দ্যা ফেসবুক জেনারেশন

একটা কথা সবসময় চারিদিকে শোনা যায়। আমরা নাকি ‘ফেসবুক জেনারেশন’। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাফালাফি করে নিজেকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করলেও ভেতরে ভেতরে আমরা নাকি একেকজন ‘জিরো’! ভার্চুয়াল জগৎের চাকচিক্যের আড়ালে আমরা নাকি একেকজন ‘রিয়েল লাইফ ল্যুজার’! সেই লুজার, যার বাস্তব জীবনে কোন অবদান নেই।

এমন ধারনা শুধু দুই একজনের নয়, গড়পড়তা সকল মুরব্বিদেরই! এমনকি, সদ্য ভার্সিটি থেকে পাশ করে বের হওয়া কিংবা তার শেষ দিকে থাকা বড় ভাইরাও এমনটা মনে করেন৷

অথচ এই ‘ফেসবুক জেনারেশন’ যেন সকলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো তারা কি! নিজের ভাই বোনের রক্তে রাঙানো রাজপথ আটকে দিয়ে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে মাঠে নেমে, সড়ক ব্যবস্থার সকল ক্রুটি সবার সামনে এনে দেখালো তারা। এই সমস্যাগুলো সকলেরই জানা থাকলেও কেউ কিন্তু এসব নিয়ে ভাবতে রাজি না! কিন্তু রাজি না থাকলেই হবে? তারা বাধ্য করলো সবাইকে ভাবাতে!

গায়ে স্কুল কিংবা কলেজের শার্ট, কাঁধে বই খাতার ব্যাগ, পকেটে আইডি কার্ড নিয়ে ঢাকার সকল জরুরী রাস্তা আটকে ফেললো। লোকাল বাস থেকে শুরু করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহন কিংবা মন্ত্রীর গাড়ীর কাগজ পত্র-লাইসেন্স বের করে দেখলো এবং সবাইকে দেখালো যে আমাদের আইন শেখানো লোকেরাই কিভাবে আইনবহির্ভূত ভাবে রাস্তায় চলাফেরা করে।

সরকারী কর্মকর্তাদের গাড়িকে আটকে দেওয়া হয়েছে; Photo Source: Facebook

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গাড়ি পরিচয় দিয়ে, “যা করতে পারিস কর” বলে হুমকি দেওয়া বেআইনি গাড়ি চালককেও নিজের সঠিক অবস্থান চিনিয়ে দিয়েছে আন্দোলরত শিক্ষার্থীরা। ঝিগাতলা থেকে সাইন্স ল্যাব যাওয়ার যে রাস্তায় তিন-চার কিংবা অনেক সময় পাঁচ লেইনে রিকশা যাওয়া সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিলো সেই রাস্তাও কিভাবে এক লেইনে আনা যায় তা দেখিয়ে দিলো নিউ জেনারেশনের সালাম, রফিক, জব্বার’রা।

ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে রিক্সার এক লেইন; Photo Source: Facebook

শুধু কড়াকড়িই নয়, আন্তরিকতা দিয়েও সবার মন জয় করে নেওয়াতেও যেনো তাদের সাথে কেউ পেরে উঠে না। ভাঙা কাঁচ নিজ হাতে ঝাড় দেওয়া কিংবা এম্বুলেন্সের জন্য রাস্তা ছেড়ে দেওয়া সবই ছিলো চোখে লাগার মতন৷ গর্ভবতী এক মাকেও এমন পরিস্থিতেও তারা নিজ হাতে, আন্দোলন ফেলে রেখে বের করে এনেছিলো কয়েক ঘন্টার চেষ্টায় যা নিয়ে সে মা নিজেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যে সন্তানদের জন্য মায়ের মনে কৃতজ্ঞতা কাজ করে তাকে ঠেকায় কোনজন?

রাস্তায় পড়ে থাকা বাসের ভাঙ্গা গ্লাস পরিষ্কার করছে ছাত্ররা; Photo Source: Facebook

তাও অনেকে বলবেন এইভাবে রাস্তা আটকানো কোনো সমাধান না, দৈনন্দিন জীবনে বাঁধা দেওয়া যুক্তিসঙ্গত না, জনদুর্ভোগ তৈরি করার কোনো মানে হয় না!

কিন্তু রাস্তা মেরামতের নাম করে যে শহরের যাতায়াতে প্রতিদিন ব্যাঘাত ঘটে, সেখানে রাষ্ট্র মেরামতের জন্য কি কয়েকটা দিন একটু কষ্ট করা যায় না? আজ আমরা রাস্তায় না নামলে কে সড়ক ব্যবস্থার এই করুন অবস্থা সবার সামনে তুলে ধরতো? কার বুকে এত সাহস হতো পুলিশকে দাড় করিয়ে লাইসেন্স চেক করার? একজন পুলিশকে দিয়ে আরেকজন পুলিশকে মামলা দেওয়ার? কে পারতো মন্ত্রীর গাড়িকে উলটো পথে আটকে সোজা পথে পাঠাতে?

আমাদের আগের কোনো জেনারেশন স্কুল-কলেজ এর ইউনিফর্ম গায়ে যা করতে পারেনি তা এই জেনারেশন করে দেখিয়েছে। শুধুমাত্র স্কুল-কলেজের ছাত্ররা মিলেই আন্দোলনের নামে দেখিয়ে দিয়েছে তারা কি পারে! তারা সকল বাস চালকদের বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের ভাই বোনের ক্ষতি হলো তারা কিভাবে হামলে পড়তে পারে! তারা আইনের লোকদের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে আইন বহির্ভূতভাবে তারাও চলাচল করতে পারবে না। তারা নেতাদের শিখিয়েছে উলটো পথে এলে কিভাবে সোজা পথে পাঠাতে হয়। এই ‘ফেসবুক জেনারেশন’ সেটাই করে দেখিয়েছে যেটা আগের কোনো জেনারেশন করে দেখাতে পারেনি।

 

Feature Photo Source: Facebook.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *