মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস

আমাদের মাঝে সব সময় মিসর এক অজানা কুহেলিকার জন্ম দিয়ে দেয়, হোক সেটা মুসা (আ) আর ফেরাউন এর কাহিনী কিংবা প্রাচীনকালের কোন মমিকে নিয়ে কোন অজানা গাঁথা! মিসর বা কালো মাটির ভুমি আমাদের কাছে চিরকাল এক অজানা রহস্য আর কুহেলিকার নাম।

তবে একটি বিষয়ে চিরকাল মিশর এর মানুষেরা আমাদেরকে আশ্চর্য করে গেছেন। আর সেটি হচ্ছে জ্যোতির্বিদ্যা। এর উত্তরে ভু-মধ্যসাগর, পূর্বে লোহিত সাগর। এর মাঝে উত্তর দিকে সামান্য বৃষ্টি হলেও মিশরে সেটা কখনও সমস্যা আনতে পারে না, কেননা মিশর চিরকালই নীলনদ এর দান, আর এই নীলনদে যে বন্যা হয় গ্রীষ্মের প্রারম্ভে, তার পানি কে সংরক্ষণ আর সেই পানি দিয়ে কৃষিকাজ এর মাধ্যমেই মিসর নিজেকে সব সময় টিকিয়ে রেখেছে আর জন্ম দিয়েছে মানব সমাজ এর অন্যতম এক পুরনো সভ্যতার।



প্রাচীন যুগে জ্যোতির্বিদ্যা

Photo Source: Crystalinks.com

মানব সমাজের মাঝে মিসরের সভ্যতা সম্ভবত সব থেকে প্রাচীন, তবে মিসরে প্রাচীন সভ্যতা মুলত গড়ে উঠার পিছনে ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের অনেক বড় অবদান। প্রতি বছর নীলনদে বন্যার ফলে পানি সংরক্ষণ করবার বিশাল কর্মকাণ্ড শুরু হতো। আর এর জন্য দরকার হত একটি কাউন্সিল এবং একদল নেতার। এর ফলেই সূচনা হয় প্রথম রাজবংশের যা আজ থেকে প্রায় ৬ হাজার বছর পূর্বে জন্ম নিয়েছিল। আর এই দেশে  ছিল একেবারে কাঁচের মত স্বচ্ছ রাতের আকাশ। এই কারণে চাঁদ এর কলা আর তারকা দেখে, মিসরে বের করা হত কখন বন্যা আসবে, আর কখন গ্রীষ্মকাল এর শেষদিক।

তবে জ্যোতির্বিদ্যা একদম অকিঞ্চিৎকর হয়ে যায় যদি এর সাথে না যুক্ত হয় জ্যামিতি। মিসরে প্রতি বছর নীল নদের পানি ব্যবহারের জন্য বাঁধ দেওয়ার দরকার ছিল। কিন্ত প্রতিবার বন্যার পরেই বাঁধ নষ্ট হয়ে যেত। এই কারণে সব জায়গা যাতে করে সমান সেচ প্রাপ্ত হয় এই জন্য তারা ঠিক করে দেন কোন কোন এলাকার জমির সীমানা কি কি। আর এখান থেকেই তৈরি হতে থাকে জ্যামিতি এর ভিত্তি।

প্রাচীন মিসরে বছর কে তিনভাগে ভাগ করা হত, বন্যাকাল, ফসল বোনার কাল ও ফসল কাটার কাল। প্রথমে চন্দ্রমাস এর মাধ্যমেই এই হিসাবটা রাখা হত। চন্দ্র বছরকে ৩৬০ দিন ধরে নিয়ে ১২ দ্বারা ভাগ করে এই হিসাব রাখা হত, কিন্ত দেখা যেত যে প্রায় ৫ দিন ছোট হয়ে যায়। এই কারণে একটি মাস কে ইশমুন মাস ধরে নিয়ে এই মাস এ ৫ দিন যোগ করে দেওয়া হত। এভাবে প্রায় তিনশত বছর পরে নথিপত্রে ঝামেলা দেখা যায়। এই সময়ে বন্যাকালে কয়েক মাস এর তারতম্য দেখা যায় এমনকি বন্যাকাল কোন সময়ে হতে পারে সেটা নিয়ে প্রতি মাসেই ঝামেলা হতে শুরু করে ।

তখন থেকে পুরোহিত বা জ্যোতির্বিদরা আকাশের তারা কে দেখে নির্ণয় করতে শুরু করেন। তারা খেয়াল করেন যে আকাশের সবথেকে উজ্জ্বল তারকা বা সোথিস (লুদ্ধক) এর উদয় যখন সূর্যোদয় এর সাথে সাথে পূর্ব আকাশে  হয়ে থাকে, সেই সময়ে নীল নদ এর পানি বাড়তে থাকে।

তারা এটাকে কাল্পনিক বা আকস্মিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে পারেননি এবং তারা এটাও পরিমাপ করেন যে প্রতি ৪ বছর পর পর এই দিনটি একদিন করে এগিয়ে যায়। তারা ৩৬৫ ১/৪ দিনে ১ চতুর্থাংশ সথিশ কাল ধরেন আর প্রতি ৪ বছর বা ৪*৩৬৫ ১/৪ বা ১৪৬১ দিন কে এক সথিশ কাল ধরেন ।

 


গ্রহ সম্পর্কে ধারণা

Photo Source: Crystalinks.com

মিশরীয়রা কিছু কিছু গ্রহ সম্পর্কেও ধারণা রাখতেন। তাদের লেখনি তে দেখা যায় তারা বৃহস্পতি গ্রহ এর নামকরণ করেছিলেন ইয়াপশেতাতুই, কাহিরী ছিল শনি গ্রহের নাম, ছাকু ছিল বুধ গ্রহের নাম। তাদের পর্যবেক্ষণে চাঁদের নাম ছিল ইয়াহু আউহু।

আর তারা এই সকল গ্রহ কে মনে করতেন তারা এক জাতের নৌকা তে চড়ে আকাশে পরিভ্রমণ করে বেড়ান, উপরের তিনটি গ্রহের নৌকা সূর্য আর চাঁদ এর সাথে একই দিকে গেলেও, মঙ্গল গ্রহ (দোশিবির) এর নৌকা পিছনের দিকে চলে। শুক্র গ্রহ কে তারা ডাকতেন বোনু নামে আর এই গ্রহ যে দুইভাবে দেখা যায়, সকালে শুকতারা আর রাতে সন্ধ্যাতারা। তাদের কাছে এদেরও দুইটি নাম ছিল শুকতারা হিসেবে এর নাম ছিল তুইনিতিরি আর সন্ধ্যাতারা হিসেবে এর নাম ছিল উয়াতি (সকলের আগে যে তারা আকাশে দেখা যায়)।

 


সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ

তারা ধারণা করতেন, সূর্য একটি সোনার নৌকাতে করে মিশর এর প্রধান বারোটি শহর কে আলকিত করতে করতে চলে যায়, অন্যদিকে আম দুয়াৎ বা অন্য জগতের দুয়ার দিয়ে জগত এর ১২ টি শহর কে আলোকিত করে।

সূর্য গ্রহণ সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল যে তাদের সূর্য দেবতা কে একটি সর্পে আক্রমণ করে যার জন্য কখনও কখনও এই কারণে সূর্য গ্রহণ হয় ।

আর ইয়াহু আউহু বা চন্দ্র এর একটি শত্রু আছে , আর সেই শত্রু হচ্ছে একটি শূকরী। প্রতিমাসের ১৫ তারিখে এই শুকরী চন্দ্র কে আক্রমণ করে এবং চন্দ্র ১৫ দিন যন্ত্রণা ভোগ এর পর পুনরায় সুস্থ হতে শুরু করে, কখনও কখনও এই শূকরী চাঁদকে পুরোপুরি গিলে ফেললে পরে তখন চন্দ্র গ্রহণ হয়।

তবে প্রাচীন এই যুগ শেষ হবার পরে, প্রায় হাজার বছর এর ন্যায় সময় মিসরে তেমন কোন বড় জ্যোতির্বিদ জন্ম নেন নাই । সর্বশেষ মিসরে জন্ম হয়েছিল ২৭৬-১৯৫ খ্রিস্টপূর্ব এর দিকে ইরাটোস্থিনিস এর।

 


মুসলিম যুগে জ্যোতির্বিদ্যা

Photo Source: Crystalinks.com

উমাইয়া যুগে শুরু হয়ে প্রায় ২০০ বছর ধরে আমাদের মাঝে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞান এর বিকাশ ঘটতে শুরু করে। এর বিকাশ থেকে মিসরও দূরে ছিল না। যেহেতু ত্রয়োদশ শতকে এটি আমাদের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ।

ইবনে ইউনূস (খ্রিষ্টীয় ৯৫০-১০০৯) সূর্যের গতিপথ এর  জন্য প্রায় ১০,০০০ টিরও বেশী অবস্থান লিপিবদ্ধ করেন প্রায় ১.৪ মিটার ব্যাসের একটি বৃহৎ অ্যাস্ট্রোল্যাব  ব্যবহার করে। গ্রহন সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণগুলি কয়েক শতাব্দী পরে চাঁদের গতির উপর সিমন নিউকম্বের গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছিল, তার অন্য পর্যবেক্ষণগুলি বৃহস্পতি এবং শনির  কক্ষপথ জনিত অনিয়ম কে পর্যবেক্ষণ করতে অত্যন্ত সাহায্য করেছিল জ্যোতির্বিদ ল্যাপলাসকে ।

১০০৬ সালে, আলি ইবনে রিদওয়ান সে বছরে সংঘটিত  সুপারনোভা দেখেছিলেন, আমাদের ইতিহাসে যা সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল মহাজাগতিক ঘটনা হিসবে হিসেবে গণ্য বা রেকর্ড করা হয়েছিল। অস্থায়ী সেই তারকাটির সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণ তিনিই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, বস্তুটি চন্দ্রের ডিস্কের এক চতুর্থাংশ উজ্জ্বল এবং সন্ধ্যাতারার থেকে প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি উজ্জ্বল ছিল এবং দক্ষিণের দিগন্তে তারকাটি অনেক নিচে দৃশ্যমান হয়েছিল। ১১ তম শতাব্দী বা ১২ শতকে মিশরে অ্যাট্রোলবিক দিক নির্দেশক চতুরক  আবিষ্কৃত হয় এবং পরে সেটি ইউরোপে “ক্যাদ্রান্স ভেটস” (ওল্ড কোরাড্রেন্ট) হিসাবে পরিচিত পায়।

১৪ শতকের মিশরে নজম আল-দীন আল-মিসরি (খ্রিষ্টীয় ১৩২৫) একটি বইতে ১০০ টি নানা প্রকারের বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানধর্মী যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছেন যার অনেকগুলি তিনি নিজে আবিষ্কার করেছিলেন।

Feature Photo Source: Strangehistory.net

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *