দ্য হাম: অশুভ কোন শব্দ নাকি নরকের আওয়াজ

আপনি কি মাঝে মাঝেই অদ্ভুত কিছু শব্দ শুনতে পান? আপনার কি মনে হয় যে ডিজেল চালিত কোন যানবাহনের শব্দ আসছে খুব আস্তে এবং সবদিক থেকেই? তাহলে আপনি সম্ভবত পৃথিবীর সেই ২% মানুষের একজন যারা রহস্যময় শব্দ ‘দ্য হাম’ শুনতে পায়!

দ্য হাম এমন এক রহস্যময় শব্দ যা পৃথিবীর নানা জায়গার নানা মানুষ শোনার দাবী করেছেন এবং সবাই বলেছেন যে শব্দটা প্রায় সবদিক থেকেই আসে। কারো কারো মতে, আকাশ থেকেও শব্দ আসতে শুনেছেন তারা।

Photo Source: Strangesounds.org

এই শব্দটা কি মানুষের কোন ক্ষতি করে?

গোটা পৃথিবীতে প্রায় ২৫ টি রিপোর্ট পাওয়া গেছে যে হাম শোনার পর কিছু মানুষের নাক এবং কান দিয়ে রক্তপাত শুরু হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ১০ জন মানুষ মারাও গেছে।

২০০৩ সালে আমেরিকান স্কুলছাত্র ‘শ্যাগি উইলিয়াম’ দুইবার পুলিশে রিপোর্ট করে এবং জানায় যে সে এমন অদ্ভুত শব্দ শুনতে পায়। স্বভাবতই ব্যাপারটা খুব একটা পাত্তা দেয় না পুলিশ। আর এক সপ্তাহ পরে শ্যাগির ঘরে তার ঝুলন্ত মৃতদেহ আবিষ্কার করেন তার মা-বাবা। তার সুইসাইড নোটে লেখা ছিল, “অন্ধকারের জগৎ থেকে আসা সেই শব্দগুলো আমি আর সহ্য করতে পারছি না! আর না, আমি বিদায় নিচ্ছি!”

আজব না?

১৯৭০ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলের এক খবরের কাগজ একটি অদ্ভুত জরিপের আয়োজন করে। জরিপের প্রশ্নটি ছিল, “আপনি কি হাম শুনতে পান?” তখন অনেকেই ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি করেছিল।

কিন্তু শহরের প্রায় ৮০০ জন মানুষ বলেন যে তারা শব্দটি শুনেছেন। সেই থেকে পৃথিবীর নানা শহরেই এই নিয়ে জরিপ হয়েছে।

আমেরিকার নিউ মেক্সিকো এবং নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে সবচেয়ে বেশী মানুষ এই শব্দটি শুনেছেন। ওইসব শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২% মানুষ এই শব্দ শুনেছেন বলে দাবী করেছেন।

হাম নিয়ে একটা ওয়েবসাইটও রয়েছে যেখানে আপনি দেখতে পারেন পৃথিবীর কোন কোন জায়গাতে মানুষ এই শব্দ শোনার দাবী করেছে।

Photo Source: Duncommutin.com

আপনি যদি হাম শুনে থাকেন তবে আপনিও সেখানে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা লিখতে পারেন। হামের ভিত্তিতে পৃথিবীর মানচিত্রকে সেখানে যেভাবে ভাগ করা হয়েছে সেখানে দেখা গেছে আমাদের দেশেও দুজন মানুষ এই শব্দ শোনার দাবী করেছেন।

কিন্তু এই শব্দ আসে কোথা থেকে? এটা কি শুধুই মানুষের কল্পনা?

সত্যি বলতে কি আমাদের আধুনিক বিজ্ঞান এখনো এই শব্দের সঠিক উৎস বের করতে পারেনি।

তবে ডাক্তারেরা বলেন, হাম সাধারণত ৫৫-৬০ বছরের মানুষেরা শুনতে পান। এই সময়ে মানুষের শোনার ক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। এই বয়সের মানুষেরা এমন নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দও শুনতে পান যা সাধারণ মানুষ শুনতে পান না।

আশির দশকে নাকি দক্ষিণ আফ্রিকাতে একজন বৃদ্ধ মহিলা ছিলেন যিনি কয়েকশো মাইল দূরে হয়ে যাওয়া ঝড়ের শব্দও শুনতে পেতেন। এই মহিলাও হাম শোনার দাবী করেন।

একটা ব্যাপার পরিষ্কার, হাম শুনতে হলে আপনাকে অবশ্যই তীব্র শ্রবণশক্তির অধিকারী হতে হবে।

২০০৮ সালের দিকে একদল বিজ্ঞানী দাবী করেন যে হাম হয়তো সমুদ্রের ভিতরে বসবাস করা কোন অতিকায় প্রাণীর উৎপন্ন করা শব্দ। সমুদ্রের নীচের বিশাল আকৃতির মাছেরা যৌনমিলনের জন্য বিপরীর লিঙ্গকে আকৃষ্ট করার জন্য এই ধরনের শব্দ  করে থাকে।

তবে এই ধরনের কোন প্রাণী থেকে যদি হাম এসে থাকে তবে সেই প্রাণী আকাশে নীল তিমির চাইতে পঞ্চাশগুণ বড়।

এমন অতিকায় কোন প্রাণী কি আসলেই আছে পানির নিচে? যে নিজের কণ্ঠ দিয়ে সতর্ক করছে ক্ষুদ্র মানবজাতিকে।

২০১৩ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর একজন সদস্য গুলি করে প্রায় সতেরজন মানুষকে হত্যা করে এবং নিজেও আত্মহত্যা করে। পরে পুলিশ তার কম্পিউটারে একটা অদ্ভুত নোট খুঁজে পায়। সেখানে লেখা ছিল, “Ultra low frequency attack is what I’ve been subjected to for the last three months. And to be perfectly honest, that is what has driven me to this.”

এই ব্যাপারটা নিয়েই ঘাঁটতে শুরু করেন কন্সপিরেসি থিওরিস্টরা। তাঁরা বলেন যে মার্কিন সরকার কিছু মানুষের ওপর ইচ্ছাকরে এইধরনের পরীক্ষা করছে আর যার ফলে মানুষ পাগল হয়ে যাচ্ছে।

মার্কিন সেনাবাহিনীতে কিন্তু সেনাদের হুট করে পাগল হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রচুর আছে। সত্যিই কি তবে ব্যাপারটা এমন?

২০১২ সালের দিকে সুইডেনের একদল বিজ্ঞানী দাবী করেন যে শব্দটা পৃথিবীর কোন জায়গা থেকে আসে না, বরং এটা আসে পৃথিবীর বাইরে থেকে।

কিন্তু কোথা থেকে? এই শব্দ কি কোন মহাজাগতিক প্রাণীরা পাঠায়? সেই বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা তবে তাঁরা এটুকুই বলেছেন যে এই শব্দের কম্পাঙ্ক পৃথিবীর কোন শব্দের কম্পাঙ্কের মতো না।

মার্কিন কিছু ধর্মযাজক বলেন যে এটা স্বয়ং নরকের শব্দ! ঈশ্বর এই পৃথিবীতেই পাপীদেরকে ভয় দেখানোর জন্য নাকি নরকের শব্দ শোনান। কিছু ভারতীয় সাধুও মার্কিন ধর্মযাজকের সাথে এই বিষয়ে একমত।

প্রেততত্ববিদ জন কাসুবার মতে, হাম আসে প্রেতলোক থেকে। তার মতে, জীবিত মানুষের জগৎ আর প্রেতলোকের মাঝখানে একটি অদ্ভুত পর্দা রয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই পর্দাই রক্ষা করছে দুই জগতের ভারসাম্য। কিন্তু মাঝে মধ্যেই হুট করে এই পর্দার পেরিয়ে ওই জগতের কিছু শব্দ আমাদের জগতে চলে আসে আর সেগুলোই কিছু মানুষের মানসিক ভারসাম্য হারানোর কারণ হয়!

তবে হামের ব্যাপারে সবচাইতে গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা দেন নিউজিল্যান্ডের একজন প্রফেসর। তিনি গবেষনা করে দেখান যে সমুদ্রের কাছের অঞ্চলগুলোর মানুষেরা হাম সবচাইতে বেশী শোনার দাবী করেছে। সমুদ্রের ঢেউ আর আবহাওয়ার কারণে মাঝে মধ্যেই উদ্ভট কিছু শব্দের সৃষ্টি হয় আর সেগুলোই শুনতে পায় তীব্র শ্রবণক্ষমতা সম্পন্ন মানুষেরা। তীব্র অনুভূতিসম্পন্ন মানুষদের মস্তিষ্ক খুবই স্পর্শকাতর হয় আর সেজন্যই মাঝে মধ্যে এই শব্দগুলো তাদের মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে। বেশীরভাগ বিশেষজ্ঞই তাঁর সাথে এই ব্যাপারে একমত।

কিন্তু এরপরেও হাম নিয়ে জল্পনা কল্পনা কিন্তু কখনো থেমে থাকেনি। এখনো কিছু মানুষ একে অতিপ্রাকৃত শব্দ হিসাবে প্রমাণের জোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

thehum.info হলো হামের ওয়েবসাইট, এখানে গেলেই আপনি হাম নিয়ে নানা পরিসংখ্যান দেখতে পাবেন।

Feature Photo Source: relyonhorror.com

Leave a comment

লুৎফুল কায়সার

মাঝে মধ্যে লেখি আরকি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *