প্রাণ রক্ষাকারী এন্টিবায়োটিক যখন মানবজাতির ধ্বংসের কারন

এইচ জি ওয়েলস এর লেখা  “ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস” সায়েন্স ফিকশন টি যা ছাপা হয়েছিল আজ থেকে একশ বিশ বছর পূর্বে অন্য এক গ্রহ থেকে আশা আমাদের পৃথিবীকে আক্রমণকারী এক প্রজাতির সাথে যুদ্ধের পটভূমি তে যেখানে অন্য গ্রহ থেকে আগত জীবরা পরাজিত হয়েছিল ব্যাকটেরিয়া নামক এক ছোট্ট অনুজীবের কাছে।

Photo Source: GQ.com

কিছুদিন আগে আমেরিকাতে এক টিসি.আর. ই . কেস পাওয়া গিয়েছিল এবং তা নিয়ে জাতীয়ভাবে ব্যাপক শোরগোল হয়েছিল। ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী। সুপারবাগ এসে গেছে, মহামারী থেকে রক্ষা নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি !!!!!

এবং বিজ্ঞানীরা আমাদের জানান দেয় যে এইচ. জি. ওয়েলসের লেখা “ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস” এর সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি খুব শীঘ্রই ঘটতে চলেছে এবং এর শিকার হতে চলেছে মানব সভ্যতা।

কিন্তু আমারা কি জানি এই সুপারবাগ কি? কিভাবেই বা হয়েছিল এর উৎপত্তি ?

জানার জন্য চলে যেতে হবে সুদূর অতীতে যখন ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশান হলে চিকিৎসার অভাবে মরতে হত মানুষকে, মহামারীতে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যাওয়া সেই মধ্যযুগে।

বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং।
Photo Source: Bigganjatra.com

এমনি এক সময় আলেকজান্ডার ফ্লেমিং গবেষণার জন্য ব্যাকটেরিয়া চাষ করছিল। হঠাৎ তার বন্ধুর জরুরি টেলিগ্রাম আসে। চাষবাস সেভাবেই ফেলে রেখে ছুটে যায় বন্ধুর কাছে। কিছুদিন পরে ফিরে এসে দেখতে পান খাঁ খাঁ করছে তার চাষের জমি, বাড়েনি একটি ব্যাকটেরিয়াও বরং যে বীজ ব্যাকটেরিয়া তিনি বুনেছিলেন তাও সাফ হয়ে গেছে। কারন খুঁজতে মাইক্রোস্কোপে চোখ লাগান তিনি। দেখলেন চাষের জায়গায় জন্মেছে এক ধরনের ছত্রাক যা কিনা তার ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি রোধ এবং ধবংসের কারণ। এর নাম তিনি দিলেন এন্টিবায়োটিক। তার এই দুর্ঘটনার ফলে হওয়া আবিষ্কারই তাকে বানিয়ে দিল ইতিহাসের নায়ক।

কারণ তার এই আবিষ্কার বদলে দিল মানবসভ্যতার ইতিহাসকে। চল্লিশের দশকে যেখানে মানুষের গড় আয়ু ছিল ত্রিশের কোটায় এন্টিবায়োটিক তাকে মাত্র অর্ধ শতাব্দের মধ্যে বাড়িয়ে দিল দ্বিগুনেরও বেশি। পৃথিবীর বুকে মানব সভ্যতার টিকে থাকার জন্য এটি একটি আশাবাদী কারন হলেও দুঃখের কথা এই যে সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিন আবিষ্কারের মাত্র ৪০ বছরের মধ্যেই প্রায় সকল ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে গেছে।

কিন্তু কেন ?

ব্যাক্টেরিয়ার শরীরে প্লাজমিড নামক একধরনের কোষীয় উপাদান থাকে যা দিয়ে তারা বিভিন্ন প্রোটিন তৈরী করতে পারে এবং এন্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। আমাদের আবিষ্কৃত এন্টিবায়োটিকের আগেও প্রকৃতিতে ছত্রাকের এন্টিবায়োটিক ছিল কিন্তু ব্যাক্টেরিয়া তার সাথে কম পরিচিত ছিল তাই প্রতিরোধও গড়ত খুব ধীরে। এরপর মানুষ যখন এন্টিবায়োটিক ব্যাবহার শুরু করল ব্যপকহারে, তখন ব্যাকটেরিয়াগুলি এই নতুন অনুর সাথে পরিচিত হল অনেক বেশি এবং প্রতিরোধও গড়ে তুলল অনেক দ্রুত। যার ফলে ব্যাক্টেরিয়া প্রথমে প্রতিরোধ গড়ে তোলে পেনিসিলনের বিরুদ্ধে এর পর মানুষ একের পর এক এন্টিবায়োটিক তৈরী করল এবং ব্যাক্টেরিয়া হয়ে উঠল আরও শক্তিশালী এবং দ্রুততম। এভাবে শক্তিশালী হতে হতে একপর্যায়ে তারা হয়ে উঠল এক একটি সুপারবাগ (যার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোন এন্টিবায়োটিকই কার্যকর না )।

Photo Source: Three21wellness.org

সবথেকে ভয়ংকর কথা হল গত ত্রিশ বছরের মধ্যে নতুন কোন এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার কর সম্ভব হয়নি।

এখন কথা হচ্ছে আমরা সে যত ভালই এন্টিবায়োটিকই আবিষ্কার করিনা কেন ব্যাক্টেরিয়া একসময় না একসময় তাদের বিবর্তনে ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেই। সেকারনেই এখন বিশ্বের অনেক স্থানেই এন্টিবায়োটিকের বিকল্প উপায় উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা চলছে। কিন্তু সেই গবেষণার সাফল্যের পূর্ব পর্যন্ত আমরা যেটা করতে পারি তাহল এন্টিবায়োটিকের সচেতন ও সঠিক ব্যাবহার।

তথ্যসূত্রঃ 
১) bbc.com/news/health-30416844
২) Food and Drug Administration (2010) CVM Updates – CVM Reports on Antimicrobials Sold or Distributed for Food-Producing Animals(Food Drug Admin, Silver Spring. MD).
Feature Photo Source: News.mit.edu

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *