ইজিয়ান এপোক্যালিপ্স

আমরা অনেক সময়েই ধারণা করে থাকি, যে আমাদের এই সভ্যতা এত এই সংস্কৃতি যে কোন দিন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এটাকে প্রাচীন ল্যাটিন ভাষাতে বলা হয় এপোক্যালিপ্স। একেই অনেকে বাংলাতে কিয়ামত মনে করলেও আসলে এপোক্যালিপ্স এর শাব্দিক অর্থ সূর্যগ্রহণ। এটার সরাসরি অর্থ গ্রহণ করলে পারে এটাই বোঝায় যে যে কোন বড় মাপের ধ্বংসযজ্ঞ যার ফলে মানবজাতি এর সভ্যতা ও সৃষ্টি একদম ধ্বংসের সীমাতে পৌঁছে যায়, তাকে বলা হয় এপোক্যালিপ্স। আমাদের থেকে আজ প্রায় ৩২০০ বছর পূর্বে ব্রোঞ্জ যুগে এরকম ভাবেই মানুষ এর সভ্যতা পৌঁছে গেছিল প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একে বলা হয় ইজিয়ান এপোক্যালিপ্স।

 

কেন এই নাম ?

আমাদের ব্রোঞ্জ যুগে সমস্ত সভ্যতাই গড়ে উঠেছিল আসলে ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। আরও সঠিক ভাবে বললে, ইজিয়ান সাগর এর তীর ঘেরেই গড়ে উঠেছিল যথাক্রমে, মিশরীয়, ব্যবলনীয়, হিট্টাইট,গ্রীক, ইজরায়েল এবং মিনোয়ান (ক্রিট) সভ্যতা  যদিও তখন সিন্ধু সভ্যতা ছিল। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে সেটাও ধ্বংস হয়ে যায় ১২০০ খৃস্টপূর্বেই!

এ সমস্ত সভ্যতার একত্রে নাম ছিল ইজিয়ান সভ্যতা বা Aegean Civilization

এরা ব্রোঞ্জ ব্যবহার করত নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যবহারের জন্য। তারা নতুন নতুন জিনিস উদ্ভাবন করেছিল। আর তাদের ইতিহাসে চোখ বুলালে আমরা দেখতে পাই যে সে সময়ে তারা বড় বড় জাহাজে করে আফ্রিকার বহু দূর দুরান্তের উপকূল পর্যন্ত গিয়েছিলেন।

Image source: Pinterest.com

তবে তাদের এই কর্মকান্ড হঠাৎই থেমে যায় ১২০০ খ্রিস্টপূর্বে। এরপর মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে একে একে তাদের সমস্ত রাজ্য এবং সভ্যতা সমূহ ভেঙ্গে পড়ে!

ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা; Image source: Ancient-origins.net

 

তাদের বিস্তৃতি; Image source: Pinterest.com

কি কারণ ছিল যার কারণে তাদের এই সুবিশাল সভ্যতা ভেঙ্গে পড়ে? ধারণা করা হয়, কোন এক অজ্ঞাত কারণেই এরা সকলে (মিশর ব্যতীত) একেবারে ধ্বংস হয়ে যায় ১২০০ খ্রিস্টপূর্বে। কিন্তু অনেকেই তাদের ধ্বংস হওয়ার জন্য অনেক গুলো কারণকে দায়ী করে থাকেন। এরকমই কিছু কারণ নিচে আলোচনা করা হলো।

 

ক্রমাগত ভুমিকম্প

অনেকে ধারণা করে থাকেন Series Earthquake বা ক্রমাগত ভুমিকম্প এর কারণে ইজিয়ান এপোক্যালিপস হয়েছিল। এর কারণ হচ্ছে অনেক সময় টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত চলনের কারণে ইজিয়ান সাগর অঞ্চলে কয়েক বছর পর পর ক্রমাগত ভুমিকম্প হতে থাকে, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল প্রায় ৮-৯! ধারণা করা হয়, এই কারণে সভ্যতাসমূহ ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্ত, এর আগেও সুবিশাল ভুমিকম্প থেকে অতি দ্রুত গতিতে সভ্যতা জেগে উঠেছে এটাও সত্য। এই কারণে সভ্যতা ধ্বংসের ব্যাপারে এই ভুমিকম্প তত্ত্ব আসলে তেমন একটা কার্যকরী না। ভুমিকম্প একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেবার পরে আবারও কয়েক বছর চুপ থেকে পুনরায় ভুমিকম্প হয়ে আরেকটি সভ্যতা কে ধ্বংস করে দিল, এরকম নজির দূর্লভ।

Image source: Wikipedia.org

 

ক্ষরা/Drought

হিট্টাইট দের কিছু কিছু একাউন্ট চেক করলে পারে এবং হাতুশা (হিট্টাইটদের রাজধানী) এর শেষদিকের ক্রনিকল চেক করলে পারে এর স্বপক্ষে কিছু কিছু সত্যতা পাওয়া যায়। কিন্ত এরপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, মাত্র কয়েক বছরের ক্ষরাতে একটা পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়না। আর দ্বিতীয়ত হাতুশাতে সেই সময়ে কিছু ক্ষরা থাকলেও অন্য কোথাও এরকম কোন রকম এর রেকর্ড পাওয়া যায়নি। সেই সময়ে ব্যবিলনে টাইগ্রিস অ্যার ইউফ্রেটিস এর মত নদী ছিল যারা সর্বদা নাব্য থাকত। এই কারণে তত্ত্বটি একাডেমিক দের কাছে পাত্তা পায়নি ।

 

যাত্রা তত্ত্ব /Exodus

ধারণা করা হয় যে এই সময় এর আশেপাশেই মুসা (আঃ) এর নেতৃত্বে মিশর থেকে ইহুদি রা প্রায় সবাই বেরিয়ে আসে ও তাদের মহাযাত্রা (Exodus) সংঘটিত হয়। এই কারণে মিশর এর অর্থব্যবস্থা যা পুরোপুরি দাস নির্ভর ছিল সেটা ভেঙ্গে পড়ে এবং তাদের সভ্যতা ধ্বংস হবার উপক্রম হয়। আর তাদের বের হয়ে যাবার পরে তাদের কেনানবাসীদের সাথে যুদ্ধ হবার কারণে সেই সভ্যতাটিও ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্ত তারা এটা উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয় যে ফ্রিজিয়া, ব্যবিলন হিট্টাইটরা কি করে ধ্বংস হয়।

 

আগ্নেয়গিরি

ধারণা করা হয় যে মিশর এর কাছাকাছি একটা স্থানে হেকলা ৩ নামক আগ্নেয়গিরি ১১৫৯ সালের দিকে বিস্ফোরিত হয় এবং এই কারণে সমস্ত আকাশ ধুয়া আর ছাই এর প্রবল চাদরে ঢেকে যায় এবং এর কারণেই বিভিন্ন সভ্যতার বিভিন্ন শহর বসবাস এর অযোগ্য হয়ে পড়ে। এটির কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও এটি খুব একটা শক্তিশালী তত্ত্ব না।

 

মিশ্র কারণ

অনেকে ধারণা করেন, ভুমিকম্প, ক্ষরা আর মহাযাত্রা সকল কিছুর জন্যই এই সমস্যার সূচনা হয়েছিল। এছাড়াও ছিল আগ্নেয়গিরি এবং লৌহ যুগের উত্থান যা এতদিন অব্দি বিশেষজ্ঞরা মেনে আসলেও বর্তমান কালে কিছু নতুন প্রমাণ পাওয়াতে তাদের মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরে গেছে।

 

নতুন তত্ত্ব: সমুদ্র থেকে আগত মানুষ (The Sea People)

বহু বহু মিশরীয় চিত্র এবং হায়ারোগ্লিফিক্সে এক জাতীয় বন্য ফিনিশীয় মানবদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা সংখ্যাতে ছিল কয়েক লাখ এবং এসেছিল সমুদ্র থেকে। এরা ছিল সে সময়ে চ্যারিয়ট রানার স্লেভ। ব্রোঞ্জ যুগের মূল সেনা তৈরি হত চ্যারিয়ট বা রথ এর দ্বারা। এই রথের চারপাশে বর্শা হাতে কিছু মানুষ এর অস্তিত্ব থাকত যারা তীর বিদ্ধ আহত শত্রুর উপরে আঘাত করত। তবে পরবর্তীতে এদের অনেকেই চাকুরি হারানো ও অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে যায় এবং অন্যান্য জংলি আর বর্বর গোষ্ঠীদের সাথে মিশে যায়। পরবর্তীতে এরাই সী পিপল হয়ে এই সমস্ত সভ্যতার উপর আছড়ে পড়ে ।  

ব্রোঞ্জ যুগের সেনাবাহিনী; Image Source: Realmofhistory.com

এরা নিজেদের আবিষ্কৃত হালকা, বহনযোগ্য এবং নিক্ষেপ যোগ্য বর্শা আর মাছধরার হারপুনের মাধ্যমে চ্যারিওট বা রথদেরকে পুরোপুরি ভাবে ধ্বংস করে ফেলে। তাদের বিশাল সংখ্যার জনবলের কাছে কেউই পেরে উঠত না! এর সাথে সাথে তারা মিশরেও হামলা চালায়, কিন্ত মিশর নিজের তীরন্দাজদের মাধ্যমে রক্ষা পায় তাদের রিভার অয়ারফেয়ার বা নদীযুদ্ধ এর টেকনিক ব্যবহার করে।

দ্যা সী পিপল; Image source: Periklisdeligiannis.com

এর মাধ্যমেই এখন এই সমস্ত কারণ এর মাঝে এই সী পিপলদের আক্রমণ কেই সবথেকে বড় কারণ হিসেবে ধরা হয় ইজিয়ান এপোক্যালিপ্সের। আর কে জানে হয়ত আমাদের জন্যও ভবিষ্যতে এমনই কোন এক এপোক্যালিপ্স অপেক্ষা করে আছে।

এমনি করেই মানব এগিয়ে চলেছে। যদিও এর পরে প্রায় ৪ শতাব্দী যাবত অন্ধকার যুগে আমাদের কে পড়ে থাকতে হয়েছে। কিন্ত ৮০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে পুনরায় পৃথিবী জেগে উঠে লৌহযুগের সভ্যতা হিসেবে, আর আবারও শুরু হয় আমাদের গল্প।

 

Feature Photo Source: Bradleyjfest.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *