‘রেস কালচার’ ও পরিবহন ধর্মঘট

ইউটিউবে ঘাটাঘাটি করলে পশ্চিমা বেশ কিছু ভিডিও দেখা যায় ‘রোড রেজ’ টাইটেলে। এর অর্থ রাস্তায় যানবাহন বিষয়ক কিছু নিয়ে উন্মাদনা সৃষ্টি করা। অবাক করা বিষয় হলো এসব ভিডিওতে ভিউ প্রায়শই মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়! ব্যপারটা নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় কি পরিমাণ আগ্রহ সেটা ভেবেই অবাক হই।

কারন ঢাকা শহরে মিরপুর রোড কিংবা উত্তরা রোড দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করা একজন ব্যাক্তির জন্য ‘রোড রেজ’ কোনো আগ্রহের বিষয় না, এইটা দৈনন্দিন ঘটনা। বড় সড় কিছু না ঘটে গেলে উৎসুক জনগনও ঠিকঠাকভাবে পাওয়া যায় না এই জাতীয় ঘটনা ‘উপভোগ’ করার জন্য। একটা দেশের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হলে যানবাহন নিয়ে মারামারি ও হাতাহাতি সাধারণ ব্যপার হয়ে উঠে তা ভাবতে পারেন?

সড়ক দুর্ঘটনা যখন সাধারণ ব্যপার তখন এর ভুক্তভোগীরা প্রতিবাদ করতে আসলেও তাদের হতে হয় অন্তত আহত নাহয় কোন এক মুরুব্বি বলে বসেন, “ভাই ক্ষয়ক্ষতি হয়নাই তো, বাদ দেন।” এই বাদ দিতে দিতেই আজ এমন এক পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে গিয়েছে যে ঘর থেকে বের হলে বলা যায় না আবার ফেরা হবে কিনা, কে জানে কোনো সড়ক দুর্ঘটনার স্বীকার হতে হয় কিনা। সড়ক দুর্ঘটনা যখন ভয়, এই ভয়ের সবচেয়ে বড় কারন বাস। লোকাল থেকে শুরু করে ‘কোচ’, সবই যেনো আতংকের নাম। গতকালের ঘটনা। ফ্লাইওভার থেকে দুই বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়, কে কাকে ওভারটেক করে আগে যেতে পারে। এ যেনো এক ‘রেস কালচার’, আমাদের নিম্ন শ্রেণীর এই চালকেরা যারা নেশায় মগ্ন হয়ে উঠেছে। এই প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ঘটে ফ্লাইওভার থেকে নেমে তিনজন শিক্ষার্থীকে রাস্তার সাথে পিশে ফেলার মাধ্যমে। দুইজন ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং অন্যজন নিজের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন হাসপাতালে। কিছুদিন আগে হানিফ পরিবহনের এসি বাসের একটা খবর দেখে একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। জ্যামে অনেকখন আটকে থাকায় চট্টগ্রাম রুটের এই বাস থেকে রাস্তায় নামেন প্রাইভেট ভার্সিটির ছাত্র পায়েল প্রস্রাব করার জন্য। উঠার সময় বাসের দরজার সাথে আঘাত পেয়ে গুরুতর আহত হন তিনি এবং তার প্রচন্ড রক্তপাত ঘটে। এই দুর্ঘটনা ধামাচাপা দিতে যেয়ে তরুন ছেলেটিকে বাস ড্রাইভার ও ম্যানেজার মিলে নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয়! একজন কসাইও সম্ভবত এত নির্দয় ভাবে কোন প্রাণীকে খুন করে না!

রাজিব হত্যার ঘটনা তো ভুলার কথা নয়, সেদিনের কথা৷ দুই বাসের মাঝে চাপা পড়ে সম্ভাবনাময় এক জীবনের সমাপ্তি ঘটে৷ অনেকে অনেক আশার বাণী শোনালেও শুনেছি বাস কর্তৃপক্ষ থেকে নাকি তার পরিবার প্রাপ্য টাকাটা পর্যন্ত পায়নি। প্রতিদিন, প্রতিটা দিন সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ না কেউ আহত হচ্ছেন কিংবা নিহত হচ্ছেন। তাও বেপরোয়া বাস চালকদের থামানো যাচ্ছে না। একটু তাড়াহুড়া করাটা তারা ছাড়তে নারাজ সামান্য সময় বাচানোর জন্য কিংবা কথিত ‘দ্রুত গতির চালক’ খ্যাতি হারানোর ভয়ে, বিনিময়ে প্রাণ গেলেও তাদের যেনো কিছু যায় আসে না। আর তাদের এসব নির্দয়তার বিরুদ্ধে কথা বললে, আইনের সাহায্য নিলে তারা যেনো হয়ে উঠে আরো ভয়ংকর। কথায় কথায় গাড়ি বন্ধ করে দিয়ে কিংবা পরিবহন ধর্মঘট ডেকে তারা কি প্রমাণ করতে চায় তা তারাই জানে। সম্ভবত তারা এইটাই জাহির করতে চায় যে সবাই তাদের কাছে কিভাবে জিম্মি। একেকজন যেনো এইসব ধর্মঘট দিয়ে দেখাতে চায় যে তারা কত বড় বিপ্লবের প্রতীক। গণতন্ত্রও বড্ড অদ্ভুত জিনিশ যা কিনা এইধরনের খুনিদের দেয় বিপ্লবীর মর্যাদা।

Feature Photo Source: Dnaindia.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *