তুমিই জয়ী হবে

আট বছর বয়স থেকেই মঞ্চ মাতানো শুরু। ফাইভ ব্যান্ডদলের সর্ব কনিষ্ঠ সদ্যসটি এ সময় পরিচিতি পান নিজের নামেই। শুধু গান নয়, নাচ, ফ্যাশন– সবকিছুতেই মাইকেল জ্যাকসন (১৯৫৮- ২০০৯) ছিলেন অনবদ্য। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে দিয়েছে সর্বকালের সেরা খেতাব। পেয়েছেন কিং অব পপ উপাধিও। পাশাপাশি কাজ করে গেছেন সারা বিশ্বের সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য। ১৯৯২ সালে ‘হিল দ্যা ওয়ার্ল্ড’ ফাউন্ডেশন গড়েছেন এ কাজের জন্য। ২০০১ সালের ৬ই মার্চ, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ‘হিল দ্যা কিডস’ উদ্যোগটি পরিচিত করার জন্য বক্তব্য দিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, “এখানে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমার কী কী যোগ্যতা আছে- সে কথা বলেই শুরু করা উচিত। বন্ধুরা, আমার আগে এখানে যাঁরা বলে গেছেন, তাঁদের মত পড়াশুনা আমার নেই। ঠিক তেমন আমার মতো ‘মুনওয়াক’ করার ক্ষমতা তাঁদের নেই। তবে একটা দাবি আমি করতেই পারি, বেশির ভাগ মানুষের তুলনায় দুনিয়াটা আমার অনেক বেশি দেখা হয়েছে। শুধু কাগজ আর কালিতে তো ধরা যায় না মানুষের জ্ঞান। হৃদয়ে যে কথা লেখা হয়ে থাকে, আত্নায় যা গেঁথে যায়, শরীরে যা খোঁদাই হয়ে যায়, সেসব মিলিয়েই তৈরী হয় মানুষের জ্ঞান। আর এই জীবনে আমি যত কিছুর মুখোমুখি হয়েছি, তাতে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আমার বয়স ৪২! অনেক সময় আমার মনে হয় বয়স বোধ হয় ৮০ ছাড়িয়ে গেছে।

আমার অর্জনগুলো দিয়ে কিন্তু আমার ভেতরের মানুষটাকে চেনা যাবে না। ভক্তদের সামনে রবিন, রকিন বা বেন গাইতে থাকা পাঁচ বছরের শিশুটি আর তার হাসির আড়ালে থাকা শিশুটি এক নয়। আমি পাঁচ বছর বয়স থেকেই গান গাইছি, নাচছি। কাজটা আমার জন্য খুব আনন্দেরও। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম গাছ-বাড়ী বানিয়ে, লুকোচুরি খেলে আমার শৈশবটা কাটাতে। আমার আশপাশের শিশুদের এমন জীবন দেখে হিংসা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না আমার। আমার কোনো শৈশব নেই- এই বোধটাই আমাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।

আমি এসব তোমাদের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য বলছি না। আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বোঝানোর জন্যই বলছি। আজ শুধু হলিউডের শিশুরাই নয়, সারা বিশ্বেই শিশুরা ভুগছে এই বেদনায়, শৈশব না থাকার কষ্টে। এখন শিশুদের ক্রমাগত চাপ দেওয়া হচ্ছে তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠার জন্য। যেন শৈশব খুব কষ্টের সময়। এটাকে তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যেতে হবে। আর এর ফলেই শিশুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে মা-বাবা থেকে।

Photo Source: Kidcasters.com

এই বিচ্ছিন্নতা থেকেই যেন জন্ম নিয়েছে এক নতুন প্রজন্মের। আমি সেই প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি। আমাদের বাইরের দিকটা চকচকে- টাকা-পয়সা, দামি কাপড়চোপড়, বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি এসবেই আচ্ছাদিত। কিন্তু ভেতরটা ফাঁকা। এটা শুধু আমাদেরই যন্ত্রণা নয় আমাদের মা-বাবাও।

আজ আমি শিশুদের অধিকারের কথা বলতে চাই। প্রতিটি বাড়ীতে প্রতিটি শিশুর এই অধিকার থাকবে;

১) ভালবাসা পাওয়া।

২) সুরক্ষা পাওয়া।

৩) মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হওয়া। হয়ত সে কিছুই করতে পারেনি, তবুও সে মূল্যবান।

৪) শিশুর সব কথা মন দিয়ে শোনা- তা খুব উপভোগ্য না হলেও।

৫) ঘুমোতে যাওয়ার আগে অন্তত একটা গল্প শোনতে পাওয়া- সন্ধ্যার খবর বা টিভি সিরিয়ালের সময়টা যাতে এজন্য বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

৬) স্নেহ পাওয়া- হয়ত মা ছাড়া আর কারো কাছেই শিশুটি সুন্দর নয়, তবুও।

বন্ধুরা, আমাদের সব জ্ঞানের, বোধের শুরুটা হোক এভাবে- আমরা জানি আমাদের কেউ না কেউ ভালোবাসে।

প্রায় ১২ বছর আগের কথা। আমার ব্যড ট্যুরের আগে ছোট্ট একটি ছেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। সে আমাকে, আমার গান কত ভালোবাসে তা বলল। ছেলেটি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল। তার মা-বাবার কাছ থেকে জানলাম, যে কোনো দিন সে মারা যেতে পারে। আমি ছেলেটাকে বললাম, ‘তিন মাসের মধ্যে আমি তোমার শহরে গান গাইতে আসবো। তোমাকে আমার এই জ্যাকেটা দিলাম। এটা পরেই কিন্তু তুমি আমার গান শুন্তে আসবে।’ ছেলাটিকে আমার মূল্যবান পাথর বসানো দস্তানাও দিয়েছিলাম। সাধারণত কাউকে আমার দস্তানা দিই না। পরে শিশুটির শহরে গিয়ে শুনি সে মারা গেছে। তার সমাধিতে দেওয়া হয়েছে আমার সেই জ্যাকেট আর দস্তানা। তার বয়স ছিল মাত্র ১০। আমি নিশ্চিত, মৃত্যুর সময় সে কোনো হতাশায় ভুগে নি। কিন্তু একটাই শান্তনা, সে জেনে গিয়েছিল তাকে কেউ ভালোবাসে। তার মা-বাবা শুধু নন, আমার মতো সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষও তাকে ভালোবাসে। সে জেনে গিয়েছিল, এই পৃথিবী থেকে সে একা বিদায় নিচ্ছে না।

পৃথিবীতে আসার আগে আর পৃথিবী ছাড়ার সময় তুমি যদি জানতে পার, কেউ তোমাকে ভালোবাসে, তাহলে যেকোনো পরিস্থিতিই খুব সহজ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষকেরা তোমাকে তিরস্কার করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমিই জয়ী হবে। কীভাবে কেউ ইওমাকে আটকাবে! তোমার তো ভালোবাসার শক্তি আছে।

Photo Source: Pexels.com

কিন্তু যদি এই শক্তিটা তোমার না থাকে, গোটা জীবন চলে যাবে তাঁর খোঁজে। যত বিখ্যাতই হও, যত ধনীই হও, ভেতরটা তোমার ফাঁকাই রয়ে যাবে। কোথা থেকে আমাদের মধ্যে এত ক্রোধ, বেদনা আর সহিংসতা আসে! উত্তরটা আর খুঁজে বেড়াতে হবে না।

কাজ শেষে মা-বাবারা বাড়িতে ফেরেন। কিন্তু অনেকেই মাথাটা রেখে আসেন অফিসে। আর তাঁদের শিশুরা পায় মা-বাবার ছিটেফোঁটা মনোযোগ। তাদের মধ্যে ভালোবাসা পাওয়ার ইচ্ছেটাই মরে যায়। নিজের মত করে বেড়ে ওঠে তারা। পেছনে ফেলে যায় মা-বাবাকে।

আমি তোমাদের অনুরোধ করব, এমন ভুল তোমরা কেউ করো না। যদি ভাবো, মা-বাবা তোমাদের অবহেলা করছেন, তাঁদের ক্ষমা করে দাও। তাঁদের শেখাও, কীভাবে ভালোবাসতে হয়।

আমার বাবা একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক ছিলেন। আমি ও আমার ভাইয়েরা জীবনে সফলতার জন্য তাঁর কাছে ঋণী। তিনি কোনোদিন আমার সঙ্গে খেলেন নি। আমার চোখে চোখ রেখে বলেননি আমাকে তিনি কতটা ভালোবাসেন। আমি মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসতাম। কিছুদিন পরপরই সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম রান্নাঘরে আমার জন্য এক ব্যাগ ডোনাট রাখা আছে। আমার বাবা কোনোদিন আম্মাকে সেটা বলেননি। কত দিন ভেবেছি, রাতে জেগে থাকব আর তাঁকে ডোনাট রাখার সময় ধরে ফেলব। কিন্তু আমি এই মজার খেলাটা নষ্ট করতে পারিনি এই ভয়ে, তিনি হয়ত আর কোনোদিন আমার জন্য ডোনাট আনবেন না।

তিনি আমার জন্য কী করেননি, সেসব নিয়ে আমি আর ভাবি না। তিনি করেছেন, সেটাই ভাবি।

বাবা খুব দরিদ্র পরিবারে বড় হয়েছেন। আমাদের বড় পরিবার চালাতে হতো তাঁকে। ইস্পাত কারখানায় কাজ করতেন তিনি। এমন কাজ, যা আস্তে আস্তে অনুভূতিগুলো ভোঁতা করে দেয়। তিনি যে আমাদের সফল হওয়ার জন্য এত চাপ দিতেন, এটা খুব আশ্চর্যের? তাঁর শাসনটাকে আজ আমি ভালোবাসা হিসেবেই দেখি। সেই ভালোবাসা নিঁখুত নয়, কিন্তু ভালোবাসা তো! তিনি চাইতেন কেউ যেন তাঁর সন্তানদের ছোট করতে না পারে। আজ আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আমার শুরুর দিকের রাগের অনুভূতিটা এখন ক্ষমায় পরিণত হয়েছে।

এক দশক আগে গড়ে তুলেছিলাম দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিল দ্যা ওয়াল্ড’। আমি এর সাফল্যে বিশ্বাস করি? আমি কি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীটার ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারব? নিশ্চয়ই করি। না করলে আজ আমি এখানে আসতাম না। কিন্তু এর শুরুটা হতে হবে ক্ষমা দিয়ে। কারণ পৃথিবীর ক্ষত সারিয়ে তোলার আগে নিজের ক্ষত শুকাতে হবে। আজ আমি বুঝি, আমি কখনই পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠতে পারব না, যদি না আমার শৈশবের  ক্ষতগুলোর কথা ভুলে যাই। তাই তোমাদের বলছি, মা- বাবাকে সম্মান করো। তাঁদের কাজের বিচার করতে যেয়ো না। তাঁদের সুযোগ দাও।

ক্রোধ, হতাশা আর অবিশ্বস্ত এই পৃথিবীতেই আমাদের বাঁচতে হবে। বাঁচতে হবে ভালোবাসা, স্বপ্ন আর বিশ্বাস নিয়ে। যারা মনে করো তোমাদের মা-বাবা তোমাদের যথেষ্ট ভালোবাসেন না, তোমরা তাঁদের দিকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দাও। শর্তহীন ভালোবাসা দাও তাঁদের, যাতে তাঁরা নিজের সন্তানের কাছ থেকেই শিখতে পারেন কীভাবে ভালোবাসতে হয়। মহাত্না গান্ধী বলেছিলেন,

“দুর্বল কখনোও ক্ষমা করতে পারে না। আজ তাই তোমরা শক্ত হও। শৈশবের ক্ষতের যা প্রভাব আজকের জীবনে পড়েছে, তা কাটিয়ে ওঠো।”

আজ থেকে শোনা যাক এক নতুন সঙ্গীত। যে সঙ্গীত শিশুদের হাসির। চলো সবাই মিলে সারিয়ে তুলি এই পৃথিবীর যত ক্ষত, বেদনা। সবাই সুখী হও।

তথ্যসূত্র- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মাইকেল জ্যাকসনের দেওয়া ভাষণ

 

Feature Photo Source:Littlewritingfactory.wordpress.com

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *