শাষক হিসেবে সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবীর উত্থানের ইতিহাস

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সময়, চার খলিফার শাষণামল, তাবে-তাবেঈনদের যুগের পর যে কয়জন বীর মুসলিম শাষক বা সেনার নাম শোনা যায় তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সু্লতান সালাহুদ্দীন আল আইয়ুবী। একই সময় তিনটি খিলাফত থাকা সত্বেও ইতিহাসের পাতায় শুধু্মাত্র সালাহুদ্দীন আল আইয়ুবীই জায়গা করে নিয়েছে। সালাহুদ্দীন আল আইয়ুবী মুসলমানদের কাছে একজন বীর ও ঈমানদার শাষক হিসেবে স্মরণীয় কেননা তিনি অত্যাচারী ক্রুসেডারদের হাত থেকে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রভূমি আল কুদস পু্নর্দখল করেছিলেন।

আমরা শুধু্মাত্র সু্লতান সালাহুদ্দীনের আল কুদস বিজয়ের ইতিহাসই জানি,যা জানিনা তা হল কিভাবে তিনি সৈনিক থেকে মিশরের মসনদে বসলেন এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করলেন।

ঈসমাইল আল জাজারি’র আঁকা সুলতান সালাহউদ্দিনের সম্ভাব্য প্রতিকৃতি।
Source: en.wikipedia.org

আর তাই আজকের লেখায় আমরা জানবো শাষক হিসেবে কিভাবে দ্যি গ্রেট সু্লতান সালাহুদ্দীন আল আইয়ুবীর উত্থান ঘটলো এবং কিভাবেই বা তিনি তরূণ বয়সেই মিসরের সিংহাসনে বসলেন।

তখন মিশর ফাতেমীয় খিলাফতের অধীনে। মিশরের দিনকাল ভালো যাচ্ছিলো না। চারপাশে অনাহার আর মহামারীতে একদিকে যেমন জনজীবন অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো তেমনি অন্যদিকে উজির এবং জেনারেলদের মাঝে আত্মকলহ শাষণ ব্যবস্থাকে দিন দিন দূর্বল করে দিচ্ছিলো। উজির আর জেনারেলদের গুপ্তহত্যা যেনো নিত্যকার ঘটনা ছিলো। প্রকৃতপক্ষে ফাতেমীয় শাষকরা তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছিলো।

এমন সময় প্রধান উজির হিসেবে মিসরের মসনদে তালাই ইবনে রুজ্জিক বসলে আবারো মিশরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। প্রায় নয় বছর তিনি প্রধান উজিরের পদ ধরে রেখেছিলেন।  ৫৫৮ হিজরিতে তালাই ইবনে রুজ্জিক গুপ্তহত্যার শিকার হয় এবং মসনদে বসে তার সন্তান রুজ্জিক ইবনে তালাই। এর সাথে সাথে আবারো বিশৃংখলা শু্রু হয়ে যায়।  ঐ বছরেই মিশরের আরেক অংশের উজির শায়ির আস সাদি রুজ্জিক ইবনে তালাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করে এবং ফাতেমীয় খিলাফতের খলিফা আল আদিদের উজির হিসেবে মিশরের মসনদে বসে।

কিন্তু মসনদে বসে ক্রমেই সে ও তার সন্তান দূর্নীতিতে জড়িয়ে পরে। যা ক্ষুব্ধ করে তোলে খলিফ আল আদিদকে। এমন পরিস্থিতিতে জেনারেল দুর্ঘাম ইবনে আমির আল লাখামী খলিফার সাথে এক হয়ে শায়ির আস সাদির পতন ঘটায় এবং তাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। এবার প্রধান উজিরের মসনদে বসে দূর্ঘাম ইবনে আমির আল লাখামি আর অন্যদিকে শায়ির আস সাদি পালিয়ে আশ্রয় নেয় দামেস্কের আরেকজন ইতিহাস বিখ্যাত শাষক নু্রুদ্দিন জেনকির কাছে। শায়ির নু্রুদ্দিন জেনকির কাছে সাহায্য চায় এবং প্রস্তাব করে যে যদি সে দূর্ঘামকে পরাজিত করতে পারে তাহলে পু্নরায় উজিরে আজমের আসনে বসে রাজ্যের  এক তৃতীয়াংশ রাজস্ব আয় সু্লতান নু্রুদ্দিনকে প্রদান করে। কিন্তু এই প্রস্তাবে নু্রুদ্দিন জেনকি রাজি হয়নি।

এদিকে খবর আসে যে জেরুজালেমের রাজা আলমেরিক মিশর আক্রমণ করেছে  এবং দূর্ঘাম ইবনে আমির আল লাখামি পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে। এই খবর শোনার পর দামেস্কের অধিপতি নুরুদ্দিন জেনকিও মিশর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়।  সে তার সেনাবাহিনীর অত্যন্ত সুদক্ষ অফিসার আসাদ আদ-দিন শিরকুহকে শায়ির আস সাদিরের সাথে মিশর আক্রমণে পাঠায়। আসাদ আদ-দিন তার প্রতিভাবান ভাতিজা সালাহউদ্দিন কে সঙ্গে নিয়ে যায়। তাদের আক্রমণে দূ্র্ঘাম ইবনে আমির আল লাখামি পরাজিত হয় এবং পু্নরায় প্রধান উজিরের আসনে বসে শায়ির আস সাদি।

শায়ির আস সাদি ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পরপরই নু্রুদ্দিন জেনকির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। সে তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে। বরং সে গোপনে জেরুজালেমের শাষক রাজা আলমেরিকের সাথে সম্পর্ক তৈরী করে। যা নু্রুদ্দিন জেনকিকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। আসাদ আদ-দিন শিরকুহ এর নেতৃত্বে সিরিয়ান আর্মি একই সাথে মিশরীয় আর্মি ও ক্রুসেডারদের সাথে লড়াই করতে থাকে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাজা আলমেরিক আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং নিজ রাজ্য নিয়েই ভয় পেতে থাকে। রাজা আলমেরিক আসাদ আদ-দিন শিরকুহ কে প্রস্তাব দেয় যে মিশরের মাটি থেকে একই সাথে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও ক্রসেডার দুটি  পক্ষই প্রস্থান করবে। দামেস্ক অধিপতি এই প্রস্তাবে রাজি হয় এবং নিজ সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনে। অপরদিকে ক্রসেডাররাও চুক্তি অনুযায়ী ফিরে যায়।

মিশর থেকে ফিরে এসে সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবীর চাচা আসাদ আদ-দিন শিরকুহ মিশর নিয়ে প্রচু্র গবেষণা করে। তার মাঝে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে মিশরের ময়দান ব্যবহার করেই ক্রুসেডারদের পরাজিত করা যাবে। কেননা তখনও জেরুজালেম ক্রসেডারদের দখলে। শিরকুহ দামেস্কের সু্লতান নু্রুদ্দিন জেনকির কাছে তার চিন্তা-ভাবনা সব খুলে বলে এবং মিশর দখলের অনু্মতি চায়। দামেস্কের সু্লতান তাকে মিশর আক্রমণের অনু্মতি দেয়। মিশর থেকে ফিরে আসার দুই বছর পর ৫৬২ হিজরিতে শিরকুহের নেতৃত্বে সিরিয়ার সেনাবাহিনী আবারো মিশর আক্রমণ করে। সাথে ছিলেন বীর সৈনিক সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবী। তু্মুল লড়াইয়ের পর ৫৬৩ হিজরিতেই  আসাদ আদ-দিন শিরকুহ ও তার সৈন্যবাহিনী মিশর বিজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে। আর এই যুদ্ধেই তরুণ সেনা সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবীর সাহসিকতা, যুদ্ধকৌশল সবাই জানতে পারে।

Source: Katakpisang.com

এরপর কোন প্রতিরোধ ছাড়াই সেনাপতি শিরকুহ আলেক্সান্দ্রিয়া জয় করে নেয়। সেনাপতি তার ভাতিজা সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবীকে আলেক্সান্দ্রিয়ার শাষক হিসেবে নিয়োজিত রেখে কায়রো ও আল ফুসতাতের দিকে রওনা দেয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ক্রুসেডাররা বাইজেন্টাইন সৈন্যদের সহযোগিতা নিয়ে আলেক্সান্দ্রিয়া সমুদ্র ও জমিন প্রায় চারপাশ থেকেই ঘিরে ফেলে। যদিও সালাহউদ্দিনের যথেষ্ট শক্তি ছিলো তাদের সাথে লড়াই করার কিন্ত এক পর্যায়ে সে তাদের সাথে একটি চুক্তি করে। চুক্তিটি ছিলো এই যে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও ক্রুসেডার বাহিনী উভয়ই মিশরের ময়দান ছেড়ে দিয়ে নিজ নিজ ভূমিতে ফিরে যাবে।

অতএব চুক্তিমত সিরিয়ার সেনারা দ্বিতীয়বারের মত মিশরের ময়দান থেকে নিজ ভূমিতে ফিরে আসে। কিন্তু চুক্তি ভঙ্গ করে ক্রুসেডাররা। ক্রুসেডাররা বু্লবাইস শহর আক্রমণ করে এবং প্রচু্র মানুষ হত্যা করে। বু্লবাইস শহর দখল করার পর রাজা আলমেরিকের বাহিনী আল ফুসতাত শহরের দিকে রওনা দেয়। আর এই খবর পৌছে যায় প্রধান উজির শায়ির আস সাদির কাছে। পু্নরায় শায়ির আস সাদি নু্রুদ্দিন জেনকির কাছে সামরিক সহায়তা চায়। দামেস্ক অধিপতি এইবারও সুযোগটিকে কাজে লাগায়। সে আসাদ আদ-দিন শিরকুহ ও সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবীর নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মত মিশরে সৈন্যবাহিনী পাঠায়। সিরিয়ার সেনাবাহিনী দ্রুত মিশরে পৌছে যায় এবং সেখানে পৌছে ক্রুসেডারদের দমনে মিশরের সেনাবাহিনীর সাথে এক হয়।

রাজা আলমেরিকের ক্রুসেডার বাহিনী সিরীয় সেনাবাহিনীর আগমনের খবর শু্নে ভয় পেয়ে যায় এবং কোন প্রকার লড়াই ছাড়াই তারা মিশর ত্যাগ করে। এদিকে আসাদ আদ-দিন শিরকুহ যখন কায়রো শহরে প্রবেশ করে তখন কায়রোবাসী তাকে সাদরে স্বাগতম জানায়। ফাতেমীয় খিলাফতের খলিফা আল আদিদও তাকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানায়। খলিফা আল আদিদ সেনাপতি আসাদ আদ-দিন শিরকুহের খুব প্রশংসা করে। এই সময়ের মধ্যেই উজির শায়ির আস সাদি গুপ্তহত্যার শিকার হয়। সাফল্যের পথ খুলে যায় সেনাপতি শিরকুহর । নতু্ন প্রধান উজির হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সালাহউদিন আল আইয়ুবীর চাচা আসাদ আদ-দিন শিরকুহকে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মাত্র দুই মাসের মধ্যেই শারিরীক অবস্থার অবনতির কারণে না ফেরার দেশে চলে যায় প্রধান উজির শিরকুহ। তিন দিনের শোক পালন করা হয়। এরপর ফাতেমীয় খিলাফতের খলিফা সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবীকে মিশরের শাষক হিসেবে মনোনীত করে।  সালাহউদ্দিন বয়সে তরূণ  এবং আরো যোগ্য জেনারেল ও উজির থাকা সত্বেও খলিফা সালাহউদ্দিনের হাতে শাষণভার তুলে দেয়।

আর এভাবেই মাত্র ৩২ বছর বয়সেই মিশরের সিংহাসনে বসেন পৃথিবী বিখ্যাত মুসলিম শাষক সালাহউদ্দিন আল আইয়ুবি। যদিও সিংহাসন ধরে রাখার পথ সহজ ছিলোনা তবুও বহু ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে এভাবেই শাষক হিসেবে দ্য গ্রেট সালাহউদ্দিনের উত্থান ঘটে এবং আইয়ুবী রাজবংশের যাত্রা শু্রু হয়।

 

Feature Photo Source: Mycare.org 

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *