রুবিক্স কিউবের কথকতা

রুবিক কিউব নিয়ে মাথা খাটাননি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। একবার এর নেশায় পড়ে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাবে এটা সমাধান করতে। আমার মনে আছে, প্রথম রুবিক কিউব দেখেছিলাম আমার এক বন্ধুর কাছে। হাতে নেওয়ার আগে ভেবেছিলাম কাজটা হয়তো খুব একটা কঠিন না। আর এই মনে করাটা যে ঠিক ছিল না সেটার মাশুল দিয়েছিলাম তিন সপ্তাহের অবিরাম খাটুনী দিয়ে। নাওয়া-খাওয়া প্রায় ভোলার মত। তবুও পারিনি। অগত্যা সেই বন্ধুর দ্বারস্থ হলাম। আমি বাজি ধরে বলতে পারি রুবিক কিউব নিয়ে অধিকাংশের অভিজ্ঞতাই আমার মত। যাক সে কথা।

মগজ ধোলাই করা এ ঘনকটি বাজারে আসে ১৯৮০ সালে। আর তারপরই হয়ে যায় বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল বিক্রিত খেলনা!

একটি ৩×৩×৩ মাত্রার ঘনকাকৃতির কিউবের ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন রঙের তল আছে। সাধারণত লালের উল্টো দিকে কমলা, নীলের উল্টো দিকে সবুজ, আর সাদার উল্টো দিকে হলুদ। শুরুতে ছয় দিকের সব বর্গের রং এক থাকে। কেন্দ্রের ছয়টি ঘনককে ঠিক রেখে বাকিগুলো এলোমেলো করে দেওয়া হয়। কাজটা হল আবার এটিকে আগের মত মেলানো। সহজ, তাই না?

যেভাবে এলো-

আরনো রুবিক নামে জনৈক হাঙ্গেরীয়ান ভাস্কর ও স্থাপত্যবিদ্যার অধ্যাপক এই যান্ত্রিক ধাঁধাটি তৈরী করেন। নাম দেন ‘ম্যাজিক কিউব’। আশির দশকের একদম শুরুতে অর্থাৎ ১৯৮০ সালে একটি জার্মান খেলনা প্রস্তুতকারী কোম্পানি এটি বাজারে আনে। উদ্ভাবকের নামানুসারে এটার নাম দেয় রুবিকের কিউব, সংক্ষেপে রুবিক কিউব। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ কোটি কিউব বিক্রি হয়েছে।

ধাঁধার রকমফের-

শুরুতে ৩×৩×৩ ঘনক হলেও এখন মোট চার ধরনের কিউব পাওয়া যায়। পকেট কিউব (২×২×২), রুবিক কিউব(৩×৩×৩), রুবিক রিভেঞ্চ(৪×৪×৪) এবং প্রফেসর’স কিউব (৫×৫×৫)। অবশ্য কিছুদিন আগে এক গণিতবিদ ১১×১১×১১ মাত্রার কিউব বানানোর আইডিয়া পেটেন্ট করেছেন।

Photo Source: Pixabay.com

বিনোদন ছাড়িয়ে সংস্কৃতিতে-

১৯৮০ সালে এটি সেরা খেলনার খেতাব পাওয়ার পর ১৯৮৩-৮৪ সালে মার্কিন টেলিভিশন কোম্পানি এবিসি প্রতিদিন এর ওপর অনুষ্ঠান প্রচার করত। ১৯৮০ সালে ব্যারন নাইটস ‘মি. রুবিক’ নামে একটা গানই লিখে ফেলেন। ব্যাপারটা শুধু গানেই থেমে থাকেনি। রুবিক কিউব জায়গা পেয়েছে সিনেমাতেও! The Persuit of Happiness- এ উইল স্মিথ ট্যাক্সি চালাতে চালাতে এটি সমাধান করেন। পুরস্কারস্বরুপ আরোহীর কাছ থেকে চাকরি পান। আবার The Wedding Singer মুভিতে ক্রিস্টিন টেলর শেষ পর্যন্ত সমাধানে ব্যর্থ হলেও Dude, Where’s My Car- এর নায়িকা অবশ্য সিনেমার শেষ পর্যায়ে এসে এটির সমাধান করতে সক্ষম হন। এমনকি বাংলাদেশের তরুণদের রুবিক কিউব বিজয়ের কাহিনী দেখানোর জন্য আশির দশকে বিটিভিতে শফিক রেহমানের উপস্থাপনায় একটি ম্যাগাজিনও প্রচারিত হয়েছিল।

মেকানিজম-

একটি সাধারণ কিউবের প্রতিটি তলের দৈর্ঘ্য সাধারণত সোয়া দুই ইঞ্চি (৫.৭ সেমি) হয়ে থাকে। সর্বমোট ২৬ টি ছোট ঘনক ধাঁধাটিতে থাকে। তবে কেন্দ্রের ঘনকটি ব্যতিক্রম। ছয় দিকে ছয়টি বর্গাকার ফেসলেট রয়েছে যেগুলো কেন্দ্রের সাথে সংযুক্ত। আর কেন্দ্রীয় ঘনকটি এমনভাবে বসানো হয়েছে যাতে অন্য ঘনকগুলো বসানো যায়। মেকানিজমটা এমন যে ঘনকগুলোকে নানাভাবে ঘোরানো যায়। কিউবটিকে ভাঙলে পাওয়া যাবে ২১টি টুকরো। এর মধ্যে কেন্দ্রেরটিতে তিন অক্ষের দুই মাথায় বর্গাকৃতি ফেসলেট। আর বাকি ২০টি টুকরো এই কাঠামোতে বসে।

এই ২০ টুকরো মূলত দুই প্রকার। ১২ টি মাঝের টুকরোর প্রত্যেকটির দুই দিকে দুটি ফেসপ্লেটে দুই রং। এখানে একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হল যে এই টুকরোগুলোতে কখনই পরস্পরের বিপরীত দিকের রং দেখা যাবে না। কেন্দ্রেরটিকে ঘিরে ঘোরার সময় এগুলো শুধু নিজেদের মধ্যে অবস্থান বিনিময় করতে পারে।

বাকি আটটি কোণার টুকরো। এগুলোর প্রতিটিতে তিন দিকে তিন রঙের বর্গাকৃতি টুকরো রয়েছে। এ আটটি টুকরো কেবল কোণার জায়গাগুলো দখল করতে পারে।

Photo Source: Shutterstock.com

সমাধান-

অনেকভাবেই সমাধান করা যায়। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো লেয়ার বাই লেয়ার পদ্ধতি। প্রথমে সবার ওপরের স্তর মেলাতে হবে। সেইসাথে প্রতিটি কোণা ও মাঝের টুকরো এমনভাবে মেলাতে হবে যেন প্রথম স্তরটি সম্পূর্ণ হয়। এরপর দ্বিতীয় স্তর মেলানোর সময় কেবল মাঝের টুকরোগুলো সাজাতে হবে। সর্বশেষ নিচের স্তর মেলাতে হবে। এক্ষেত্রে নিচের চারটি কোণা আগে মেলাতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন এটা করার সময় আগের দুই স্তরের কোনো ক্ষতি না হয়। কোণা মেলানোর পর মাঝেরগুলো মেলাতে হবে। এক্ষেত্রে বেস পরিবর্তন করলে সুবিধা হয়। প্রথমদিকে একটু সময় বেশি লাগলেও একবার আয়ত্তে এলে অল্প সময়েই সমাধান করা যায়।

আরেকটি পদ্ধতি হলো ‘কর্ণার ফাস্ট’ বা ‘কোণা আগে’ পদ্ধতি। এতে প্রথমে আটটি কোণার টুকরো ঠিক করা হয়। তারপর মাঝেরগুলো ঠিক করা হয়।

এছাড়াও স্পিডকিউবিং অ্যালগরিদমের সাহায্যেও দ্রুত সমাধান করা যায়।

শেষ কথা-

আবির্ভাবের পর থেকে সারা বিশ্বে রুবিক কিউবের অনেক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে, হচ্ছে। ১৯৮২ সালের ৫ই জুন বুদাপেস্টে প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন করা হয়। এরও আগে ১৯৮১ সালের ৩১শে মার্চ প্রথম বিশ্ব প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় জার্মানির মিউনিখে। ২০০৩ সাল থেকে সেরা সময় ও সেরা গড় সময় দুটোই রেকর্ড করা হয়। পাঁঁচবার প্রতিযোগিতার মধ্যে নেওয়া হয় সেরা তিন সময়ের গড়। বিশ্ব কিউব অ্যাসোসিয়েশন এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।

এখন পর্যন্ত সেরা গড় সময়ের মালিক দক্ষিণ কোরিয়ার ইউজিং-মিন। সময় ১১.৭৬ সেকেন্ড! এটা ২০১০ সালের ৭ জানুয়ারির কথা। আর ২০০৯ সালের ৫ মে স্পেনিশ ওপেন টুর্নামেন্টে এযাবতকালের সেরা সময় রেকর্ড করা হয়। এই রেকর্ড করেছেন থিবু জ্যাফুনট। সময় লেগেছে মাত্র ৯.৮৬ সেকেন্ড! ভাবা যায়? হুম, নিশ্চই ভাবা যায়। আর এই রেকর্ডে ভাগ বসাতে পারেন আপনিও। তাহলে আর দেরি কেন? চলুন, লেগে পড়ুন।

 

Feature photo source: Pixabay.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *