাথর ছোড়ে অথবা নিজেদের জীবন বিসর্জন দিতে ও দ্বিধাগ্রস্ত হয়না। কাশ্মীরের সাধারণ জনগণের মধ্যে হাজার হাজার ইন্ডিয়ান বিরোধী লোক রয়েছে তারা সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করেনা কিন্তু সেনাবাহিনীদের উপর তাদের রাগ সন্ত্রাসীদের চেয়ে অনেক বেশি।

ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল তখন কাশ্মীর ছিল একটি স্বাধীন দেশ। ১৯৪৭ সালের ২৭ অক্টোবর ভারত এই স্বাধীন দেশ দখল করতে সেনা পাঠায়।সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওহরলাল নেহেরু।

কাশ্মীর দখল ও গণভোটের আশ্বাস; Photo Source: Kashmirreader.com

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বারবার এ প্রস্তাব দেওয়া হয় যে- স্বাধীন কাশ্মীরের মানুষ গণভোটের মাধ্যমে ঠিক করুক তারা স্বাধীন থাকবে না ভারত অথবা পাকিস্তানের অধীনে থাকবে। ভারত সবসময় নিরাপত্তা পরিষদের এ প্রস্তাব (গণভোট) মেনে নেয়। কিন্তু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ভারত কাশ্মীরে গণভোট হতে দেয়নি। কাশ্মীরের জনগণ কাশ্মীরের যে ভূখন্ডকে নিজেদের অধীনে রেখেছে তার নাম আজাদ কাশ্মীর বা স্বাধীন কাশ্মীর। এই কাশ্মীর পাকিস্তানের অধীনে নয়, স্বশাসিত অঞ্চল। তাদের নিজেদের জাতীয় পতাকা আছে, পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা তাদের জাতীয় পতাকা নয়।তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আছে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাদের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নয়। (প্রবীর ঘোষ, কাশ্মীরে আজাদির লড়াই একটি ঐতিহাসিক দলিল, পৃষ্ঠা নং:৮৭) ডাক-তার-যোগাযোগ, বিদেশ ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব কাশ্মীর সরকার পাকিস্তান সরকারের হাতে চুক্তির মাধ্যমে অর্পণ করেছে। আজাদ কাশ্মীরে কোন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অথবা জনক্ষোভ নেই। উভয় কাশ্মীর নিয়েই একটি গণভোট হওয়ার কথা ছিল যার মাধ্যমে কাশ্মীরিরা নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

 

কাশ্মীরের জনগণ কি চায়?

সম্প্রতি ভারতীয় পত্রিকা ‘দৈনিক পুবের কলমে ‘ একজন সাংবাদিক লিখেছেন যে কাশ্মীর যে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ সেকথা কাশ্মীরের ১ শতাংশ লোকও বিশ্বাস করেনা। বরং কেন্দ্রীয় সরকার কোন প্রধানমন্ত্রীর আমলে কাশ্মীরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তা তাদের মুখস্ত। কাশ্মীর টাইমসের সম্পাদক বেদ ভাসিনের মতে ‘কাশ্মীরের তিন অঞ্চল, লাদাখ-জম্মু-উপত্যকাকে স্বশাসন ও পৃথক বিধানসভা উপহার দিয়ে এক সার্বভৌম, স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ ও ফেডারেল রাজ্য হিসাবে স্বীকৃত দেওয়া দরকার। কেন্দ্র শুধু দেখবে, যাতে ধর্মীয়, জাতিগত ও স্বতন্ত্রতা বজায় থাকে। কাশ্মীরের সমস্যা সমাধান করতে হলে এই পথেই এগুতে হবে। ভারত এবং পাকিস্তানকে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের জন্য নিজেদের অনড় অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। শুধুমাত্র সন্ত্রাসবাদকে বড় করে না দেখে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে জনমতের উপর ভিত্তি করে আসল সমাধানের কথা চিন্তা করতে হবে।

 

Feature Photo Source: Flickr.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *