পাকিস্তানের নতুন সরকার ও মদিনা সনদ নীতির ঘোষণা

বিখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার ‘দ্য ক্ল্যাস অব সিভিলাইজেশনস এন্ড দ্য রিমেকিং অব দ্য ওয়াল্ড অর্ডার’ নামক বইতে লিখেছিলেন যে, প্রাচ্যের অনেক রাজনীতিবিদরা পাশ্চাত্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলেও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি গ্রহণ করতে চায় না। শ্রীলংকার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সলমন বন্দরনায়েক পাশ্চাত্যে লেখাপড়া করেছেন এবং শ্রীলংকায় এসে রাজনীতির ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। অনুরূপভাবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যিনি ব্রিটেনে লেখাপড়া করেন এবং পাশ্চাত্য কায়দায় চলাফেরা করতেন, পরবর্তীতে তিনি মুসলিম লীগের নেতৃত্বে আসার পরে পুরোদমে একজন ইসলামিক নেতা হয়ে যান। জনগণের নৈকট্য লাভ করতে আপনাকে অবশ্যই জনগণের সংস্কৃতির সাথে মিশে যেতে হবে। যেহেতু এশিয়ার অধিকাংশ দেশের জনগণের নিকট ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাই রাজনীতিতেও এর প্রভাব দেখা যায়।

স্যামুয়েল পি হান্টিংটন; Photo Source: Wikipedia.org

ইমরান খানও লন্ডনে লেখাপড়া করেছেন। বর্তমানে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি পাকিস্তানকে মদিনা সনদের ভিত্তিতে শাসন করার কথা বলেছেন। পাকিস্তান শাসনের মূলে থাকে মিলিটারির ভূমিকা তাই এই কথাটি তার নাকি পাকিস্তানি মিলিটারিদের প্রভাবে বলেছেন তা সন্দেহের অবকাশ রাখে। তার এ মন্তব্য নিয়ে অনেক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। অনেকে মনে করেন ইমরান খান তার মদিনা সনদের মাধ্যমে পাকিস্তানকে হাজার বছর পিছনে নিয়ে যাবেন। কিন্তু কথা হচ্ছে আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণা হাজার বছর আগে গ্রীক থেকে এসেছে। ইমরান খানের এ মন্তব্য গণতন্ত্র বিরোধী হতে পারেনা। কারণ মদিনা সনদের মাধ্যমে মুসলমানদের পাশাপাশি মদিনার ইহুদিদের রাজনৈতিক অধিকার দেওয়া হয়েছিল। মদিনার সনদ ছিল মানবতার সনদ।


পশ্চিমাদের রাজনৈতিক বিষয়ে অন্য দেশের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করে গণতন্ত্র এবং সেকুল্যারিজমের ভিত্তিতে। এর মধ্য সেকুল্যারিজমে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে আলাদা করতে গিয়ে অথাৎ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি গণতন্ত্রকে ধুলিৎসাত করতে হয় তাহলেও তারা রাজি! যেমনটা দেখা গেছে মোস্তফা কামালের তুরস্ক শাসনের সময়। পাশ্চাত্য রাজনীতি বিশ্লেষকদের নিকট কেমালিজম আজও তৃতীয় বিশ্বের নিকট অনুকরণের বিষয়। ১৯৫৩ সালে আমেরিকা ইরানের গণতান্ত্রিক শাসক মোসাদ্দেককে উৎখাত করেছিল তাদের জাতীয় স্বার্থে।

মোহাম্মদ মোসাদ্দেক; Photo Source: Wikipedia.org

তুরস্কে নাজিমুদ্দিন এরবাকান, ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল হানিয়া, মিসরের মুহাম্মদ মুরসিকে উৎখাত করতে আমেরিকা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভাবে সাহায্য করেছিল। এরা সবাই জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু এরা সবাই এসেছিলেন ধর্মীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত রাজনৈতিক দল থেকে। পাশ্চাত্যের ইসলাম বিদ্বেষের প্রধান কারণ গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি নয় বরং ইসলামিস্টরা ক্ষমতায় গেলে তাদের ভূখণ্ড থেকে সম্পদ পাচার বন্ধ হয়ে যাবে। পাশ্চাত্যের পুজিঁবাদ বিকাশের গতি মন্থর হয়ে যাবে। এজন্য ইমরান খানের মদিনার সনদ নিয়ে অনেকের মাথা ব্যথা। অবশ্যই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে ইমরান খান যেহেতু পুতুল সরকার, তাই তার রাজনৈতিক পরিকল্পনায় (যেমন; পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে) মিলটারির প্রভাব থাকবে। ইমরান খান নির্বাচন পরবর্তী ভাষণে আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেছেন। আফগান সমঝোতার জন্য আমেরিকার নিকট পাকিস্তানের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে আমেরিকার সম্পর্ক তেমন ভালো নয়। এবছর ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানে সামরিক সহায়তার পরিমান কমিয়ে দিয়েছে সাথে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করারও হুমকি দিয়েছিলেন। তাই দেখার বিষয় নতুন পাকিস্তান সরকার তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কি পদক্ষেপ নেন।

মেয়াদ পূরণ করতে পারবেন কি ইমরান খান?

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে একমাত্র আসিফ আলী জারদারি ছাড়া এখন পর্যন্ত কোন প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট মেয়াদ পূরণ করতে পারেরনি।আসিফ আলী জারদারি ২০০৭ সালে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে তার মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন।

আসিফ আলী জারদারি; Photo Source: Pakistantoday.com.pk

পাকিস্তানের অন্যান্য প্রধানমন্ত্রীর শাসনামলে সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী একটি ফ্যাক্ট। ভারত-কাশ্মীর ইস্যুতে তাকে সেনাবাহিনীর নীতি মেনে চলতে হবে। সেনাবাহিনীরর মতের বাইরে গিয়ে কিছু করতে হলে নাওয়াজ শরিফের মত তার ও ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধে নাওয়াজ শরিফ কাশ্মীর থেকে সেনা প্রত্যাহারের ফলে সেনাবাহিনীর প্রধান পারভেজ মোশারফ ক্ষমতা দখল করে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। নির্বাচনের পর ইমরান খান তার পররাষ্ট্র নীতির কথা উল্লেখ করেন। ভারত সম্পর্কে তিনি বলেন;

“আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কাশ্মীর। এই সমস্যা সমাধানের আলোচনা চায় পাকিস্তান। ভারত এক পা এগোলে আমরা তাদের দিকে দুই পা এগিয়ে যাব।”

এরপরও সন্দেহ থেকে যায় তার ক্ষমতা নিয়ে। কারণ  পাকিস্তানের সেনা বাহিনীরা সেখানে অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে।

 

Feature Photo Source: Thehindu.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *