উসমানী সাম্রাজ্যের উত্থান ও বিকাশ

উসমানী সাম্রাজ্য, একসময়কার প্রভাবশালী সাম্রাজ্য। উসমানী সাম্রাজ্যের মাধ্যমেই পাচ্যের সাথে পাশ্চাত্যের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। প্রথম দিকে ইউরোপিয়ানরা এ সাম্রাজ্যের নাম দিয়েছিল ‘ঈশ্বরের অভিশাপ’। কারণ তখন রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের মাথা ব্যথার কারণ ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্য। উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও বিকাশ নিয়েই থাকছে আজকের আয়োজন।

 

উসমানী সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপনকারী অরতুগ্রুল-

অরতুগ্রুলের কল্পিত চিত্র; Photo Source: Sejarahuthmaniyyah.com

‘অরতুগ্রুল’ শব্দের অর্থ ‘সাধু-মনা’। তুর্ক জাতির ওগোজ শাখায় তার জন্ম। খুরসান ছিল তাদের আদি নিবাস। অরতুগ্রুলের পিতা সুলায়মান শাহ খারিজম শাহের অধীনে চাকরি করতেন। প্রায় সমগ্র মধ্য এশিয়া ও পারস্য এই বিখ্যাত রাজ বংশের অধীনে ছিল। ১২১৪ সালে চেঙ্গিস খানের আক্রমণে তাদের রাজবংশ ধ্বংস হয়ে যায়। খারিজম বাহিনী পরাজিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরে। অরতুগ্রুলের পিতা সুলয়মান শাহ সিরিয়া যাত্রা করেন। পথিমধ্যে ‘ফুরাত বা ইউফ্রেটিস’ নদীর পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়। তখন সুলায়মানের অধিকাংশ লোক তাদের ইচ্ছামত নানা দিকে যাত্রা শুরু করে। একাংশ মাত্র মৃত সর্দারের পুত্র অরতুগ্রুলের অনুসরণ করে। আশ্রয় লাভের জন্য অরতুগ্রুল আনাতোলিয়া গমন করেন।

তখন ছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ। অরতুগ্রুলের সাথে ছিল ৪৪০ জন অশ্বারোহী। ইতিমধ্যে আঙ্গোরার নিকট মোঙ্গল বাহিনীর সহিত রোম বা কুনিয়ার (প্রাচীন আইকোনিয়াম) সুলতান কায়কোবাদের ভীষণ যুদ্ধ চলছে। সুলতান কায়কোবাদের সহিত অরতুগ্রুলের পরিচয় ছিলনা। কিন্তু নিজের বীরত্ব প্রদর্শন, দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন, মোঙ্গলদের সাথে শত্রুতা ইত্যাদি কারণে তিনি সুলতান কায়কোবাদকে যুদ্ধে সাহায্য করেন। যুদ্ধে অরতুগ্রুলের শৌর্য প্রদশর্নের মাধ্যমে জয় লাভের ফলে এক বিরাট সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপিত হয়। যুদ্ধের উপকার স্বরূপ কায়কোবাদের রাজ্য জায়গির পান। অপরদিকে অরতুগ্রুলকে আশ্রয় দানের ফলে সেলজুক সুলতান কায়কোবাদের শক্তি আরো বৃদ্ধি পেল। তারপর অরতুগ্রুল ব্রুসার নিকটে এক যুদ্ধে তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত সেলজুক সুলতানের প্রতিনিধিরূপে গ্রীক ও মোঙ্গল সম্মিলত বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে বিজয় চিনিয়ে আনেন। এর ফলে আরতুগ্রুলের সুনাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে লাগল। সাহসী জায়গিরদারের বিজয়ের কথা শুনে সেলজুক সুলতান অরতুগ্রুলকে কায়েমি স্বত্বে এস্কি জেলা শহর ছেড়ে দেন। লেফাস্কে, সায়্যিদগরি, সুগুত এস্কি প্রভৃতি নগর ও ইলান বিলোজিক প্রভৃতি দুর্গ এই রাজ্যে অবস্থিত ছিল। উল্লেখিত দুর্গ ও নগরে অধিকাংশ সরদার প্রায় অর্ধ-স্বাধীন ছিলেন। তারা সুলতানের হস্তান্তরকে মোটেও পরোয়া করতেন না। ফলে অরতুগ্রুলকে বহুদিন যুদ্ধ করে প্রভুদত্ত রাজ্য দখলে আনতে হয়। এভাবে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের গোড়া পত্তন করে ১২৮৮ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। সুগুতের নিকট তাকে সমাহিত করা হয়।


অরতুগ্রুলের পুত্র ওসমান ও তার স্বপ্ন-

প্রথম উসমানের কল্পিত পোর্ট্রে‌ট; Photo Source: Wikimedia Commons

ওসমানী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা অরতুগ্রুলের পুত্র ওসমান ১২৫৮ সালে সুগুতে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম হতে তুরস্কের সুলতানরা ওসমানালি বা ওসমানিয়া সুলতান নামে পরিচিত হন। ইউরোপীয় ‘ওটোমান’ শব্দটি এই ‘ওসমান’ শব্দের অপভ্রংশ।

সেসময়ে শেখ এদেবালি নামক এক ধর্মগুরুর সাথে ওসমানের পরিচয় হয়। উসমান গাজি বিখ্যাত শাইখ এদেবালিকে শ্রদ্ধা করতেন এবং তার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি প্রায়ই এসকিশেহিরে এদিবালির সাথে সাক্ষাত করতেন।

এক রাতে এদিবালির দরগাতে অবস্থান করার সময় দেখা স্বপ্ন পরের দিন তিনি এদিবালিকে জানান। তিনি বলেন,

আমার শাইখ, স্বপ্নে আমি আপনাকে দেখেছি। একটি চাঁদ আপনার বুকে দেখা দিয়েছে। এটি উঠতে থাকে এবং আমার বুকে এসে অবতীর্ণ হয়। আমার নাভি থেকে একটি গাছ উঠে। এটি বৃদ্ধি পায় এবং শাখাপ্রশাখা এত বেশি হয় যে এর ছায়া পুরো পৃথিবীকে আবৃত করে ফেলে। এই স্বপ্নের অর্থ কী?


কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর এদেবালি ব্যাখ্যা দেন-

অভিনন্দন উসমান! সর্বশক্তিমান আল্লাহ তোমার এবং তোমার বংশধরদেরকে সার্বভৌমত্ব প্রদান করেছেন। আমার কন্যা তোমার স্ত্রী হবে এবং সমগ্র বিশ্ব তোমার সন্তানদের নিরাপত্তাধীন হবে।

 

এরপর এদেবালি তার মেয়েকে ওসমানের সাথে বিয়ে দেন। ১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দে অরতুগ্রুলের মৃত্যুর পর ওসমান এস্কি শহরের মালিক হলেন। পরের বছর সেলজুক সুলতান কারাজা হিসার জেলা তার রাজ্যভুক্ত করে দিলেন। ১২৯১ সাল থেকে ১২৯৮ সাল পর্যন্ত ওসমান যুদ্ধ থেকে বিরত থাকলেন। তারপর এক এক করে গ্রীক সাম্রাজ্যের বহিঃদূর্গ তার হাতে আসতে লাগল। শীঘ্রই জেনি শহর তার হস্তগত হল। ত্রয়োদশ শতাব্দী শেষ হওয়ার পূর্বেই ওসামানিয়া রাজ্য আর্মেনি গিরি পথ হতে অলিম্পাস পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত হল। ১২৯৯ সালে জেনি শহরে রাজধানী স্থানান্তরিত করে ওসমান নিজের নামে মুদ্রা ও খুৎবা পাঠ করালেন। একই বছর সুলতান ওসমান কোপ্রিহিসারা আক্রমণ করে তা দখল করে নিলেন। একে একে নিসার নিকটবর্তী আরো বহু গ্রীক দূর্গ ওসমানের দখলে আসল। ১৩০১ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুদ্ধ হয়ে গ্রীক সম্রাট তার সেনাপতি মুজারোসকে সুলতানের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলেন। নিকোমোজার নিকটস্থ কোয়েনিহিসার বা বেফোয়ামে উভয় পক্ষের যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে গ্রীকরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেল। ওসমান সমগ্র বিথিনিয়া প্রদেশ লুণ্ঠন করে নিলেন। পরবর্তী ছয় বছর দূর্গের পর দূর্গ তার হস্তগত হতে লাগল। ফলে ওসমানীয়া সাম্রাজ্য কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হল। ১৩১৩ খ্রিষ্টাব্দে অটোমানরা গ্রীক সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগরী ব্রুসা অবরোধ করল। গ্রীকরা প্রাণপনে অটোমানদের প্রতিরোধ করতে লাগল। অবশেষে গ্রীকরা পরাজয় মেনে নিয়ে অটোমানদের নিকট আত্মসমর্পণ করল।


ওসমানের মৃত্যু-

ওসমান স্বাধীন আমীর হিসাবে ২৭ বছর রাজত্ব করেন। তার সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন সম্পূর্ণ সফল না হলে ও তিনি হেলস্পন্টি পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করে পুত্রকে ব্রুসার সিংহাসনে বসান। তার সুযোগ্য উত্তরাধিকারীদের হাতে তার কল্পনা গৌরবের সাথে বাস্তবে পরিণত হয়। কথিত আছে যে, মৃত্যুকালে তিনি পুত্র ওরহান গাজীকে উপদেশ দিয়ে যান।

বাবা, আমি মারা যাচ্ছি। আমি কোনো দুঃখ ছাড়াই মারা যাবো। কারণ তোমার মতো একজনকে আমি উত্তরসূরি হিসেবে রেখে যাচ্ছি। ন্যায়পরায়ণ হয়ো, সদগুণকে ভালোবেসো আর দয়াশীল হয়ো। তোমার অধীনস্ত সবাইকেই সমান নিরাপত্তা দিও। আর নবীজীর (সাঃ) প্রচারিত আইনকে আরো প্রসারিত করো। দুনিয়াতে এগুলোই একজন রাজপুত্রের দায়িত্ব এবং এগুলোই তাদের জীবনে জান্নাতের আশীর্বাদ বয়ে আনে।

ওসমানের শাসনামলে অটোমান সাম্রাজ্য ছিল রোমের একটি প্রদেশের সমান। পরবর্তীকালে মহামতি সুলতান সুলেয়মানের সময় অটোমান সাম্রাজ্য রোমের ন্যায় একুশটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত হয়।

তথ্যসূত্রঃ

১) en.wikipedia.org/wiki/Ottoman_Empire
২) en.wikipedia.org/wiki/Osman_I
৩) bn.wikipedia.org/wiki/প্রথম_উসমান (উসমানের স্বপ্ন)

 

Feature Photo Source: Wikimedia Commons

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *